কথাটা বলে ফেলেই নিজের আহাম্মুকিটা বুঝতে পেরে মনে মনে জিভ কাটি।
এই এক ছুতো পেয়ে ঘনাদা একটি গল্প ফেঁদে বসলেই তো সর্বনাশ! আমাদের আসল উদ্দেশ্যই তাহলে মাটি। আজ ঘনাদার কাছে গল্প তো চাই না, চাই তাঁকে বেশ একটু ভড়কে দিয়ে বাহাত্তর নম্বরটা ক-দিনের জন্য ছাড়াতে।
আমার ভুলে এত কষ্টের আয়োজনের পর ঘাটের কাছে বুঝি ভরাড়ুবি হয়।
গৌরই সে বিপদ থেকে বাঁচায় অবশ্য।
ঘনাদা এই ছুতোটাই ধরতেন কি না জানি না। কিন্তু তিনি মুখ খোলবার আগেই গৌর যেন ঝাঁপিয়ে পড়ে আমার ওপর ঝাঁঝিয়ে ওঠে, ঘনাদা জানবেন মানে? এ কি ওপারের সেই সব বনেদি কোনও দল! নেহাত চ্যাংড়া গুপ্তচরদের মহলের সেদিনকার উঠতি মস্তান বলা যায়! ঘনাদারই এখনও নাম শোনেনি! তা না হলে বাহাত্তর নম্বরে মামদোবাজি করতে আসে।
সেই জন্যেই ভাবছি, একটু থেমে গৌর যেন গভীরভাবে কী ভেবে নিয়ে বলে, এই সব চ্যাংড়াদের যখন বিশ্বাস নেই তখন দু-চারদিন মানে মানে একটু সরে গেলে বোধহয় মন্দ হয় না। ওদের দৌরাত্মি তো মাসখানেকের বেশি নয়। তার মধ্যে নিজেরাই খতম হয়েও যেতে পারে। সেই মাসখানেক একটু চেঞ্জে ঘুরে এলে ক্ষতি কী? তাও দিঘা কি দার্জিলিঙ নয়, এই ডায়মন্ড হারবারে। গাঙের ধারে বাড়িটা মিনিমাগনা পাচ্ছি।
আমরা সবাই সোৎসাহে সরবে এ প্রস্তাব অনুমোদন করি।
বলিস কী! ডায়মন্ড হারবারে এমন বাড়ি!
গাঙের ধার মানে তো মিনি সমুন্দুর!
আর এক পা বাড়ালেই তো ডায়মন্ড হারবার। যাওয়া আসার কোনও হাঙ্গামাই নেই।
তা ছাড়া ওখানকার টাটকা মাছ! তপসে পারশে ভেটকি ভাঙর আর ইলিশ গুড়জাওলি একবার মুখে দিলে আর ডায়মন্ড হারবার ছাড়তে ইচ্ছে হবে না।
গদগদ উচ্ছাসের মধ্যে ঘনাদার ওপর একবার চোখ বুলিয়ে নিতেও ভুলি না।
না, বেয়াড়া কোনও লক্ষণ সেখানে দেখা যায় না। একটু গম্ভীর—যেন একটু ভাবিত। তা সেটা তো স্বাভাবিক।
জো বুঝে আসল কথাটা পেড়ে ফেলে শিশির, কাল সকালেই তা হলে রওনা হচ্ছি, ঘনাদা! যত তাড়াতাড়ি পারি বেরিয়ে পড়ব। আপনি তো খুব ভোরেই ওঠেন।
ঘনাদা উত্তরে শুধু বলেন, হ্যাঁ, তা উঠি।
ব্যস! এর বেশি আর কীভাবে মত দেবেন ঘনাদা! আমাদের মতো দু বাহু তুলে ধেই ধেই করে নৃত্য করবেন নাকি? স্পষ্ট হ্যাঁ তিনি বলেননি, কিন্তু না-ও তো তাঁর মুখ দিয়ে বেরোয়নি।
আমরা আহ্লাদে আটখানা হয়ে নীচে নেমে যাই। সারাদিন তোড়জোড় চলে। বাহাত্তর নম্বর ছাড়বার। ঘনাদার সঙ্গে আর কোনও আলাপ আলোচনায় ঘেঁসি না, পাছে কোনও ভুল বোলচালে পাকা খুঁটি কেঁচে যায়।
ঘনাদাকে একবার বিকেলের দিকে বেরুতে দেখি। ফেরবার সময় মুখটা যেন হাসি-হাসি মনে হয়। আর আমাদের পায় কে?
মাঝরাত্রে সেদিন বাইরের কড়া নাড়াটা শুধু একটু বাড়িয়ে দেওয়া হয়, অদ্য শেষ রজনী বলে।
পরের দিন সকালে জিনিসপত্র গুছোনো বাঁধাছাঁদার মধ্যেই একবার ঘনাদাকে দেখে আসা উচিত মনে হয়। যাবার আগে কোনও সাহায্য-টাহায্য তো দরকার হতে পারে।
কিন্তু ন্যাড়া সিঁড়ি দিয়ে চিলের ছাদ পর্যন্ত উঠেই যে পা দুটো সেখানে জমে যায়। টঙের ঘরের খোলা দরজা দিয়ে যে-দৃশ্য দেখা যাচ্ছে তা কি সত্যি, না দুঃস্বপ্ন!
ঘনাদা নিশ্চিন্ত নির্বিকার হয়ে তাঁর খাটো ধুতির ওপর ফতুয়াটি গায়ে দিয়ে এক হাতে গড়গড়ার নল ধরে টান দিতে দিতে তক্তপোশের ওপর উবু হয়ে বসে কাগজ পড়ছেন!
এ কী, ঘনাদা! ভেতরে গিয়ে এবার বলতেই হয় হতভম্ব হয়ে, ভুলে গেছেন। নাকি?
ঘনাদা কাগজ থেকে মুখ না তুলেই বেশ মধুর কন্ঠে আমাদের আশ্বাস দেন, না, ভুলব কেন?
তবে এখনও তৈরি হননি যে? আমাদের বিমূঢ় জিজ্ঞাসা।
হইনি, দরকার নেই বলে। ঘনাদার দৃষ্টি এখনও খবরের কাগজের ওপর, গানটা দিয়ে দিলাম কিনা।।
গানটা দিয়ে দিলেন!তক্তপোশের ধারে আমাদের বসতে হয় এবারে, কিন্তু খুব সানন্দে সাগ্রহে নয়।
বিস্মিত প্রশ্নটা কিন্তু আপনা থেকেই গলা দিয়ে বেরিয়ে গেল, গান দিয়ে দিলেন কাকে? কেন?
কেন দিলাম! এতক্ষণে খবরের কাগজ থেকে মুখ তুলে ঘনাদা আমাদের ওপর কৃপাদৃষ্টি বর্ষণ করলেন, না দিলে এ সব উৎপাত বন্ধ হয় না যে। আর দিলাম মাৎসুয়ো-কে।
কে এক মাৎসুয়োকে কী গান দিলেন আর তাইতে সব উৎপাত বন্ধ হয়ে যাবে বলে আমাদের আর কোথাও যাবার দরকার নেই বলছেন!
আমরা ঘুরপাক খাওয়া মাথাটাকে একটু থামাবার চেষ্টা করে প্রথম রহস্যটাই জানতে চাইলাম—মাৎসুয়ো আবার কে?
ঘনাদা যেন অপ্রস্তুত হয়ে একটু হাসলেন।
ও, মাৎসুয়ো কে তা তো তোমরা জান না। কিন্তু মাৎসুয়ো পরিচয় দিতে হলে ইয়ামাদোর কথাও বলতে হয়, আর যেতে হয় প্রশান্ত মহাসাগরের প্রায় মাঝামাঝি টোঙ্গা দ্বীপপুঞ্জের উত্তরে এমন দুটি ফুটকিতে সাধারণ ম্যাপে অনুবীক্ষণ দিয়েও যাদের পাত্তা পাবার নয়। নাম লিমু আর নিফা, ঠিক কুড়ি অক্ষাংশের দুধারে একশো চুয়াত্তর থেকে পঁচাত্তর দ্রাঘিমার মধ্যে দুটি ছেলেখেলার দ্বীপ। একটি দু মাইল আর অন্যটি বড় জোর দেড় মাইল লম্বা, কিন্তু এই মহাসমুদ্রে এই দুটি মাটির ছিটে নিয়েই মাৎসুয়ো আর ইয়ামাদোর মধ্যে কাটাকাটি ব্যাপার। লিমু দ্বীপটা মাৎসুয়োর আর নিফার মালিক ইয়ামাদো। গত মহাযুদ্ধের সময় দুজনেই জাপানের নৌবাহিনীতে ছিল। ওই অঞ্চলেই যুদ্ধের কাজে থাকতে হয়েছিল বলে দুজনেই ওই দ্বীপমালার রাজ্যকে ভালবেসে ফেলে। যুদ্ধ থামবার পর দেশে ফিরেও তারা ভোলে না। কিছুকাল ব্যবসা বাণিজ্য করে বেশ কিছু রোজগার করে দুই বন্ধুই ওই অঞ্চলে গিয়ে পাশাপাশি দুটি দ্বীপ কেনে।
