বাড়িটার অনেকদিন ধরে পুরোপুরি সংস্কার হয়নি। খাপছাড়া তালিমারা এখানে সেখানে একটু আধটু মেরামত হয়েছে মাত্র।
আমাদের পেড়াপিড়িতে এই চড়া বাজারেও বাড়িওয়ালা চুন বালি সিমেন্ট দিয়ে পুরোপুরি বাহাত্তর নম্বরের ছাল চামড়া বদলাতে রাজি হয়েছেন। কিন্তু আধার্থেচড়া ভাবে সে কাজ তো আর হয় না। তাই পাছে হঠাৎ বেঁকে বসে বাধা দেন এই ভয়ে বাড়িওয়ালা ঘনাদাকে কোনও রকমে মাসখানেকের জন্য সরাবার অনুরোধ জানিয়েছেন।
এ অনুরোধ না রাখলেই নয়, কিন্তু ঘনাদা কি সেই শান্ত সুবোধ ছেলেটি যে একবার সাধলেই সুড়সুড় করে বাহাত্তর নম্বর থেকে বেরিয়ে আসবেন।
ঘাড় তিনি যাতে না বাঁকাতে পারেন তার চাল ভেবে যখন সারা হচ্ছি তখন তাঁর নিজের কাছ থেকেই হদিসটা পেয়ে গেলাম।
হ্যাঁ, কলকাতা মানে জঙ্গল এই সুরটাই খেলিয়ে ঘনাদাকে কাবু করতে হবে। আর ঘুণাক্ষরে আগে থাকতে ঘনাদাকে কিছু না জানিয়ে! বাহাত্তর নম্বর তেমন বিভীষিকা করে তুলতে পারলে উনি মানুষ নামে জানোয়ারের কলকাতা ছেড়ে খোকা বাঘ-সুন্দরের ঝাড়খালিতে যেতেও বোধহয় আপত্তি করবেন না। শুধু ভয়টাকে ঠিক মতো পাকিয়ে তুলে একেবারে স্ফুটনাঙ্কে মানে ফুট ধরতেই কথাটা পাড়া দরকার!
তাই জন্যেই এইসব পাঁয়তাড়া। শুধু শিউরে তোলবার ছবি আঁকা কার্ডই নয়, আরও অনেক রকম আয়োজনই হয়েছে। সাপের ছোবল আঁকা কার্ড ঘনাদাও পেয়েছেন, স্বীকার করুন আর না করুন। মাঝরাত্রে বাইরের দরজায় বিদঘুটে কড়া নাড়াও শুনেছেন সন্দেহ নেই।
হ্যাঁ, ওই এক মোক্ষম প্যাঁচ কষা হচ্ছে দু-একদিন বাদে বাদে প্রায় হপ্তা খানেক ধরে।
হঠাৎ মাঝরাত্রে বাইরের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। প্রথমে আস্তে, তারপর বাড়তে বাড়তে একেবারে পাড়া কাঁপানো আওয়াজ।
কে? কে? যেন ঘুম থেকে উঠে আমরা বারান্দা থেকেই চিৎকার করি। নেমে যাবার সাহস যেন কারওই হয় না।
ঘনাদা যে তাঁর টঙের ঘর থেকে বেরিয়ে ন্যাড়া সিঁড়ির ধারে আলসের কাছে। দাঁড়িয়েছেন তা টের পেয়ে আমরা আরও একটু হইচই বাড়াই।
বনোয়ারি—! বনোয়ারি—! রামভুজ! রামভুজ—! কোথায় গেল সব ওরা! সাড়া দেয় না কেন?
সাড়া দেবে কোথা থেকে?—আমাদেরই একজনের হঠাৎ যেন স্মরণ হয়— ওরা যে ক-দিন রাত্রে দেশোয়ালিদের গানের মজলিশে যাবার জন্য বাসায় থাকছে
সে কথা ভুলে গেছ?
তাহলে? তাহলে, শিবু যেন একটু ভেবে আমার দিকে চেয়েই সমস্যাটার সমাধান করে ফেলে, হ্যাঁ, তুই-ই একবার দেখে আয় না নীচে গিয়ে দরজাটা খুলে!
আমি? আমি যাব!—আমায় আর ভয়-তরাসেরঅভিনয় করতে হয় না—তার চেয়ে, কী বলে, সবাই মিলেই তো গেলে হয়।
প্রথম রাত্রে সবাই মিলেই নেমে গিয়েছিলাম। গিয়ে বড় রাস্তার চায়ের দোকানের ছোকরাটাকে কথা-মতো একটা আধুলি দিয়ে, এর পর থেকে এখানে নয়, দোকানেই পাওনা মিলবে জানিয়ে ফিরে এসেছিলাম যেন ভয়ে বেসামাল হয়ে।
ওপরে এসে কাঁপা গলায় এলোমেলো এমন আলাপ চালিয়েছিলাম যাতে ব্যাপারটার রহস্য যেমন দুর্বোধ্য তেমনই ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
কই, কেউ মানে কাকেও তো দেখতে পেলাম না!
এত রাত্রে অমন কড়া নাড়ার মানেটা কী!
এখনও মানে জিজ্ঞাসা করছ? এখনও বুঝতে কিছু বাকি আছে?
তার মানে, মানে আমাদের এখানে থাকতে দেবে না!
না। আপাতত তো নয়।
চুপ চুপ, আস্তে!
এর মধ্যে ছায়াটা সরে যাবার আভাস পেয়ে মনে হয়েছে প্যাঁচটা নেহাত বিফল হয়নি।
ওষুধ যে ধরতে শুরু করেছে তা টের পেয়েছি পরের দিন থেকেই। ঘনাদা তাঁর সন্ধের আসরে যাচ্ছেন না এমন নয়, কিন্তু ফিরছেন একটু বেশি তাড়াতাড়ি। সেই সঙ্গে সারাদিন সদর দরজা বন্ধ রাখা সম্বন্ধে যেন একটু অতিরিক্ত সজাগ হয়ে উঠেছেন।
এ কয়দিনের প্রস্তুতি পর্বের পর আজ হাওয়াটা সব দিকেই অনুকূল মনে হচ্ছে। বক্তার বদলে এমন মনোযোগী শ্রোতার ভূমিকায় ঘনাদাকে বড় একটা দেখা যায় না।
আপাতত এ কাজ কাদের হতে পারে সেই গবেষণাই চলছে।
শিশির বুঝি ওয়াগন ব্রেকারদের কথা বলছিল। কোনও একটা গ্যাং, তাদের মালগাড়ি লুটের মাল রাখবার জন্য এ বাড়িটা হাত করতে চাচ্ছে, এই তার অনুমান!
ছো! বলে এ অনুমান নস্যাৎ করে দিয়ে গৌর তখন বলেছে, ওয়াগন ব্রেকার! ওয়াগন ব্রেকার এখানে আসবে কোথা থেকে? কাছে পিঠে রেললাইন আছে কোনও! উঁহুঁ, ওসব নয়।
গৌর তারপর রীতিমতো লোমহর্ষক একটা থিওরি খাড়া করে। তার মতে এ কাজ নিশ্চয়ই কোনও আন্তর্জাতিক গুপ্তচর দলের। তারা এক ঘাঁটিতে বেশিদিন থাকে না। একবার এখানে, একবার ওখানে আস্তানা বদলায়। আর সে আস্তানা জোগাড় করে এমনই হুমকি দিয়ে। তাদের অসাধ্য কিছু নেই, আর মায়াদয়ারও তারা ধার ধারে না! একটা ঘাঁটি জোগাড় করতে দু-দশটা জান খরচ তাদের কাছে ধর্তব্যই নয়।
কিন্তু এদের কাজটা কী? কী করে এরা! বিস্ফারিত চোখে জিজ্ঞাসা করি আমি!
কী না করে! গৌর যেন সামনে মাইক ধরে বলে যায়, এই যে দেশে এত গণ্ডগোল, এত সমস্যা, চুরি ছিনতাই রাহাজানি, নিশানে নিশানে হানাহানি, লাল নীল কালোবাজার ঘাটতি বাড়তি উঠতি পড়তি রকবাজ সাবোটাজ, পুরো দামে কম কাজ, ধর্মঘট লক আউট তুফান খরা বন্যা চাল তেল কয়লার জন্য ধরনা এ সব কিছুর মূল হল তারা। দেশটার আখের যাতে মাটি হয় তাই সারাক্ষণ তুর্কি নাচন নাচিয়ে সব কিছু ভণ্ডুল করে দেওয়াই তাদের মতলব।
তা এমন একটা গুপ্তচর দলের কথা ঘনাদা কি আর জানেন না!
