ঘর তো ছিলই! শিবু বুঝিয়ে দেয়, সে সবের কী হবে তার ইশারাও ছিল ওই উড়ে যাওয়া ঘরের বাইরের পাওয়া একটা চিরকুটে। তাতে লেখা ছিল—যা হবে তার প্রথম নমুনা।
কিন্তু আমাদেরও সেরকম নমুনা দেখাবে নাকি? আমার মুকখানা ঠিক ফ্যাকাশে না মারলেও গলাটা প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে ওঠে, তাহলে তো—
বাকি কথাটা উহ্য রেখে আমি সভয়ে ঘনাদার কাছেই যেন পাদপূরণটা চাই।
ঘনাদা পাদপূরণ করেন না, তবে কার্ডগুলো তুলে ধরে জিজ্ঞাসা করেন, এ কার্ডগুলো কবে এসেছে?
আজ্ঞে, একদিনে তো আসেনি। শিশির ঘনাদাকে সঠিক খবর দেয় ব্যস্ত হয়ে, প্রথম শিবুর নামে একটা কার্ড আসে ডাকে, আমাদের সেটা দেখাতে আমরা তা নিয়ে হাসিঠাট্টাই করেছি। তার পরে পায় গৌর—
ডাকে-টাকে নয়! গৌর রিলে রেসের ব্যাটনের মতো শিশিরের কথার খেইটা ধরে নেয়, খেলার মাঠ থেকে বাড়িতে এসে জামা খুলতে গিয়ে এক পকেটে শক্ত মতো কী একটা টের পেলাম। পকেট থেকে বার করে দেখি—এই কার্ড।
আমারটা আরও বিশ্রীভাবে পেয়েছি। গৌর থামতেই শিশির শুরু করে দিতে দেরি করে না, এই তো আর মঙ্গলবার ন-টার শো দেখে ফিরছি, হঠাৎ এই গলির মুখেই দাঁড়ান শুনে চমকে গেলাম। গলির আলোটার অবস্থা তো দেখেছেন। সেই যে কবে বালব চুরি গেছে, তারপর থেকে আর করপোরেশনের করা হয়নি। জায়গাটা ঘুটঘুটি অন্ধকার। তারই মধ্যে ইলেকট্রিক পোস্টটার পাশেই দুটি ছায়ামূর্তি যেন এগিয়ে এল। দুজনের গায়ে রেনকোট বা ওভারকোট গোছের কিছু, মাথার টুপিও মুখের ওপর টানা। আমার বেশ কাছে এসে দাঁড়াবার পরও তাদের মুখগুলো দেখতে পেলাম না। শুধু গলার স্বর যা শুনতে পেলাম তাতেই যেন ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে কী দারুণ খাদের গলা। যেন পাতাল গুহা থেকে ভুতুড়ে চাপা আওয়াজ উঠে আসছে। সেই গলাতেই শুনতে পেলাম—আর পনেরো দিন মাত্র সময় পাবে, এই নাও তার পরোয়ানা।এই বলেই আমার হাতে কী একটা দিয়ে ওদিকের অন্ধকারেই যেন মিলিয়ে গেল। কোনও রকমে কাঁপতে কাঁপতে ঘরে এসে পৌছে আলো জ্বেলে দেখি—এই কার্ড?।
আর আমার বেলা! শিশিরের বিবরণটায় উৎসাহিত হয়ে আমি তক্ষুনি শুরু করি, সে যা হয়েছিল তা ভাবলেই গায়ে এখনও কাঁটা দেয়।
তাহলে এখন আর ভেবে দরকার নেই। শিবু হিংসুকের মতো আমায় থামিয়ে দিয়ে বলে, তুইও কার্ড পেয়েছিস এইটুকুই আসল খবর। এখন কথা হচ্ছে, এগুলো পাঠাচ্ছে কারা?
কারা আবার? দাঁত খিঁচিয়ে হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিয়ে বলতে ইচ্ছে করে কি না, এ কীর্তি আমাদের এই চার জাম্বুবানের?
নিজেরা সব ফলাও করে যে যার গল্প সাজালেন, আর আমার বেলাতেই শুধু খবরটাই যথেষ্ট। আমাকে বলতে দিলে যে নিজেদের গল্পগুলো কানা হয়ে যাবে!
এমন হিংসুটেদের সঙ্গে এক দণ্ড আর থাকতে ইচ্ছে করে না, তবু যে থাকি সে নেহাত আমার মহানুভবতায়। ওদের হিংসের বিরুদ্ধে আমার মহত্ত্বেরই জয় হয়। এবারও তাই উদার হয়ে ওদের ক্ষমা করে ফেলি শেষ পর্যন্ত!
তবু ফাঁস যখন হয়েই গেছে ব্যাপারটা তখন এখানেই খুলে বলি।
এবারের ষড়যন্ত্র ঘনাদাকেই বাগ মানাবার জন্য। তবে প্যাঁচটা একটু নতুন আর চালটাও আলাদা।
আগে থাকতে উদ্দেশ্যটা জানাবার দরুন আমাদের অনেক প্ল্যান ঘনাদা এ পর্যন্ত ভেস্তে দিয়েছেন। এবার তাই একেবারে চোরা লড়াইয়ের ব্যবস্থা। আমাদের আসল মতলব না জানিয়ে আচমকা হামলায় কাবু করে ফেলব। ঘনাদা ভেবে চিন্তে পিছলে পালাবার সময়ই পাবেন না।
প্ল্যানটা খুব ভাল করেই ছকা হয়েছে। তার প্রথম বুদ্ধিটা এক হিসেবে ঘনাদা নিজেই দিয়েছেন নিজের অজান্তে। সেদিন ছুটির সকালে তাঁর কাছে দুপুরের ভোজের মেনু ঠিক করতে গিয়ে তাঁকে একটু বিচলিতই মনে হয়েছিল। কারণটাও জানতে দেরি হয়নি। হাতের খবরের কাগজটা থেকে অত্যন্ত চিন্তিত মুখ তুলে বলেছিলেন, জঙ্গল! জঙ্গল! জঙ্গল হয়ে গেল কলকাতা শহর!
রসালো কিছুর আশায় তক্তপোশে চেপে বসে মুখচোখে যতদূর সাধ্য আতঙ্ক ফুটিয়ে জিজ্ঞাসা করেছি, কোথায়? কোন পাড়ায়, ঘনাদা? বাঘ-টাঘ বেরিয়েছে নাকি? সেই ঝাড়খালির সুন্দরী, থুড়ি সুন্দর বাঘ এই কলকাতায়?
বাঘ নয়, তার চেয়ে ভয়ংকর জানোয়ার! গম্ভীর মুখে বলেছেন ঘনাদা, বুঝলে কিছু!
আমরা হাঁ-করা হাঁদা সেজেছি।
মানুষ! মানুষ! ঘনাদা আমাদের জ্ঞান দিয়েছেন, এই কলকাতা শহরে তারই উপদ্রব বেড়েছে। এই দেখোনা, বুড়ো মানুষ পেনসন নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। বাড়ি দোরগোড়ায় পিস্তল ছোরা দেখিয়ে তাঁর সব সম্বল কেড়ে নিয়েছে, আর হুমকি দিয়ে আরেক পাড়ায় একটা গলির মুখই দিয়েছে বন্ধ করে। লোকজনকে আধঘণ্টার হাঁটুনি হেঁটে অন্য দিক দিয়ে ঘুরে যেতে হয়।
ঘনাদার বিক্ষোভ শুনতে শুনতে কথাটা একেবারে জিভের ডগায় এসে গিয়েছিল। অনেক কষ্টে সামলেছি নিজেদেরঘনাদার কাছে দুপুরের মেনুর ফর্দের সঙ্গে কলকাতার জঙ্গল সম্বন্ধে দামি দামি সব টিপ্পনি শুনে এসেই বসে গিয়েছিলাম আমাদের লক্ষ্যভেদের প্ল্যান ছকতে।
হ্যাঁ, এবারেও ঘনাদাকে বাহাত্তর নম্বর থেকে সরানোই আসল লক্ষ্য।
তবে সেই ঘনাদাকে ভোট দিন আন্দোলনের মতো চিরকালের জন্য বাহাত্তর নম্বর ছাড়াবার মতলবে নয়, দিঘা কি দার্জিলিঙের দ্বিধার মতো শখের বেড়াতে যাওয়া নিয়ে রেষারেষিও এর মধ্যে নেই। মাত্র মাসখানেকের জন্য ঘনাদাকে এখান থেকে কোথাও নিয়ে যেতে পারলেই হয়। অনুরোধটা আমাদের বাড়িওয়ালার আর গরজটা আমাদের নিজেদেরও।
