টঙের ঘরে প্রায় ফাঁসির আসামির মতো কালিমাখা মুখে ঢুকে তক্তপোশের ধারে কোনও রকমে বসেও আমরা প্রথমটা যেন একেবারে বোবা হয়ে গেছি।
যা বলতে এসেছি আমাদের ভয়ে শুকনো গলা ঠেলে তা যেন বেরুতেই চায়নি।
কী করছেন তখন ঘনাদা?
না, একেবারে নির্বিকারভাবে তাঁর তক্তপোশটির ওপর বসে গড়গড়ায় টান দেননি। এমন কী তাঁর কেরাসিন কাঠের শেলফ হাতড়ে আশ্চর্য কিছু খুঁজে বার করবার চেষ্টাও তাঁর দেখা যায়নি।
একটু ভাল করে শার্লকি দৃষ্টিতে মেঝেটা লক্ষ করলে একটু যেন সন্দেহজনক ব্যাপারেরই আভাস পাওয়া যায়।
মেঝের ওপর গড়গড়ার কলকেটা টিকে ছাই ইত্যাদি ছড়িয়ে যেভাবে পড়ে আছে। তাতে মনে হয় কেউ যেন অসাবধানে তাড়াতাড়ি সেটা পা দিয়ে লাথিয়ে ফেলেছে।
কিন্তু তাঁর অত আদরের গড়গড়া আর সাজা কলকেতে তাড়াতাড়ি অসাবধানে পা লাগানো কি ঘনাদার পক্ষে সম্ভব?
অমন অসাবধান তিনি হবেনই বা কেন হঠাৎ বিচলিত না হলে?
ছাদের ওপরে দেখার আগেই সিঁড়িতে আমাদের পদশব্দ আর হাহাকার শুনেই ঘনাদা হঠাৎ বেশ একটু বিচলিত হয়ে তাঁর ঘরের দরজাটাই বন্ধ করতে যাচ্ছিলেন, আর তাতেই পা লেগে তাঁর গড়গড়া কলকে উলটে পড়েছে এমন একটি সিদ্ধান্ত কি করা যায় না!
আর সে সিদ্ধান্ত সঠিক হলে আমাদের সঙ্গে ঘনাদার একটা সমব্যথীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে নাকি?
সম্পর্কের সুতোটা অবশ্য এখনও অতি সূক্ষ্ম। খুব সাবধানে পাকাতে হবে, কারণ একটু চালের ভুল হলেই ছিঁড়ে যেতে পারে।
খুব সাবধানেই পাকটা দেওয়া হয়।
হাহাকারটা সিঁড়িতেই শেষ করে এসেছি। টঙের ঘরে ঢুকে তক্তপোশের ওপর বসবার পর ঘনাদাকে দেখেই যেন মুখে আর কথা ফুটতে চাইছে না।
শিবুই যেন প্রথম কোনও রকমে কথাটা তোলে। হতাশ ভাঙা গলায় বলে, কালও ঘুম হয়নি, ঘনাদা!
ঘুম হয়নি! ঘুম হয়নি! তিরিক্ষি মেজাজে খিঁচিয়ে ওঠে গৌর, ভাল লাগে না রোজ এই প্যানপ্যানানি। খালি নিজের সুখটুকুর ভাবনাই সারাক্ষণ। ঘুম আমাদের কার হচ্ছে শুনি!।
আহা, শিবুকে মিছিমিছি গাল দিয়ে লাভ কী! শিশির ক্লান্ত গলায় শিবুকে একটু সমর্থন করে, শুধু ওর নিজের কথা নয়, ও আমাদের সকলের অবস্থাটাই বোঝাতে চেয়েছে। মাথা গুলিয়ে আছে বলে কথাটা গুছিয়ে বলতে পারেনি।
থাক! শিবুর হয়ে অত ওকালতি তোমায় করতে হবে না। আমি গৌরের পক্ষ নিয়ে গরম হয়ে উঠি, আমাদের অবস্থা কি শুধু ওই ঘুম-না-হওয়া দিয়ে বোঝাবার। কেন ঘুম হচ্ছে না তার কিছু ঘনাদাকে দেখিয়েছে?
আমি পকেট থেকে একটা চৌকো কার্ড বার করে ঘনাদার দিকে বাড়িয়ে ধরে বলি, দেখুন, ঘনাদা।
গড়গড়াতে টান বা শেলফ হাঁটকাবার মতো কোনও কিছুতে তন্ময় হবার ভান না করলেও আমরা ঢোকবার পর ঘনাদা বেশ একটু ছাড়ো-ছাড়ো ভাবই দেখাবার চেষ্টা করছিলেন।
কিন্তু আমি চৌকো কার্ডটা বার করবার পর সে নির্লিপ্ত দূরত্ব আর রাখতে পারেন না।
হাতের যে ছোট আয়নাটা অকারণেই সামনে তুলে রেখে মুখের কিছু যেন দেখবার ছল করছিলেন সেটা তাড়াতাড়ি ফতুয়ার পকেটে রেখে বেশ ব্যস্ত হয়ে কার্ডটা আমার হাত থেকে প্রায় ছিনিয়ে নেন।
তিনি যখন কার্ডটা দেখতে তন্ময় আমরা তখন মনসায় ধুনোর গন্ধ দিতে ত্রুটি করি না।
শিশির যেন সভয়ে বলে, ও কার্ড তুইও তাহলে পেয়েছিস?
বলার সঙ্গে সঙ্গে তার পকেট থেকে একটা ভিন্ন রঙের অনুরূপ কার্ড শিশির বার করে দেখায়।
শিবু ও গৌর কেউ পেছপাও থাকে না।
আমরাই কি পাইনি! বলে দুজনেই দুটো কার্ড বার করে তক্তপোশের ওপর মেলে ধরে।
ঘনাদাকে এবার তক্তপোশেরই অন্য প্রান্তে বসে পড়ে কার্ড চারটে মিলিয়ে দেখতে হয়।
চার রঙের হলেও কার্ডগুলো মাপে এক। আর প্রত্যেকটির ওপর এক পিঠে যা আঁকা তা একই ছবির নকশা।
আর কী সে নকশা! দেখলেই গায়ে আপনা থেকে কাঁটা দেবার কথা।
কার্ডের তলা থেকে ফণা-তোলা একটা সাপের মাথা উঠে চেরা জিভের সঙ্গে যেন মুখের ভেতর থেকে বিষের হল্কা বার করছে।
কার্ডের মাথায় শুধু তিনটি শব্দ লাল হরফে লেখা, এখনও সময় আছে।
এসবের মানে কী বলতে পারেন? কাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করে শিবু, ক্রমশ তো অসহ্য হয়ে উঠল।
কারও বিদঘুটে ঠাট্টা-টাট্টা হতে পারে? আমি যেন হতাশার আশা হিসেবে একটা ব্যাখ্যা খাড়া করবার চেষ্টা করি।
ধমকও খাই তৎক্ষণাৎ।
ঠাট্টা! খিঁচিয়ে ওঠে গৌর, এই সব ভয়ংকর হুমকিকে ঠাট্টা ভাবছ! ঠাট্টা হলে স্বয়ং যমরাজই করছেন জেনে রাখো।
হ্যাঁ, বেনেপুকুরে ওই ভুল করে একজনদের সর্বনাশও হয়েছে। শিবু গৌরের সমর্থনে এবার একটা জবর গোছের নজিরই হাজির করে, একহপ্তা দুহপ্তা তিনহপ্তা বাড়ির কেউ গ্রাহ্য করেনি, পাড়ার বকা ছেলেদের বাঁদরামি ভেবেই উড়িয়ে দিয়েছে। তারপর–
তারপর কী? শিবুর নাটকীয়ভাবে থেমে যাওয়ার পর আড়চোখে একবার ঘনাদার দিকে চেয়ে নিয়ে প্রায় বুজে আসা গলায় জিজ্ঞাসা করি, কী হয়েছে তারপর?
ওই উড়িয়েই দিয়েছে! শিবুর সংক্ষিপ্ত জবাব।
উড়িয়েই দিয়েছে মানে? আমরা অস্থির হয়ে উঠি, বকা ছেলের বাঁদরামি বলে উড়িয়েই দিয়েছিল সেই বেনেপকরওয়ালারা। তাহলে আর হলটা কী?
উড়িয়ে-দেওয়া জবাবই পেল তাদের আহাম্মকির! শিবু এবার একটু ব্যাখ্যা করে বোঝায়, প্রথমে চিলেকোঠার ঘরটাই দিলে উড়িয়ে।
চিলেকোঠার ঘর! আমরা এ ওর মুখের দিকে তাকাই, তার মানে এই ছাদের ঘরটাই।
শিশির এই শুনেই গরম হয়ে ওঠে অদেখা অজানা আততায়ীদের ওপর—তা ওড়াতে হলে ছাদের ঘরটাই কেন? আর ঘর ছিল না সে বাড়িতে?
