কিছুই ছিল না। ঘনাদা যেন মুখোনা তেতো করে বললেন, ওই দুটো বোকা ফালতু ভাইয়ের দোষেই এই হিতে বিপরীত।
বোকা ফালতু ভাইদুটো মানে নকুল-সহদেব বুঝলাম। কিন্তু তাদের বুদ্ধির দোষটা কী, আর তাতে হিতে বিপরীতটা কীরকম?
সেই কথাই জিজ্ঞাসা করলাম ঘনাদাকে।
কীরকম তা বলতেও মেজাজ খিচড়ে যায়! ঘনাদা যেন আমাদের কাছেই সাড়ে তিনহাজার বছরের জমানো গা-জ্বালাটা প্রকাশ করলেন, দুই হাঁদা ভাইয়ের মাথায় হঠাৎ বাই চাপল, আদি পর্ব থেকে জতুগৃহদাহ অধ্যায়টা একটু ছাঁটাই করতে হবে। মানে কুন্তী মায়ের নামে কোনও নিন্দে যেন কখনও না উঠতে পারে।
কুন্তী মায়ের নামে নিন্দে উঠবে কেন? আমরা অবাক, জতুগৃহ পোড়াবার প্ল্যান তো দুর্যোধনের হুকুমে পুরোচনের!
তা ঠিক। ঘনাদা আমাদের জ্ঞান দিলেন, কিন্তু আসলে ও মোম-গালার ঘরে আগুন দিয়েছিল তো ভীমসেন, আর ছেলেদের সঙ্গে লুকিয়ে কাটা সুড়ঙ্গ দিয়ে পালাবার আগে কুন্তী দেবীর একটা দারুণ অন্যায় হয়েছিল।
কুন্তী দেবীর আবার কী অন্যায়? আমরা বিমূঢ়।
অন্যায় পালাবার আগে ব্রাহ্মণ-ভভাজনের নামে ভুরিভোজের ব্যবস্থা। ঘনাদা কুন্তী দেবীর সমালোচনায়, না সেই সুদূর ভুরিভোজের গন্ধে নাক কুঁচকোলেন, ঠিক বোঝা গেল না—যে এসেছে তাকেই গাণ্ডেপিণ্ডে খাইয়ে একেবারে অচল করে দিয়েছেন। সেই নিষাদ মা আর তার পাঁচ ছেলে ওই ফাঁসির খাওয়া খেয়েই না পেট ঢাক হয়ে অমন বেহুশ হয়েছিল। নিজেরা পালাবার সময় ওই মা-ছেলেদের জাগিয়ে দিয়ে সঙ্গে নেওয়া উচিত ছিল না কুন্তী দেবীর? এ সব কথা কেউ যাতে আর না তুলতে পারে, নকুল-সহদেব তাই কুন্তী দেবীর ভোজ দেবার ব্যাপারটাই বাদ দিতে চেয়েছিল মহারভারত থেকে।
কিন্তু সে সব কথা তো মহাভারতে জ্বলজ্বল করছে এখনও। আমরা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ও দুই হাঁদা ভাই আসল জায়গায় মানে দারুক-মূষিক এজেন্সিতে যায়নি বুঝি? সেখানে গেলে তো গণেশের বাহন বাহাদুর কবে বেমালুম সব কেটে উড়িয়ে দিত।
হাঁদা হোক, ফালতু হোক, যমজ দুভাই সে কথা কি আর জানত না! ঘনাদা নকুল সহদেবের হয়ে একটু বললেন, ভীমদাদা আর পুরুতমশাই ধৌম্য ঠাকুরের কাছে একটু আঁচ পেয়েই তো তারা মতলবটা ভেঁজেছিল। কিন্তু তারা যখন খোঁজ করতে গেছে, তখন ইন্দ্রপ্রস্থের চোরাগলিতে সব ভোঁ ভোঁ। দারুক-মুষিক কোম্পানি লালবাতি জ্বেলে গণেশ উলটে পালিয়েছে।
দারুক-মূষিক এজেন্সি ফেল! আমরা যেমন বিস্মিত তেমনই একটু হতাশ হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কেন?
কেন আর! ঘনাদা গোপন তথ্যটা জানালেন, গণেশঠাকুরের বাহনটি ঘুষ খেয়ে খেয়ে শুয়োরের মতো এইসা মোটকা তখন হয়েছে যে, পুথিঘরের গর্ত দিয়ে গলতেই পারে না। ওদিকে শ্রীকৃষ্ণের সারথি দারুক বাবাজির পেছনেও তখন খাজাঞ্চি দপ্তরের চর লেগেছে। সব দিক দিয়ে বেগতিক বুঝে দ্বারকাতে গিয়ে ড়ুব মেরেছেন তাই।
দারুক-মূষিকের খোঁজ না পেয়ে দুই হাঁদা ভাই যখন দিশেহারা তখন একদিন দুপুরে শোনে তাঁদের রাজড়াপাড়ার রাস্তা দিয়ে ফেরিওয়ালা হেঁকে যাচ্ছে—কান কটকট, দাঁতের দরদ, ছাতা-জুতো সারাই, উই লাগাই, উই ধ—রা–ই।
ছাতা-জুতো-জামা কাপড় সারানোর কথা তো জানা, দাঁতের কানের ব্যথা সারানোও। কিন্তু উই লাগানো, উই ধরানো আবর কী! ডাক! ডাক তো ওকে। দুই ভাই ব্যস্ত হয়ে উঠল।
ফেরিওয়ালার সঙ্গে আলাপ করে দুই ভাইয়ের আহ্লাদ আর ধরে না। মোক্ষম যা একটি প্যাঁচ এবার পাওয়া গেছে, তার কাছে দারুক-মূষিক কোম্পানির কসরত কোথায় লাগে!
ফেরিওয়ালার কাঁধে ঝোলানো বিজ্ঞাপনে তার খেতাব লেখা আছে, বল্মী-বিশারদ। গালভরা নামটার আসল মানে হল উই পোকার ওস্তাদ। ফেরিওয়ালা উই পোকা পোষে। সেই পোষা উই দিয়ে পুঁথিপত্র দলিল-দস্তাবেজ সব সে যেমনটি চাই তেমনই সংশোধন করে দিতে পারে।
তাকে ঠেকাবার ক্ষমতাও কারও নেই। দারুকের শুয়োর মার্কা মূষিক তো ছার, সবচেয়ে পুঁচকে নেংটি ইদুরের ল্যাজও যেখানে ঢোকে না। চুলের মতো মিহি তেমন একটা ফুটো পেলেই তার কাম ফতে। তার পোষা উইয়েদের অসাধ্য কিছু নেই। হুকুম পেলে তারা রাজধানীর মহাফেজখানাই এক রাত্রে সাফ করে দিতে পারে!
মহাফেজখানা নয়, সামান্য ক-টা ছত্র। আনন্দে গদগদ হয়ে নকুল-সহদেব বারণাবতের জতুগৃহদাহের কোন জায়গাটা লোপাট করতে হবে বুঝিয়ে মোটা বায়না দেয় বল্মী-বিশারদকে।
তাইতেই সর্বনাশ হয়।
পোষা উই-বাহিনী কাজ করে দেয় ঠিকই, কিন্তু একচুল দিক ভুলের দরুন বারণাবতের জতুগৃহের বদলে বিরাট পর্বের ভীম কীচক যুদ্ধটাই দেয় চিরকালের মতো কেটে লোপাট করে।
গান
সাংঘাতিক অবস্থা বাহাত্তর নম্বরের।
কেন, কী হল?
কী আবার হবে! খেয়ে বসে সুখ নেই। রাত্রে ঘুম নেই।
কী হয়েছে কী আসলে?
যা হয়েছে তাই জানাতেই তো টঙের ঘরে সাত সকালে গিয়ে হাজির হয়েছি।
আমাদের চেহারাগুলোই আমাদের বক্তব্যের বিজ্ঞাপন।
শিশিরের চুলে অন্তত হপ্তাখানেক তেল পড়েনি। মাথাটা যেন কাকের বাসা!
গৌর দাড়ি কামায়নি ক-দিন তা কে জানে! জামাটা যে ময়লা আর বোতামগুলো যে ছেঁড়া তা-ও তার খেয়াল নেই।
শিবু গালে ক্ষুর লাগায়নি, মাথায়ও তেল ছোঁয়ায়নি তো বটেই, তার ওপর ক-দিন ক-রাত্রি ঘুম না হওয়ার প্রমাণ স্বরূপ দুচোখের কোণে কালি লাগিয়েছে।
আর আমি? ভয়ে ভাবনায় দিশেহারা হয়ে দুপাটির দুটো আলাদা জুতো দুপায়ে গলিয়ে ভুল করে শিবুর ঢাউস শার্টটাই গায়ে চড়িয়ে এসেছি।
