তার অমন আবৃত্তিটা মাঠে মারা যাওয়ার জন্যে গৌরের মেজাজটাই সবচেয়ে খারাপ। বেশ একটু ঝাঁঝালো গলাতেই সে জিজ্ঞাসা করলে, আসলটা কী ছিল?
কী ছিল? ঘনাদা একটু জীবে দয়া গোছের মুখের ভাব করে বললেন, ছিল সত্যিকার একটি নিযুদ্ধের বিবরণ।
নিযুদ্ধ! সে আবার কী?
প্রশ্নটা আমাদের মুখ দিয়ে বেরোবার আগেই ঘনাদা অবশ্য নিজেই ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিলেন, নিযুদ্ধ মানে বিনা অস্ত্রে লড়াই। তখনকার দিনের শাস্ত্রীয় মল্লযুদ্ধের ওই ছিল আরেক নাম। আর ভীমসেন কীচকের সঙ্গে শাস্ত্রমতেই লড়েছিলেন।
শাস্ত্রমতে লড়েছেন ভীমসেন। তবে যে?
ওই তবে যেটুকুই ফাঁকি। আমাদের বাধা দিয়ে বিবৃত করলেন ঘনাদা, ভীমসেনের অন্য যা দোষই থাক, রাজাগজার মানের জ্ঞান টনটনে। তাই সে মহলের আদবকায়দা সম্বন্ধে খুবই হুঁশিয়ার। জংলি বলে ধরে হিড়িম্বের সঙ্গে যেভাবে যুদ্ধ করেছেন, কীচকের বেলা তা ভাবতেও পারেন না। যত বড় পাপিষ্ঠই হোক, কীচক রাজাগজাদেরই তো একজন। বিরাট রাজার সম্বন্ধী, তার ওপর আবার মৎস্য দেশের সেনাপতি। তাই তাকে মোক্ষম শিক্ষা দিতে গিয়েও শাস্ত্রের বাইরে ভীমসেন যাননি।
শাস্ত্রমতে আসল নিযুদ্ধটা কী রকম হয়েছিল, শুনি? গৌরের গলায় বেশ ছুঁচোলো সন্দেহ।
শুনবে? শোনো তা হলে। ঘনাদা চোখ বুজে যেন ধ্যানস্থ হয়ে ফ্ল্যাশব্যাক-এ দেখার ধারাবিবরণী দিতে শুরু করলেন, শাস্ত্রমতে নমস্কার আর হাত নেওয়ার পর কীচক করল কাস্ফোটন আর ভীমসেন স্কন্ধতাড়ন। এবার দুজনে কক্ষাবন্ধ হয়েছে। ওই কীচক ভীমসেনকে পূর্ণকুম্ভপ্রয়োগ করছে। ভীমসেন টলছে, টলছে, চোখে যেন সর্ষেফুল দেখছে, পড়ে যাচ্ছে কাটা কলাগাছের মতো। ওই পড়ছে, পড়ছে, পড়ল,–না, না, পড়েনি। পড়তে পড়তে ভীমসেন সামলে বাহুকণ্টক লাগিয়েছে। গেল গেল, কীচক বুঝি জরাসন্ধ হয়ে গেল, চিড় খাচ্ছে, খাচ্ছে,-না, ভীমসেনের কৃত-এর পর কৃতমোচন করেছে কীচক, সুসংকট দিয়ে সন্নিপাত করে অবধূত করেছে ভীমসেনকে—
দোহাই! দোহাই, ঘনাদা! একটু থামুন।
সবাই মিলে আর্তনাদ করেই ঘনাদাকে থামাতে হল। কাস্ফোটন স্কন্ধতাড়ন থেকে কক্ষাবন্ধ, পূর্ণকুম্ভপ্রয়োগ পর্যন্ত কোনওরকমে সহ্য করা গেছল, কিন্তু বাহুকণ্টক থেকে কৃত, কৃতমোচন হয়ে সুসংকট, সন্নিপাত ছাড়িয়ে অবধূত-এ পৌঁছার পর আমাদেরই অবস্থা কাহিল। চরকিপাক-লাগা মাথায় তাই প্রায় খাবি খাওয়া গলায় বলতে হল, বনোয়ারিকে দিয়ে ক-টা অ্যাসপিরিন আগে আনিয়ে নিই।
ওঃ! ঘনাদা অনুকম্পায় কোমল হলেন, মাথায় কিছু ঢুকছে না বুঝি! আচ্ছা, বুঝিয়ে দিচ্ছি। এসব হল সেকালের আখড়াই বুলি! বিরাটপুরীর জিমূত পালোয়ানের আখড়া ছিল সবচেয়ে নামকরা। নিযুদ্ধের বুলি সেখান থেকেই বেশির ভাগ আমদানি। কক্ষাস্ফোটন আর স্কন্ধতাড়ন হল লড়াইয়ের আগে মল্লদের হাত-পা নেড়ে যাকে বলে গা-গরম করা—কক্ষাবন্ধ হল লড়াইয়ের প্রথম জাপটাজাপটি মানে আলিঙ্গন। পূর্ণকুম্ভপ্রয়োগ হল দুহাতে আঙুল শক্ত করে শত্রুর মাথায় চাঁটি! এক পা চেপে ধরে আরেক পা টেনে ছেঁড়ার নাম বাহুকণ্টক। শত্রুকে মারের প্যাঁচ হল কৃত, আর সে প্যাঁচ ছাড়ানো মানে কৃতমোচন হল প্রতিকৃত শক্ত ঘুষি-পাকানো হল সুসংকট, আর তার কাজ হল সন্নিপাত। অবধূতহল শত্রুকে ধরে দূরে ছুড়ে ফেলে দেওয়া।
ঘনাদার এ ব্যাখায় মাথা ঘোরা বন্ধ না হলেও ভীমসেনকে অবধূত করার খবরে বেশ একটু বিমূঢ় হয়েই জিজ্ঞাসা করতে হল, স্বয়ং ভীমসেনকে অবধূত মানে দূরে ছুড়ে ফেললে কীচক?
তা তো ফেললেই। ঘনাদা সত্যের খাতিরে স্বীকার করতে যেন বাধ্য হলেন, শুধু কি অবধূত? মাটিতে ফেলে তারপর যা প্রমাথ মানে দলাইমলাই দিতে লাগল তাতে মনে হল, ভীমসেনের হাড়গোড়ই বুঝি গুঁড়ো হয়ে যায়। প্রমাথতেও সন্তুষ্ট না হয়ে ভীমসেনকে তুলে ধরে উন্মথন মানে পেষাই দিতে লাগল কীচক।
ঘনাদা এমন একটা মহাসংকটের গুরুত্ব বোঝাবার জন্যই একটু থামলেন। তারপর ত্রিকালদর্শী টেলিফটো লেন্সটা যেন ঠিক ফোকাস করে নিয়ে চাক্ষুষ ধারাবিবরণীতে মেতে উঠলেন আবার—এখনও উন্মথিত করছে কীচক। কী হল, কী, ভীমসেনের? সাড় নেই নাকি শরীরে? কীচক তো এবার প্রাণের সুখে প্রসৃষ্ট মানে আলগা হাতের চাপড় লাগাচ্ছে। এরপর তো বরাহোদ্ধতনিঃস্বন মানে কাঁধে তুলে মাথা নীচে ঝুলিয়ে ঘোরাতে ঘোরাতে দূরে আছড়ে মারবে। তা হলেই তো খেল খতম!
নাচঘরের দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে দ্রৌপদী ভয়ে কাঁপছেন। কাঁপছেন অলক্ষ্যে বিনা টিকিটে যাঁরা লড়াই দেখতে এসেছেন সেই ছোট-বড় দেবতারা। ভীমসেনের রুস্তম-ই-হিন্দ থুড়ি ভারত- মাতঙ্গ খেতাব বুঝি যায়, ভীমসেন বুঝি মহাভারত ডোবায়। ন্-ন্-ন্-ন্-না—। ওই তো শলাকা মানে, সোজা লোহার মতো শক্ত এক আঙুলের খোঁচা লাগিয়েছে ভীমসেন। যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠে ভীমসেনকে কাঁধ থেকে ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছে কীচক। মাটিতে পড়েই লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে উঠেছে। ভীমসেন। ভীমসেন, না মত্ত মাতঙ্গ। কীচকের চারিধারে অভ্যাকর্ষ অর্থাৎ বাগে পাবার মৌ-কা পেতে পাক দিয়ে ফিরছে ভীমসেন। এক আচমকা অবঘট্টন মানে হাঁটু আর মাথার গুঁতো কীচকের বুকে আর পেটে। তারপর আকর্ষণ, মাটিতে ফেলে বিকর্ষণ, কোলে তুলে হাত-পা দুমড়ে প্রকর্ষণ আর সর্বশেষে প্রাণ-হরণ।
ঘনাদা থামলেন। আমরা অভিভূত স্বরে বললাম, এই তা হলে কীচক বধের আসল বৃত্তান্ত! কিন্তু এতে তো ভীমসেনের লজ্জার কিছু নেই। যা আছে বরং যুদ্ধ হিসেবে গৌরবের। সুতরাং এ সব কথা মহাভারত থেকে লোপাট করার দরকারটা কী ছিল?
