ব্যাপারটা অবশ্য র্যাশনে মিহি চাল পাওয়ার চেয়েও খুশিতে ডগমগ করবার। বাহাত্তর নম্বরের তাই প্রায়ই সবাই হাজির টঙের ঘরে। বাহাত্তর নম্বর বলতেই রহস্যটা বোঝা গেছে নিশ্চয়ই।
হ্যাঁ, অনুমানটা কারওই ভুল নয়। ঘনাদা সত্যিই সদয় হয়েছেন।
আবহাওয়ার এই অভাবিত পরিবর্তনটা সকালবেলাতেই টের পেয়েছি। বেশ একটু ভয়ে ভয়েই গৌর আর আমি সকালবেলা একবার হালচালটা বুঝে নিতে টহলদারিতে এসেছিলাম। ক-দিন ধরে যা খরা হচ্ছে তাতে বৃষ্টি তো বৃষ্টি, একটু মেঘের টুকরোও দেখবার আশা অবশ্য করিনি।
কিন্তু ন্যাড়া সিঁড়ি বেয়ে টঙের ঘর পর্যন্ত পৌঁছবার আগেই বুকগুলো দুলে উঠেছিল। না, বৃষ্টি তখনও না পড়ুক, আকাশ যাকে বলে মেঘমেদুর। ধান একটু মাপতে না মাপতেই কেঁপে নেমে আসবে মনে হয়।
ঘনাদা ঘরের মধ্যে অন্যদিনের মতো তাঁর জগদ্দল কাশীরাম দাসে মুখ গুঁজে বসে নেই। ঘর থেকে বেরিয়ে ছাদের ওপরেই পায়চারি করছেন।
ঘনাদার ছাদে পায়চারি! এমন দৃশ্য আগে তো কখনও কেউ দেখেছি বলে মনে পড়ে না। এ পায়চারির অর্থ কী? আর লক্ষণটা শুভ, না অশুভ? কিছুই ঠিক বুঝতে না পেরে একটু উদ্বিগ্ন হয়েই জিজ্ঞাসা করেছি, কী হয়েছে, ঘনাদা?
হয়েছে? যেতে যেতে ঘনাদা ফিরে দাঁড়িয়েছেন।
ব্যস! ওই ফেরাটুকুতেই যা বোঝবার, আমরা বুঝে নিয়েছি। বুক আমাদের তখনই দশ হাত।
যেটুকু ধন্দ ছিল, ঘনাদার পূরণ করা বাক্যাংশেই তা দূর হয়ে গিয়েছে।
না, হয়নি তো কিছু! ফিরে দাঁড়িয়ে তাঁর কথাটা শেষ করেছেন ঘনাদা, একটু যুদ্ধের কথা ভাবছিলাম।
যুদ্ধের কথা ভাবছিলেন ঘনাদা!
শুনেই কেল্লা ফতে! বলে চিৎকার যে করিনি, সে আমাদের কঠোর আত্মসংযম।
মনে মনে অদ্ভুত ব্যাপারগুলো শুধু একবার ভেবে নিয়েছি। এ পর্যন্ত যা দেখলাম শুনলাম, সবই তো হিসেবের বাইরে।
ঘনাদা সাতসকালে ছাদের ওপর পায়চারি করছেন।
আমাদের ডাকে তিনি ফিরে দাঁড়িয়েছেন ও তখন তাঁর মুখের পেশির কুঞ্চনে যে ভাবটা প্রকাশ পেয়েছে, তাকে প্রসন্ন হাসি বললে মানহানির দায়ে বোধহয় পড়তে হয় না।
সবচেয়ে মোক্ষম কথা হল এই যে, ঘনাদা প্রত্যুষের পদচারণার সঙ্গে যুদ্ধের কথা ভাবছেন বলে নিজমুখে স্বীকার করেছেন।
এর পর আর আমাদের পায় কে!
নেহাত ওপরে আসবার ছুতো হিসেবে বিকেলের মেনুটা একটু আলোচনা করেই নীচে নেমে গেছি তৈরি হয়ে আসবার জন্য।
যুদ্ধের কথা ভাবছেন ঘনাদা। সুতরাং জঙ্গি দপ্তরের সব বিভাগেই খবর চলে গিয়েছে তৎক্ষণাৎ! বনোয়ারি চলে গেছে গরম জিলেবির দোকানে, রামভুজ কড়া চাপিয়েছে নিজেদের হেঁশেলেই কচৌরি ভাজবার জন্য।
আর আমরা ঠিকমতো তোড়জোড় করে সদলবলে গিয়ে হাজির হয়েছি টঙের ঘরে। উপস্থিতিটা ঠিক সময়েই ঘটেছে। ছাদের পায়চারি শেষ করে ঘনাদা ঘরে এসে তাঁর নিজস্ব চৌকিতে বসে বসে গড়গড়ায় দু-একটি টান মাত্র দিয়েছেন।
যুদ্ধের কথা ভাবছিলেন, ঘনাদা? গৌর চৌকাঠে পা দিয়েই শুরু করেছে, যুদ্ধের সেরা কিন্তু মল্লযুদ্ধ, শুনলেই গা গরম হয়ে ওঠে।
গরম হয়ে ওঠার প্রমাণ হিসেবে গৌর আবৃত্তি শুরু করতেও দেরি করেনি–
মহাপরাক্রম হয় কীচক দুর্জয়।
দশ ভীম হৈলে তার সম যুদ্ধে নয়॥
কৃষ্ণার ধরিয়া কেশ আয়ু হৈল ক্ষীণ।
বিশেষ চরণাঘাতে বল হৈল হীন।।
তথাপি বিক্রমে ভীম হইতে নহে ঊন।
পদাঘাত দৃঢ়মুষ্টি হানে পুনঃ পুনঃ॥
আঁচড় কামড় মুণ্ডে মুণ্ডে জড়াজড়ি।
ধরাধরি করি ভূমে যায় গড়াগড়ি।।
কখন উপরে ভীম কখন কীচকে।
শোণিতে জর্জর অঙ্গ পদাঘাতে নখে।।
গৌর আরও খানিক আবৃত্তি চালিয়ে যেতে পারত বোধ হয়। কিন্তু ঘনাদার মুখের দিকে চেয়েই তাকে একটু দ্বিধাভরে থামতে হল।
তখন আমাদেরও বুকে একটু ধুকপুকুনি শুরু হয়েছে।
এই খানিক আগে যেখানে অমন অনুকূল বাতাস বইছিল, সেখানে হঠাৎ একটু গুমোটের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে কি?
ঘনাদা গড়গড়ার নলটা হাতে নিয়ে যেন টানতে ভুলে গেছেন। ভাতের গ্রাস মুখে দিতে দাঁতে যেন একটু বালি পেয়েছেন এমনই মুখের ভাব।
মনে মনে আমরা সন্ত্রস্ত হয়ে উঠলাম।
এমন সুদিনে কোনখানে পান থেকে চুন খসল বুঝতে না পেরে শিশির তাড়াতাড়ি সিগারেটের প্যাকেট খুলে ধরে বলল, তামাকটা বুঝি ঠিক জুতসই হয়নি আজ?
ঘনাদা শিশিরের এগিয়ে দেওয়া সিগারেটের দিকে দৃকপাতও করলেন না। সেই ঈষৎ বালি-চেবানো মুখের ভাব নিয়ে কোন সুদূর ভাবনায় যেন মগ্ন হয়ে অন্যমনস্কভাবে বললেন, না, ভুল।
ভুল! আমরা তো তাজ্জব! ভুলটা কোথায়? তামাক সাজায়?
নিজেদের বুদ্ধির দৌড় মাফিক ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, তামাকটা আর একবার সাজিয়ে দেব, ঘনাদা?
না, ভুল তামাক সাজায় নয়, ঘনাদা গড়গড়ার নলে দু-তিনটে চটপট টান দিয়েই বুঝিয়ে বললেন, ভুল ওই লড়াইয়ের বর্ণনায়।
লড়াইয়ের বর্ণনায় ভুল! ক-দিন ধরে লাইনগুলো মুখস্থ করেছে বলে গৌর বেশ ক্ষুণ্ণ, কিন্তু কাশীরাম দাসের খাঁটি সংস্করণ থেকে তুলে এনেছি।
তা ছাড়া, আমিও এবার একটু মদত দিলাম গৌরকে, কালী সিংহীর আদি মহাভারতের অনুবাদেও তো ওই রকম আছে।
যা আছে তা ভুল। যেন নিতান্ত আফশোসের সঙ্গে জানালেন ঘনাদা, আসলটা পাওয়া যায়নি বলে অমনই করে গোঁজামিল দেওয়া হয়েছে।
আসলটা পায়নি?
মূল মহাভারতেও গোঁজামিল?
কীচক-ভীমের অমন জবর যুদ্ধটার বর্ণনাও বেঠিক?
আমাদের চোখগুলো কপালে ওঠার সঙ্গে সন্দিগ্ধ জিজ্ঞাসাগুলো ভেতরে আর চাপা রাখা গেল না।
