জবাবে জানালাম, আমার পরিচয় পরে পাবেন। আমার প্রলাপ আগে আর-একটু শুনুন। গুয়াম-এর বাইশ মাইল প্রবাল প্রাচীর কীসে ধ্বংস হয়েছে। জানেন নিশ্চয়? অস্ট্রেলিয়ার একশো বর্গমাইল ব্যারিয়ার রিফ-ই বা ধ্বসে গলে গিয়েছে কীসে? সমস্ত প্রশান্ত মহাসাগরে ছড়ানো সব প্রবাল দ্বীপ আজ দিন গুনছে কোন অমোঘ সর্বনাশের? প্রশান্ত মহাসাগরের এই ভয়ংকর অভিশাপের নাম কি অ্যাকান্থাস্টার প্লানচি?
আর কিছু বলতে হল না। গুয়াম-এর প্যাসিফিক কমান্ডের ঘাঁটি থেকেই ব্যস্ত ব্যাকুল প্রশ্ন এল রেডিওতে, এ অভিশাপ কাটাবার উপায় সত্যিই আছে?
জানালাম, আছে কিনা পরখ করেই যান না। আমি বন্দরের বাইরেই স্কুনার নিয়ে অপেক্ষা করছি।
বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই দুটি গান-বোটে প্যাসিফিক হাই কম্যান্ডের তিন-তিন জন মাথা এসে হাজির।
প্রথমটায় তিনজনেই বেশ একটু সন্দিগ্ধ। একজন তো গরম হয়ে আমার ওপর তম্বিই করলেন, কই, কোথায় তোমার প্যাসিফিক বাঁচাবার দাওয়াই?
একটু হেসে তাদের সঙ্গে নিয়ে গিয়ে স্কুনার-এর একটা গুপ্তঘর খুলে দিলাম।
তিনজনই তখন আমার ওপর খাপ্পা, রসিকতা হচ্ছে আমাদের সঙ্গে? এই তোমার দাওয়াই? এ তো এক জাতের শিঙে-শাঁখ ট্রাইটন, ঘর সাজাবার জন্যে শৌখিন লোকেরা চড়া দামে কেনে।
হ্যাঁ, তা কেনে, আর তাই থেকেই প্রশান্ত মহাসাগরের চরম সর্বনাশের সূচনা। গত ক-বছর ধরে হঠাৎ রক্তবীজের মতো লাখে লাখে বেড়ে উঠে যে অ্যাকাস্থ্যাস্টার প্লানচি প্রবাল আবরণ খেয়ে খেয়ে ফেলে প্রশান্ত মহাসাগরের সমস্ত ছোট-বড় দ্বীপ ধ্বংস করে দিচ্ছে ওই শিঙে-শাখ ট্রাইটন তারই যম। বাচ্চা অবস্থাতেই অ্যাকান্থাস্টার প্লানচি খেয়ে ফেলে এই ট্রাইটন তাদের অভিশাপ হয়ে ওঠার মতো বংশবৃদ্ধি করতে দেয় না। কিন্তু নিজেদের লোভে আর আহাম্মকিতে এই ট্রাইটন শিকার করে মানুষ তার নিজের সর্বনাশ ডেকে এনেছে। মানুষের সেই রকম শত্ৰু চারজনকে আপনাদের হাতে তুলে দিচ্ছি, আর সেই সঙ্গে দিচ্ছি প্রশান্ত মহাসাগরকে আবার সুস্থ করে তোলার দাওয়াই এই ট্রাইটন।
ঘনাদা চুপ করলেন। আমাদের সকলের মুখেই তখন এক জিজ্ঞাসা, অ্যাকান্থাস্টার প্লানচিটা কী জিনিস?
জিনিস নয়, প্রাণী, ওর আর একটা ডাক নাম হল কাঁটার মুকুট।
কাঁটার মুকুট? আমরা তাজ্জব, ওই কাঁটার মুকুটেই অস্ট্রেলিয়ার একশো বর্গমাইল ব্যারিয়ার রিফ সোপাট হয়ে গেল? গুয়াম-এর বাইশ মাইল প্রবাল প্রাচীর ধ্বংস হয়ে গেল ওতেই?।
হ্যাঁ। ঘনাদা অর্ধনিমীলিত চোখে গড়গড়ায় একটা সুখ টান দিয়ে বললেন, ওই কাঁটার মুকুট অ্যাকাস্থ্যাস্টার প্লানচি বিকট এক জাতের তারা মাছ। রাবণের কুড়িটি হাত ছিল বলে শুনি, আর হাত-দেড়েক চওড়া এ তারা মাছের ষোলো থেকে একুশটা পর্যন্ত বাহু হয়। সমস্তটাই সাংঘাতিক কাঁটায় ভর্তি। সে কাঁটায় সিগুয়াটেরা নামে এমন এক দারুণ বিষ থাকে যা গায়ে ফুটলে শরীর অসাড় হয়ে যায় আর বমির ধমক থামতে চায় না। ইফালিক অ্যাটল-এ এই কাঁটা লেগেই লিও-র ওই দুর্দশা হয়েছিল। বছর কয়েক আগে পর্যন্ত এই সর্বনাশা তারামাছ সম্বন্ধে হুঁশিয়ার হবার কোনও কারণই ঘটেনি। তারপর জানা-অজানা নানা কারণে সত্যিই রক্তবীজের মতো এ অভিশাপের বংশবৃদ্ধি ঘটেছে। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে সমস্ত প্রবালদ্বীপের তলায় গিজগিজ করছে এখন এই কাঁটার মুকুট। এদের আহার হল প্রবাল। প্রবালের ওপরের খোলস খেয়ে ফেলার পর যে প্রবাল প্রাচীর প্রশান্ত মহাসাগরের সমস্ত দ্বীপের রক্ষাকবচ হিসেবে ঘিরে থাকে তা দুর্বল হয়ে সমুদ্রের প্রচণ্ড ঢেউয়ের আঘাত আর ঠেকাতে পারে না। দ্বীপগুলির চারিধারে সেখানকার সাধারণ মাছ প্রবাল প্রাচীরের আড়ালে আর আশ্রয় পায় না। দ্বীপগুলিও ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে থাকে। এ কাঁটার মুকুটের খিদে এমন রাক্ষুসে যে এদের একটি ঝাঁক এক মাসে আধ মাইল প্রবাল প্রাচীর খেয়ে ফেলতে পারে আর ফেলছেও তাই। এ রাক্ষুসে তারামাছের একমাত্র যম হল শিঙে-শাঁখ ওই ট্রাইটন। ট্রাইটন শিকার বন্ধ করে আবার কাঁটার মুকুটের ওই স্বভাবশত্রুকে বাড়তে দিলে প্রশান্ত মহাসাগরকে বাঁচানো এখন সম্ভব। প্যাসিফিক কম্যান্ডকে এই দাওয়াই-ই বাতলে এসেছিলাম।
খানিকক্ষণ আমাদের জিভ-টিভ সব অসাড়।
কাঁটার খোঁচাটার আসল যে লক্ষ্য সেই শিবু তো লজ্জায় অধোবদন।
ঘনাদাকে প্যাসিফিক কমান্ডের ডাকে যেতে আমরা দিইনি। অত যদি তাদের গরজ তাহলে শুধু টেলিগ্রাম কেন, নিজেরা এসে ঘনাদাকে তারা নিয়ে যাক।
কিন্তু এলে ঠিকানাটা তো তাদের খুঁজে পাওয়া চাই। খবরের কাগজের টু-লেট দাগানো ছেড়ে ঘনাদাকে বাহাত্তর নম্বরেই তাই বাধ্য হয়ে অপেক্ষা করে থাকতে হচ্ছে।
আমাদেরও এ অবস্থায় ঘনাদাকে একলা এখানে ছেড়ে যাওয়া কি ভাল দেখায়?
বাহাত্তর নম্বরই তাই এখনও গুলজার।
কীচক বধে ঘনাদা
উপমাটা কী দেব ভেবে পাচ্ছি না।
আহ্লাদে আটখানা হয়েই বোধহয় কথা জোগাচ্ছে না মাথায়। তাই বেড়ালের শিকে ছেঁড়া, না মরা গাঙে বান ডাকা, কোনটা জুতসই হবে ঠিক করতে দেরি হচ্ছে।
যাক, গুলি মারো উপমায়! আসল কথাটা শোনালেই যখন নেচে উঠতে হবে, তখন উপমার কী দরকার? আর নেহাত যদি উপমা না দিলে মান থাকে না মনে হয়, তা হলে র্যাশনে যেন মিহি চাল পুরো দিয়েছে বলতে দোষ কী?
