আজ্ঞে, আমি—ইফালিক-এর সমুদ্রে যাকে চুবিয়ে মেরেছিলেন সেই দাসের ভূত।
দাসের ভূত! পামার আর তিন সঙ্গী দিশাহারা হয়ে এবার চারিদিকে খুঁজে দেখেছে। কই, কোথাও কারও কোনও চিহ্ন তো নেই।
আকাশবাণীর মতো সেই ভুতুড়ে স্বর আবার শোনা গেছে, অত খোঁজাখুঁজির দরকার নেই। চাক্ষুষই এবার আমি দেখা দিচ্ছি।
দেখা দেবার আগে পামারের দল তখন ভুতুড়ে আওয়াজের হদিস পেয়ে গেছে। একটা মাস্তুলের তলায় বাঁধা একটা রবারের নলের মুখে লাগানো ছোট একটা স্পিকার।
তারা সেটা নিয়ে যখন টানাটানি করছে তখনই পাশের মাস্তুল থেকে ডেক-এর ওপর নেমে এসে দাঁড়িয়েছি।
ওসব নিয়ে টানাটানি করছেন কেন? অধীন আপনাদের সামনেই হাজির।
স্কুনার-এ যেন বাজ পড়েছে এমনই চমকে চারজন আমার দিকে ফিরে দাঁড়িয়েছে এবার।
তুই–!
পামার রাগে তোতলা হয়ে গেছে।
আজ্ঞে হ্যাঁ, আমি। মোলায়েম গলায় বলেছি, ভূত হয়েও আপনাদের ছায়া ছাড়তে পারিনি।
এসব শয়তানি তাহলে তোর?
তুই-ই আমাদের মুখে চুনকালি মাখিয়েছিস?
আমাদের লুকোনো মাল তুই-ই সরিয়েছিস?
চারজনই একসঙ্গে গর্জে উঠেছে তখন।
আজ্ঞে, হ্যাঁ। সবিনয় স্বীকার করে বলেছি, আপনারা অক্সিজেন সিলিন্ডার কেড়ে নিয়ে সমুদ্রের তলায় ছেড়ে দিয়ে আসবার পর দেহটি সেইখানে ছেড়ে সূক্ষ্ম শরীর নিয়ে ওপরে ভেসে উঠি। আপনারা তখন ইফালিক অ্যাটল থেকে ডেরা তুলে এই স্কুনার-এ সরে পড়বার জোগাড় করছেন। সূক্ষ্ম শরীর নিয়ে এই জাহাজেরই ইঞ্জিনঘরে গিয়ে লুকিয়ে রইলাম। তারপর মনে হল আমায় নিয়ে যা রসিকতা এর আগে করেছেন তার একটু ঋণ শোধ না করলে ভাল দেখায় না। তাই আপনাদের মুখগুলোর ওপর একটু হাতের কাজ দেখিয়েছি। শেষ পর্যন্ত আপনাদের বড় সাধের লুকোনো দৌলতও একটু হাতসাফাই করেছি।
আমার কথা শেষ হবার আগেই চারদিক থেকে আফ্রিকার সবচেয়ে খ্যাপা চারটে জানোয়ার যেন আমায় তাড়া করে এল। তাদের একটা গণ্ডার, একটা বুনো মোষ, একটা হাতি, আর একটা সিংহ।
ঠকাস করে প্রচণ্ড একটা শব্দ হল তারপর। আমি তখন জাহাজের রেলিঙের ধারে। অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, আহা, লাগল নাকি?
চার ষণ্ডা যেন তুফানের ঢেউ হয়েই আবার ঝাপিয়ে এল আমার দিকে।
রেলিঙে লেগে দুজনের মাথা ফাটল, আর দুজন রেলিং টপকে পড়তে পড়তে কোনওরকমে রেলিঙের বার ধরে ফেলে নিজেদের সামলাল।
আমি তখন বাণ মাছের মতো পিছলে আবার মাস্তুলের দিকে চলে গেছি। সেখান থেকে যেন মিনতি করে বললাম, মিছিমিছি হয়রান হয়ে মরছেন কেন? বললাম তো, এখন আমি সূক্ষ্ম শরীরে আছি। ভূত-প্রেত কি গায়ের জোরে ধরা যায়?
আমার উপদেশটা মাঠেই মারা গেল। চারমূর্তি আবার এল পাঁয়তাড়া কযে। বাধ্য হয়ে আরও কিছুক্ষণ তাই খেলতে হল তাদের নিয়ে। সে-খেল শেষ হবার পর ডেকের ওপর চার ষণ্ডাই লম্বা। হাপরের মতো তাদের শুধু হাঁপানিই শোনা যাচ্ছে।
চারজনকেই এবার একটু কষ্ট করে বাঁধতে হল। সবশেষে পামারকে বাঁধতে বাঁধতে বললাম, মাপ করবেন, বেশিক্ষণ বাঁধা থাকতে আপনাদের হবে না। গুয়াম-এর কাছেই প্রায় এসে পড়েছি। সেখানে পৌঁছেই আপনাদের ছেড়ে দেব।
গুয়াম! ওই অবস্থাতেই পামার হাঁপাতে হাঁপাতে চেঁচিয়ে উঠল, গুয়াম এখানে কোথায়?
বেশি দূরে নয়। আশ্বাস দিয়ে বললাম, আমরা আপ্রা বন্দরের কাছে প্রায় পৌঁছে গেছি। বেতারে প্যাসিফিক কমান্ডের অনুমতি পেলেই পিটি জেটিতে গিয়ে স্কুনার ভেড়াব।
গুয়াম, আপ্রা, পিটি শুনে চারজনেরই চক্ষু তখন চড়কগাছ। তারই মধ্যে কী যেন বলতে গিয়ে পামারের গলায় অস্পষ্ট একটা গোঙানি শুধু শোনা গেল।
ব্যাখ্যাটা নিজেই এবার করে দিলাম, যতটা ভাবছেন ব্যাপারটা তত আজগুবি নয়। আপনারা ওপরের কনট্রোল রুমে হালের চাকা ঘুরিয়েছেন আর আমি এ ক-দিন। ইঞ্জিনঘরে লুকিয়ে কল বিগড়ে দিয়ে জাহাজের গতি পালটে দিয়েছি।
উত্তরে চারজনে প্রাণপণে বাঁধন ঘেঁড়বার চেষ্টা করলে খানিক। চোখের দৃষ্টিতে আগুন থাকলে তখন ওইখানেই ভস্ম হয়ে যেতাম।
তাদের ওই অবস্থায় রেখে কনট্রোল রুমে গিয়ে রেডিও ট্রান্সমিটার নিয়ে বসলাম।
প্রথমেই তাতে ডাক পাঠালাম, প্যানপ্যান-প্যান।
প্যানপ্যান করলেন তাহলে?—জিভের ডগায় প্রায় এসে গিয়েছিল। কোনও রকমে নিজেকে সামলালাম। আমাদের মনের সন্দেহটা চোখে সম্পূর্ণ কিন্তু লুকোনো বোধ হয় যায়নি।
ঘনাদা তাই আমাদের ওপর একটু করুণা কটাক্ষ করে বললেন, প্যান-প্যানটা বুঝলে না বুঝি? ওটা হল আন্তর্জাতিক রেডিও সংকেত। প্যানপ্যান শুনলেই যেখানে যত রেডিও চালু আছে সব কান খাড়া করে থাকবে। এর পরেই জরুরি কিছু খবর দেওয়া হবে প্যানপ্যান তারই সংকেত।
প্যান-প্যানের রহস্য বুঝিয়ে দিয়ে ঘনাদা আবার বলতে শুরু করলেন, প্যানপ্যান সংকেতের পর যে খবরটা ছাড়লাম সেটি শুনতে দুকথার হলেও একেবারে একটি মেগাটন বোমা। রেডিওতে জানালাম—প্যাসিফিক বাঁচাবার দাওয়াই নিয়ে এসেছি। বন্দরে ঢুকতে দাও।…
খানিকক্ষণ রেডিওতে কোনওদিক থেকে কোনও সাড়াই নেই। রেডিও-সংকেত আর সংবাদ যারা পেয়েছে তারা সবাই বোধহয় হতভম্ব। আমার সংবাদটা আরও দুবার পাঠাবার বেশ কয়েক মিনিট বাদে একটা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ প্রশ্নই শোনা গেল। নেহাত যান্ত্রিক রেডিও না হলে সেটা মেঘ-গর্জনের মতোই শোনাত।
প্রশ্নটা হল, কে তুমি? প্যাসিফিক বাঁচাবার কথা নিয়ে প্রলাপ বকছ?
