এখানকার সমুদ্রের তলার এই কুৎসিত রূপ দেখতে সেদিন অবশ্য আমিই পামারদের এনেছিলাম। এনেছিলাম এই বিশ্বাসে যে আমায় নিয়ে তাদের ফুর্তি করার ধরনটা বেশ একটু আসুরিক হলেও, পামার আর তার সঙ্গীরা একেবারে অমানুষ হয়তো নয়।
আমার সে ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।
আগের দিন পামারের এক সঙ্গী একা একাই সমুদ্রে সাঁতার দিতে গিয়েছিল। ফিরল যখন তখন প্রায় আধমরা! একটা পা যেন পক্ষাঘাতে পঙ্গু হয়ে গেছে আর সেই সঙ্গে অনবরত বমি করছে।
ব্যাপারটা কী হয়েছে তা বুঝে তখনই আমি ওষুধ দিয়ে তাকে সারাবার ব্যবস্থা করি, আর সেই সঙ্গেই পামারকে কয়েকটা স্পষ্ট কথাও শোনাতে বাধ্য হই।
অন্য সময় হলে কী করত তা জানি না, তবে চোখের ওপর তার মরণাপন্ন সঙ্গীকে বাঁচাতে দেখার পর পামার তখন আমার কথায় একটু কান না দিয়ে পারেনি।
কী বলতে চাও তুমি? পামার ঝাঁঝের সঙ্গেই অবশ্য জিজ্ঞাসা করেছিল, সমুদ্রের অভিশাপে লিওর এই দশা হয়েছে?
হ্যাঁ, জোর দিয়েই বলেছি, আর সে অভিশাপ তোমাদের মতো অবুঝ, লোভী মানুষই প্রশান্ত মহাসাগরে ডেকে আনছে।
পামারের বাকি দুই সঙ্গী জো আর মার্ফি তখন ঘুষি বাগিয়ে প্রায় মারমুখো। পামার চোখের ইশারায় তাদের ঠেকিয়ে কড়া গলায় জানতে চেয়েছে, লোভটা আমাদের কোথায় দেখলে?
দেখেছি কাল তোমাদের স্কুনার-এরই গুদাম ঘরে। শান্তস্বরেই বলেছি।
এবার মার্ফি আর জো দুদিক থেকে বুনো মোষের মতো প্রায় আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আর কী! কিন্তু পামারের ধৈর্য অনেক বেশি, দুহাতে দুজনকে রুখে সে বজ্রগম্ভীর স্বরে বলেছে, আমাদের স্কুনার-এ কার হুকুমে তুমি উঠেছিলে?
একটু হেসে বলেছি, হুকুম দরকার বলে তো মনে হয়নি। আপনাদের স্কুবা-ডাইভিং-এর উৎসাহ যে একটা ছল মাত্র তা তো জানতাম না।
পামার অনেক কষ্টে এবারও সঙ্গীদের সামলে জিজ্ঞাসা করেছে, আমাদের লোভে যা ডেকে আনছি সমুদ্রের সে অভিশাপটা কী তা জানতে পারি?
কাল আমার সঙ্গে অনুগ্রহ করে একবার স্কুবা-ডাইভিং-এ গেলেই তা দেখাতে পারব।
পামার আমার অনুরোধ রাখতে রাজি হয়েছে। তার ধৈর্য দেখেই একটু অবাক হয়েছিলাম। আসল মতলবটা তখনও বুঝতে পারিনি।
অসুস্থ লিওকে অ্যাটল-এর তাঁবুতেই রেখে এসে আমরা চারজন তখন স্কুবা-গিয়ার-এর দৌলতে ইফালিক-এর বাইরের সমুদ্রে ড়ুব-সাঁতার দিয়ে চলেছি। প্রবাল-সমুদ্রের অপরূপ রঙিন শোভার বদলে নীচে সেই ফ্যাকাসে সাদা পাথুরে মাটি আর কুৎসিত কাঁটার ঝোপ।
নীচের দিকে নেমে যা দেখাবার ভাল করে দেখাতে যাচ্ছি, এমন সময় পিঠে একটা হ্যাঁচকা টান টের পেলাম। পরমুহুর্তে বুঝলাম আমার পিঠের অক্সিজেন সিলিন্ডার ওপর থেকে পামারের দলের কেউ ছুরি দিয়ে কেটে টেনে নিয়েছে। যেন বিদ্যুতের চাবুক খেয়ে ওপর দিকে ঘুরলাম। কিন্তু তখন আর সময় নেই, আমার অক্সিজেন সিলিন্ডারটা নিয়ে পামার আর তার দুই সঙ্গী তিরের বেগে দূরে চলে যাচ্ছে। বিনা অক্সিজেনে তাদের সঙ্গে সাঁতারে পাল্লা দেবার কোনও আশাই নেই। আর সাঁতরে তাদের ধরতে পারলেও লাভ কী হবে। তাদের তিনজনের কাছে আমি একলা। পামার যে মনে মনে এত বড় শয়তানি ফন্দি এঁটেছে সেটুকু বুঝতে না পেরেই আমি নিজের শমন নিজেই ডেকে এনেছি।
পামার আর তার সঙ্গীরা কী আনন্দে তারপর ইফালিক অ্যাটল থেকে তাদের স্কুনার-এ রওনা হয়েছে তা অনুমান করা শক্ত নয়।
কিন্তু সত্যিই যেন সমুদ্রের অভিশাপ তাদের তখন তাড়া করে ফিরছে। সমুদ্রে প্রথম রাতটা কাটাবার পরই ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে তাদের তিনজন যেমন অবাক একজন তেমনই ক্ষিপ্ত। ক্ষিপ্ত সেই লিও-ও। ঘুমন্ত অবস্থায় তার মুখে কে একদিকে আলকাতরা আর একদিকে চুন মাখিয়ে দিয়েছে।
সেদিন খুনোখুনি একটা ব্যাপার প্রায় হয়ে যাচ্ছিল। জো আর মার্ফি ছাড়া এ কাজ আর কেউ করতে পারে না ধরে নিয়ে লিও প্রথমেই তাদের ওপর চড়াও হয়েছে। নেহাত পামার এসে বাধা না দিলে ব্যাপারটা রক্তারক্তি পর্যন্তই গড়াত।
পরের দিন কিন্তু পামারের মাতব্বরিতেও ঝগড়াটা মিটতে চায়নি! সেদিন ভোরে দেখা গিয়েছে জো আর মার্কির মাথার চুল খাবলা খাবলা করে কে যেন তাদের ঘুমের মধ্যে রাত্রে কেটে দিয়েছে।
পামারকে এদিন গায়ের জোর খাটিয়েই দাঙ্গা সামলাতে হয়েছে। কিন্তু তার পরদিন সকালে তার নিজের মুখেই চুন আর আলকাতরার মাখামাখি দেখবার পর রাগের চেয়ে আতঙ্কটাই বেশি হয়েছে সকলের।
এসব কী ভুতুড়ে ব্যাপার?
সবচেয়ে ভুতুড়ে ব্যাপার তারা সেইদিনই আবিষ্কার করেছে। জাহাজে তাদের লুকোনো গুদামঘর খুলতে গিয়ে পামার একেবারে হতভম্ব। সে-ঘর একদম খালি।
পামার তার স্কুনার-এর ডেক-এ সঙ্গী তিনজনকে ডেকে রেগে আগুন হয়ে এসব কিছুর মানে জানতে চেয়েছে। জ্বলন্ত স্বরে জিজ্ঞাসা করেছে, ঠিক করে বললো, এ
শয়তানি তোমাদের কার?
সঙ্গীদের কারও মুখে কোনও কথা নেই।
পামার তার হাতের শঙ্কর মাছের হান্টারটা দুবার শূন্যে আস্ফালন করে হিংস্র। বাঘের মতো গর্জন করে জানতে চেয়েছে, জবাব না পেলে তিনজনের পিঠের ছাল চামড়া এই চাবুকের ঘায়েই আমি ছাড়িয়ে নেব। এখনও বলো, কে এ কাজ করেছে?
আজ্ঞে, আমি।
পামার আর তার তিন সঙ্গী চমকে দিশাহারা হয়ে চারিদিকে চেয়েছে। কে দিলে এ জবাব? আশেপাশে কোথাও কাউকে তো দেখা যাচ্ছে না।
কড়া রাখবার চেষ্টাতেও একটু কেঁপে-ওঠা গলায় পামার জিজ্ঞাসা করেছে, কে? কে কথা বলছে?
