না, কাশি-টাশি নয়। শিবুকে শুধু একটু চোরা রামচিমটি কাটতে হল তার জিভের রাশ টানবার জন্য।
কাৰৱালাইন দ্বীপপুঞ্জের ইফালিক বলে এক অটল-এ তৎনে গিয়ে উঠেছি। ঘনাদা তখন বলে চলেছেন, নামে অ্যাটল, কিন্তু সত্যিই যেন পরীস্থান। যেমন তার মাঝখানের কাকচক্ষজলের সায়র, তেমনই পরীদের যেন পাউডার বিছানো তার তীর আর তেমনই তার সারা দিনরাত হাওয়ায় দোলা নারকেলের বন।
ইফালিক অ্যাটল-এই পামারের সঙ্গে দেখা। পামার আর তার তিন সঙ্গী মিলে সেই অ্যাটল-এ বাসা বেঁধেছে।
পামারকে দেখলে যেন সমুদ্রের তরুণ দেবতা বলেই মনে হয়। যেমন শক্ত সবল তেমনই সুঠাম শরীর। পামারের সঙ্গী তিনজনও সবাই লম্বা চওড়া জোয়ান, যেন অলিম্পিকস থেকেই সব ফিরেছে। শুধু তাদের মুখগুলো যেন শরীরের সঙ্গে খাপ খায় না। দেহগুলো তাদের গ্রিক দেবতার আর মুখগুলো যেন দানবের।
ইফালিক-এর দুধে ধোয়া বালির তীরে তারা সারাদিন শুধু একটু কোপনি মাত্র পরে জল-খেলা করে। জলে সাঁতার, ঢেউয়ের ওপর তক্তা ভাসিয়ে ঘোড়ার মতো সওয়ার হয়ে দূর সমুদ্র থেকে তীরে ছুটে আসা, যাকে বলে সারফিং, কখনও বা হাতে পায়ে মাছের ডানার মতো ফ্লিপার আর মুখে অক্সিজেনের মুখোশ নিয়ে সমুদ্রের তলায় ড়ুব সাঁতার, এই নিয়ে তাদের দিন কাটে।
ইফালিক অ্যাটল-এ পামার আর তার সঙ্গীদের দেখে আমি প্রথমে বেশ একটু অবাকই হয়েছিলাম। মাইক্রোনেশিয়ার এক অত্যন্ত আদিম গোষ্ঠীর কিছু কিছু লোক ইফালিক ও তার কাছাকাছি প্রবাল-দ্বীপে ও অ্যাটল-এ থাকে বলে জানতাম। ম্যালাও-পলিনেশিয়ান ভাষার মূল কিছু ধারা তাদের কাছে সংগ্রহ করবার আশায় এ দ্বীপে আসা। কিন্তু ইফালিক-এ তাদের তো কোনও চিহ্নই দেখতে পেলাম না।
পামারকে সেই কথাই গোড়ায় জিজ্ঞাসা করেছিলাম। পামার তাচ্ছিল্যভরে কথাটা উড়িয়ে দিয়েছিল। বলেছিল, কে জানে কোথায় গেছে। এখানে থাকলে তো আমরাই এসে তাড়াতাম।
কথাটা ঠাট্টা হিসেবেই নিয়েছিলাম। পামার আর তার সঙ্গীদের কতকগুলো রসিকতা কিন্তু একটু বেয়াড়া ধরনের। যেমন, আমাকে নিয়ে তাদের ঠাট্টা গোড়া থেকে যেন মাত্রা ছাড়িয়ে যেত।
আমি আমার ছোট ইয়ল-এ সেখানে গিয়ে নামবার পরই অভ্যর্থনাটা একটু জোরালো রকম পেয়েছিলাম। নোঙর ফেলে ইয়ল থেকে নামতে নামতেই তো পামারের কোলাকুলিতে ওষ্ঠাগত প্রাণ। সাড়ে ছ-ফুট লম্বা জোয়ান পামার করমর্দন করার ছলে হাতের হেঁচকা টানেই তো প্রথমে বালির ওপর আমায় আছড়ে ফেলল। সেখান থেকে ওঠার পরও রেহাই নেই। এক এক করে পামারের তিন সঙ্গীর হাত-ঝাঁকানির উৎসাহে আরও তিনবার বালির ওপর মুখ থুবড়ে পড়তে হল। শেষবার ওঠবার পর পামার কাছে এসে জড়িয়ে বুকের মধ্যে চিড়েচেপটা করে মার্কিন স্ল্যাং-এ যা বললে বাংলায় তা বোঝাতে গেলে বলতে হয়, কোথা থেকে এলে বল তো, চাঁদ?
অতি কষ্টে ককিয়ে বললাম, দম না পেলে বলি কী করে?
পামার সজোরে বালির ওপর আমায় ছুড়ে দিয়ে আমার অনুরোধ রাখলে। আমি অতি কষ্টে দাঁড়িয়ে ওঠার পর দেখি চারজনই আমায় ঘিরে আছে। পামারের একজন সঙ্গী আবার প্রশ্ন করলে, সত্যি করে বল তো, কী মতলবে এখানে এসেছিস?
যা সত্য তা বলে কোনও লাভ নেই জেনে মিথ্যে একটা অজুহাত তখনই বানালাম। বললাম, স্কুবা-ডাইভিং-এর শখ। তাই নির্জন একটা দ্বীপের খোঁজ করতে করতে এখানে এসে পড়েছি। কোনও মতলব নিয়ে আসিনি।
বেশ, বেশ, পামার পিঠে বিরাশি সিক্কার একটি থাপ্পড় মেরে উৎসাহ দিলে, স্কুবা-ডাইভিং-এর শখ তোমার মিটিয়ে দেব।
তা সত্যিই তারা মিটিয়ে দিলে। রোজ দুবেলা হাতে পায়ে মেছো ফ্লিপার আর পিঠে সিলিন্ডার বেঁধে, মুখে অক্সিজেনের মুখোশ নিয়ে সমুদ্রের তলায় ড়ুব-সাঁতারে যেতে হয়। জলের তলায় যা নাকানিচোবানি তারা খাওয়ায় তাতে শেষ পর্যন্ত শুধু প্রাণটা নিয়ে কোনও মতে ফিরতে পারি।
একদিন সে আশাটুকুও আর রইল না।
পামার আর তার সঙ্গীদের অমানুষিক অত্যাচার তখন কিন্তু একদিক দিয়ে আমার কাছে শাপে বর হয়েছে। জুলুম জবরদস্তির ওই ড়ুব-সাঁতারেই প্রশান্ত মহাসাগরের সর্বনাশ কেমন করে ঘনাচ্ছে আর তার আসানের উপায় কী, সে হদিস আমি আরও লাল করে পেয়ে গেছি।
কিন্তু সমুদ্রের তলাতেই আমার কবর হলে সেখানকার যে ভয়ংকর রহস্য আমি জেনেছি তা তো আমার সঙ্গেই লোপ পাবে।
পামার আর তার সঙ্গীরা সেদিন সেই ব্যবস্থাই করেছে। চারজনেই একসঙ্গে সেদিন স্কুবা-গিয়ার নিয়ে সমুদ্রের তলায় টহলে নেমেছিলাম।
প্রবালদ্বীপের সমুদ্র সত্যিই যেন এক স্বপ্নের রাজ্য। গভীর জলের তলায় নানা আকার ও রঙের প্রবাল যেন এক আশ্চর্য স্বপ্নের ফুলবাগান সাজিয়ে রাখে। সেখানে যেসব মাছেরা ঘুরে বেড়ায় তারাও যেন কোন খেয়ালি শিল্পীর হাতে তৈরি ও আঁকা সব রং-বেরঙের অবাক মাছের কল্পনা।
ইফালিক অ্যাটল-এ সমুদ্রের তলায় একটা ব্যাপার গোড়া থেকেই তাই বিস্মিত করেছে।
প্রবালদ্বীপের সমুদ্র—কিন্তু তার তলায় কোথায় সেই রং-বেরঙের জলের প্রজাপতির মতো মাছ আর প্রবালের সেই পুষ্পিত শোভা?
এখানে প্রথম থেকেই প্রবালের ওপর কী যেন এক অভিশাপ লেগেছে বলে মনে হয়েছে। রং-বেরঙের প্রবালের বদলে শুধু খড়িমাটির মতো ফ্যাসফেসে যেন প্রবালের কঙ্কাল। রঙিন মাছের বদলে সেই সাদা প্রবাল কঙ্কালের ওপর যেন বিদঘুটে সব কাঁটা গাছের ঝোপ।
