কী করবেন ঘনাদা? রং চিনতে ভুল যদি হয়ে থাকে তাহলে তো সর্বনাশ। শিবুকে শুধু আপনিতে তুলেছিলেন আর এবার আমাদের হাতে তো সত্যিই হ্যান্ডনোট লিখে দেবেন।
যা হবার হয় তোক। এ যন্ত্রণা আর সহ্য হয় না। কপাল ঠুকে তাই ঢুকে পড়লাম টঙের ঘরে।
কই, বিস্ফোরণ তো কিছু হল না। ঘনাদা এক মনে তাঁর কলকেতে টিকে সাজাতে সাজাতে একবার শুধু আমাদের দিকে চেয়ে দেখলেন মাত্র। সে চোখে কি ভ্রূকুটি? না, তাও তো নয়।
আর আমাদের পায় কে?
ও কেল্লগ্রাম পাঠানো চলবে না, ঘনাদা। গৌরই মওড়া নিলে। আমরা তখন তক্তপোশের যে যেখানে পারি বসে গেছি।
পাঠানো চলবে না বলছ? ঘনাদাও যেন ভাবিত, কিন্তু ওরা যে আশা করে আছে!
থাক আশা করে! আমাদের মেজাজ গরম! একবার ডাকলেই আপনি মালকোঁচা মেরে ছুটবেন নাকি? আপনার মান সম্মান নেই?
আর তা ছাড়া আপনি তো একবার উদ্ধার করে এসেছেন! গৌরের জোরালো যুক্তি, শোনেনি কেন আপনার কথা!
এখন যদি যেতে হয় তো শুধু কেলগ্রামে হবে না। আমাদের ন্যায্য দাবি— প্যাসিফিক কম্যান্ডের মাতব্বরেরা নিজেরা এসে সাধুক!
ঠিকই বলেছ। ঘনাদা প্রশান্ত মহাসাগরের জন্য একটু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন! কিন্তু মুশকিল হয়েছে কী জানো। একেবারে যে শিরে সংক্রান্তি! এখুনি না রুখতে পারলে প্যাসিফিক যে ডেড সি হয়ে যাবে দুদিনে। প্রশান্তর বদলে গরল সাগর!
গরল সাগর হয়ে যাবে? কীসে?
কীসে আর,ঘনাদা তাঁর দৃষ্টিটা শিবুর ওপরই ফোকাস করে বললেন, কাঁটায়।
কাঁটায়? কীসের কাঁটা? শিবু তার অস্বস্তিটা সন্দেহের সুরে চাপা দিলে।
বাটা কি কই-এর কাঁটা নয়, ঘনাদা চুটিয়ে শোধ নিলেন, কাঁটা হল অ্যাকাস্থ্যাস্টার প্লানচির, যার আরেক নাম হল কাঁটার মুকুট।
কী হয় সেই—ওই কী হলে একান যা যা…
থাক! থাক! জিভে গিঠ পড়ে যাবে! ঘনাদার কাছে শিবুর আজ রেহাই নেই— তার চেয়ে কাঁটার মুকুটই বলো। কী হয় ও-কাঁটার মুকুটে জিজ্ঞাসা করছ? যা হয় তা জানাতে গিয়ে ক্যারোলাইন দ্বীপপুঞ্জের ইফালিক অ্যাটল-এ সমুদ্রের তলাতেই হাড় ক-খানা মাছেদের ঠোকরাবার জন্যে প্রায় রেখে আসছিলাম।
মাছেদের রুচল না বুঝি! প্রায় সর্বনাশই করে বসল শিবু তার গায়ের জ্বালাটা চাপতে না পেরে।
আমরা তো তখন দম বন্ধ করে আছি।
রুচল না-ই বলতে পারো! ঘনাদা কিন্তু একটু হেসে বললেন, তবে তা রুচলে সিগুয়াটেরা আর শিঙে-শাঁখ ট্রাইটন, স্কুবা গিয়ার আর দশানন রাবণেরও দর্পহারী যোল থেকে একুশ বাহুবলে বলী সমুদ্রত্রাস অ্যাকান্থাস্টার প্লানচি-র কথা অজানাই থাকত, আর প্যাসিফিক কম্যান্ডের টনক নড়বার আগে অর্বেক প্যাসিফিকই যেত, সত্যি যাকে বলে, রসাতলে। যাক সে কথা।
মাথাগুলো তখন ঘুরছে, কিন্তু ঘনাদাকে যে আবার না চাগালে নয়!
আমাদের কথা যেন ভুলে গিয়ে নির্লিপ্ত নির্বিকার ভাবে তিনি যে তাঁর গড়গড়ায় টান শুরু করেছেন!
চোখের দৃষ্টিতে শিবুকে প্রায় ভস্ম করে ঘাটের কাছে এ ভরাড়ুবি বাঁচাবার উপায় খুঁজছি, এমন সময় টঙের ঘরের দরজায় স্বয়ং সংকট-মোচনের আবির্ভাব।
বেশটা অবশ্য তাঁর বনোয়ারির আর হাতে সদ্যভাজা দিগ্বিদিকে সুবাস ছড়ানো মশলা পাঁপরের একটি চ্যাঙাড়ি।
বুঝলাম তাড়াতাড়িতে এর চেয়ে জবর কিছুর ব্যবস্থা করে আসতে পারেনি শিশির।
কিন্তু দিনটা আমাদের পয়া। ওই মশলা পাঁপরেই ডবল প্লেট প্রন কাটলেটের কাজ হয়ে গেল। তার আগে ছোট একটু ফাঁড়া অবশ্য কাটাতে হয়েছে।
ঘনাদা গন্ধের টানেই মুখ ঘুরিয়েছিলেন। বনোয়ারি চ্যাঙাড়িটা তাঁর সামনেই সসম্মানে রাখবার পর গড়গড়ার নলটা সরিয়ে যেন অন্যমনস্কভাবে একটা তুলে নিয়ে কামড় দিয়েই হঠাৎ থেমে গিয়ে বলেছেন, নীচে রামভুজের ভাজা নাকি?
বনোয়ারি কী যেন বলতে যাচ্ছিল। আমরা সবাই এক সঙ্গে হাঁ হাঁ করে উঠেছি।
রামভুজের ভাজা মানে! রামভুজের হাতের পাঁপর এমন, দাঁতে দিলে কথা বলবে। দস্তুরমতো মোড়ের রাজস্থানি পাঁপর!
সেই সঙ্গে পাছে বেফাঁস কিছু বলে ফেলে বলে বনোয়ারিকেও তাড়া দিতে হয়েছে, যা যা, দেরি করিসনি। চা নিয়ে আয় শিগগির।
আমাদের আশ্বাসে নিশ্চিন্ত হয়ে চা আনতে আনতেই অর্ধেক চ্যাঙাড়ি অবশ্য একাই ফাঁক করে ফেলেছেন ঘনাদা।
তারপর মৌজ করে তাঁকে চায়ে চুমুক দিতে দেখে সুতোটা আবার ধরালাম। ইচ্ছে করে একটু ন্যাকাও সাজতে হল, প্যাসিফিকে কোথায় কোন টোলের কথা যেন বলছিলেন আপনি!
টোল নয়, অ্যাটল! ঘনাদা শুধরে খুশি হলেন, অ্যাটল কাকে বলে জানো নিশ্চয়। অকূল সমুদ্রের মাঝখানে প্রবালে গড়া এক-একটা গোলাকার স্থলের বালা আর সেই বালার মাঝখানে স্বপ্নের মতো এক সায়র। মাঝখানের এই সায়রটুকুর জন্য অ্যাটল সাধারণ প্রবালদ্বীপ থেকে আলাদা। আকারেও তা ছোট। প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝখানে অসংখ্য এই সব প্রবাল দ্বীপ আর অ্যাটল-এর ফুটকি ছড়ানো।
অ্যাটল তো নয়, সে যেন পৃথিবীতে নন্দনকাননের নমুনা। গিলবার্ট মার্শাল মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জ ঘুরে তখন ক্যারোলাইনে গিয়েছি সেখানকার ম্যালাও-পলিনেশিয়ান ভাষার আদি রূপ খুঁজে বার করতে।
সেটা রথ দেখা মাত্র। আসল কলা বেচার কাজ হল প্যাসিফিকে গোলনে শিঙে শাঁখের শুমারি নেওয়া আর তার চোরা শিকারিদের শায়েস্তা করা। আই. জি. এম. সি. ও. মানে ইন্টার গভর্নমেন্টাল ম্যারিটাইম কনসলটেটিভ অর্গানিজেশনই অবশ্য পাঠিয়েছিল।
