লালের জবাব তো সবুজ! তাই দিতে হবে এবার।
সবুজ আবার কী জবাব? আমরা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেছি।
উনি লাল পেন্সিলে দাগাচ্ছেন, শিবু ব্যাখ্যা করেছে, আমরা সবুজে দাগাব কাল থেকে!
কী দাগাব?
কী আবার! ওই বাড়িভাড়ার বিজ্ঞাপন। শিবু নিজের প্রস্তাবে নিজেই মেতে উঠে বুঝিয়ে দিয়েছে, আমরাও এ বাহাত্তর নম্বর ছেড়ে দিচ্ছি—তাই কাল সকালে প্রথমেই টু-লেট-এর পাতায় সবুজ দাগ পড়বে।
শিবুর ওপর যত রাগই করি, ফন্দিটা তার নেহাত মন্দ নয়। অন্তত ড়ুবতে বসে শেষ কুটো হিসেবে একবার ধরা যায়।
কিন্তু তাতেই অমন বাজিমাত হবে আমরাই কি ভাবতে পেরেছি।
সবুজ পেন্সিল আগেই জোগাড় করা ছিল। ভোরে উঠে একেবারে রাস্তায় গিয়েই কাগজওয়ালার হাত থেকে ইংরেজি, বাংলা দুটো কাগজই নিয়েছি। তারপর সুবজ দাগ মেরেছি খাবারঘরেই বসে বসে।
দাগ মেরেছি খুব বিবেচনা করে মাত্র দুটি বিজ্ঞাপনে। ঘনাদার যেমন আমিরি নজর, আমাদের তেমনি ফকিরি। কোথায় দূরে শহরতলির কোন এঁদো গলিতে সস্তা ভাড়ায় টালির ছাদের দুটো ঘর। দাগ মেরেছি তাতেই। দাগ মেরেছি তারও অধম এজমালি উঠোন বাথরুমের আর একটা ঘর-ভাড়ার বিজ্ঞাপনে।
সকালের চায়ের ট্রের সঙ্গে—চা-টাও অন্য হোটেলের বলেই ধরে নেন ঘনাদা— বনোয়ারি যথারীতি খবরের কাগজগুলো নিয়ে গিয়েছে টঙের ঘরে।
আমরা সবাই মিলে তখন বাহাত্তর নম্বর থেকেই হাওয়া। প্রতিক্রিয়াটা পরে রামভুজের মারফতই জানতে পেরেছি।
সকালে কাগজ উলটে ঘনাদার চোখ যদি একটু কপালে উঠে থাকে, তার সাক্ষী কেউ নেই। কিন্তু দুপুরে টিফিন কেরিয়ার বয়ে নিয়ে গিয়ে তাঁর পাত সাজাবার সময় রামভুজকে প্রথমে দু-একটা নেহাত যেন অবান্তর প্রশ্নের জবাব দিতে হয়েছে।
নীচে যে আজ সব কেমন ঠাণ্ডা মনে হচ্ছে, রামভুজ?
এমনই একটু ছুতো পাবার আশাতেই রামভুজকে ভোর থেকে সব শিখিয়ে পড়িয়ে রাখা হয়েছে। সে আশা বিফল হয়নি। রামভুজও আমাদের শিক্ষার মান রেখেছে।
ঘনাদা কথাটা পাড়তে না পাড়তেই রামভুজ হতাশ মুখ করে জানিয়েছে যে তার আর বনোয়ারির হয়রানির অন্ত নেই। বাবুরা সেই ভোরবেলা বেরিয়েছেন। কখন ফিরে আসবেন কে জানে! যতক্ষণ না আসেন তাদের এই হেঁশেল পাহারা দিয়ে বসে থাকতে হবে।
তা ওঁরা গেছেন কোথায়! এবার ঘনাদার প্রশ্নটা আর ঘোরালো নয়, গলাটাও তীক্ষ।
রামভুজ এবার আসল বোমাটি ছেড়ে যেন অত্যন্ত কাতরভাবে জানিয়েছে যে বাবুরা নাকি কোথায় নতুন বাসা দেখতে গেছেন। এ বাড়ি তাঁরা ছেড়ে দেবেন।
এবাড়ি ছেড়ে দেবেন! ঘনাদার গলায় মেঘের ডাকটা যেন কেমন ঝিমোনো মনে হয়েছে।
হাঁ, বড়াবাবু! রামভুজ চিড়টায় চাড় লাগিয়েছে। আপনে ই মোকান ছোড়কে যাচ্ছেন, বাবুরাও তাই ইখানে আর থাকবেন না।
ব্যস, রামভুজের এর বেশি কিছু বলবার দরকার হয়নি। দুপুরে একটু দেরি করে ফেরার পর খাবারঘরে তার কাছেই বিবরণটা শুনে ওষুধ একটু যেন ধরেছে বলে আশা হল।
আশা হবার একটা কারণ ঘনাদার হাতফেরতা খবরের কাগজগুলো। সেগুলো নিয়মমতোই ঘনাদা ফেরত পাঠিয়েছেন, কিন্তু টু-লেট-এর সারিতে লাল দাগ কোথায়? আমাদের সবুজ পেন্সিলের দাগরাজিই সেখানে একেশ্বর হয়ে জ্বলজ্বল করছে।
হাওয়া একটু ঘুরেছে তাহলে নিশ্চয়। চাল বদলে এবার কোন দিকে মোড় ফিরবেন ঘনাদা?
মোড় যা ফিরলেন তা মাথা ঘোরাবার মতোই।
বিকেলে আড্ডাঘরে জমায়েত হয়ে ঘনাদার পরের চাল আন্দাজ করবার চেষ্টা করছি, এমন সময় সেই টেলিগ্রাম।
না, পোস্টাফিসের বিলি করা টেলিগ্রাম নয়, ঘনাদা রামভুজের হাতে টেলিগ্রাম করতে যা পাঠাচ্ছেন তারই খসড়া।
রামভুজ সে খসড়া নিয়ে অসহায়ভাবেই আমাদের শরণ নিতে এসেছে।
বড়াবাবু তার আভি তুরন্ত ভেজতে বোললেন। আমি তো কৈসে ভেজবে কুণ্ডু জানি না।
কী এত জরুরি টেলিগ্রাম! রামভুজের হাত থেকে নিয়ে দেখতেই হল খসড়াটা। দেখে খানিকক্ষণ কারও মুখে আর কোনও কথা নেই। পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে সবাই তখন হাঁ হয়ে আছি।
টেলিগ্রাম কোথায়! এ তো কেল্লগ্রাম। ভাষাটা এই
PACIFIC COMMAND
GUAM
ACCEPTING OFFER BUT ANGRY BECAUSE PRESCRIPTION NOT FOLLOWED, HOWEVER DONT PANIC, SHALL SAVE THE PACIFIC AGAIN.
DAS.
মানে বুঝলে কিছু? শিবুই প্রথম সবাক হল, ঘনাদা প্যাসিফিক কম্যান্ড মানে গোটা প্রশান্ত মহাসাগরের মুরুব্বি কর্তাদের প্রায় ধমকে টেলিগ্রাম করেছেন।
গায়ে পড়ে নিজে থেকে টেলিগ্রাম নয়, এটা তাদের টেলিগ্রামের জবাব, বিস্তারিত করলে গৌর, তারা সাধাসাধি করায় অনেক কষ্টে রাজি হয়েছেন প্রশান্ত মহাসাগরকে আবার উদ্ধার করতে।
ওই আবার কথাটা মনে রেখো। শিশির স্মরণ করালে, তাব মানে এর আগেও একবার উদ্ধার করেছিলেন, কিন্তু তাঁর বিধান না শোনায় নতুন করে আবার বিপদ বেধেছে। আবার উদ্ধার করবার আশ্বাস দিয়েও তাই রাগটা জানাতে ছাড়েননি।
কিন্তু এটা লাল, না সবুজ? জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
ঠিক! ঠিক! সবারই এবার খেয়াল গেল কথাটা।
লাল তো ঠিক নয়। দ্বিধাভরে বললে শিশির।
একটু সবজে ঝিলিক যেন মারছে! গৌর আশায় দুলল।
আলবত সবুজ? তুড়ি মেরে বললে শিবু।
হাতে পাঁজি তো মঙ্গলবার কেন? খসড়াটা নিয়ে আমি টঙের সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালাম। অন্যেরাও আমার পেছনে। শিশির শুধু চট করে নেমে গিয়ে হেঁসেলে কী যেন বলে এল।
পা তো বাড়ালাম, কিন্তু সিঁড়ির একটা করে ধাপ উঠি আর ধুকপুকুনিও বাড়ে।
