আপনি হোটেল কেনো যাবেন, বড়াবাবু, শশব্যস্ত হয়ে বলেছে রামভুজ, আপনার খানা তো হামি ইখানেই লায়ে দিচ্ছি।
ঘনাদা রামভুজের দিকে স্নেহভরেই তাকিয়েছেন এবার।
তা তুমি আনতে পারো, রামভুজ, কিন্তু এখানকার কিছু নয়। এখানে আমি আর খাব না।
খাইবেন না ইখানে! মুখটা পুরোপুরি হাঁ হয়ে যাবার আগে ওইটুকু বলতে পেরেছে রামভুজ।
উত্তর দেওয়াও বাহুল্য মনে করে ঘনাদা শুধু মাথা নেড়েছেন দুবার।
ঘনাদার এ চরম ঘোষণার পর প্রায় বিহ্বল অবস্থায় নেমে এসে রামভুজ আমাদের সব জানিয়েছে।
একটা কিছু ধাক্কার জন্য আমরা প্রস্তুতই ছিলাম। কিন্তু সেটা এমন উৎকট হবে
ভাবতে পারিনি।
আমাদের অমন মুহ্যমান দেখে হতাশভাবে জিজ্ঞাসা করেছে রামভুজ, হামি এখোন কী কোরবে! হামাকে খানা তো বাহারসে লাতে বোলিয়েছেন।
লাতে বোলেছেন তো লাও, শিবু হঠাৎ চটে উঠেছে, খাবার লাতে তো বোলেছেন, পয়সা দিয়েছেন?
পয়সা উনি আগে দেবেন! শিশিরই ঘনাদার মান বাঁচাতে রুখে দাঁড়িয়েছে, উনি কি তোমার আমার মতো হেঁজিপেঁজি যে নগদা দামে সওদা করেন! যত ওপরে তত সব ধারে কারবার। মার্কিন মুলুক হলে ওঁর ক্রেডিট কার্ড থাকত তা জানো! শুধু একটু পাঞ্চ করিয়েই যেখানে যা প্রাণ চায় নিতেন।
হ্যাঁ, সেই ভুলই করেছেন নিশ্চয়। গৌর শিশিরকে ঠোকা দিয়েছে, বনমালি নস্কর লেনটা ভেবেছেন ফিফথ অ্যাভেনিউ।
এর পর ঘনাদার ভুলটা আমাদেরই সামলাতে হচ্ছে তাঁর ক্রেডিট কার্ড-এর দায় নিয়ে।
তার জন্য ঝামেলা বড় কম নয়। একটা নয়, দু-দুটো টিফিন কেরিয়ার আনতে হয়েছে কিনে। থালা-বাটি গেলাসগুলো অবশ্য আমাদের বাহাত্তর নম্বরেরই। ঘনাদা সেগুলো চিনতে পারেননি বা মাপ করে যাচ্ছেন।
তা মাপ করবার জন্য পুজোও চড়াতে হচ্ছে কি কম! দুটি টিফিন কেরিয়ার ভর্তি নৈবিদ্যি দুবেলা পাঠাতে হচ্ছে আমাদের ওই বাহাত্তর নম্বরের হেঁশেলেই রান্না করে।
সে রান্নার গন্ধ তাঁর টঙের ঘর থেকেই ঘনাদার পাবার কথা, কিন্তু নাকের সে কাজটা তিনি আপাতত মুলতুবি রেখেছেন বোধহয়। রামভুজ আর বনোয়ারি তাঁর খাবার নিয়ে যাবার পরে মাঝে মাঝে তিনি শুধু একটু তারিফ করে তাদের কৃতার্থ করেন।
হোটেলটা তো ভালই খুঁজে বার করেছ, রামভুজ! রান্না-টান্না তত বেশ সরেস মনে হচ্ছে! হোটেলটা কোথায়?
এই নীচে, বড়াবাবু, রামভুজ লজ্জিত হয়ে বলে, এই নীচেই আছে! ঘনাদা ওইটুকুর বেশি আর খোঁজ নেওয়া প্রয়োজন মনে করেন না, এই বাঁচোয়া।
কিন্তু এমন করেই বা চলবে কতদিন! ছুঁচ হয়ে শুরু হয়ে ব্যাপারটা সত্যিই যে ফাল হতে চলেছে। অথচ লাল পেন্সিলে টু লেট বিজ্ঞাপন দাগানো আর বাহাত্তর নম্বরের পৃথগন্ন হওয়ার ব্যাপারটা আরম্ভ হয়েছিল অতি সামান্য ছুতো থেকে।
দোষটা অবশ্য শিবুর। ঘনাদা না হয় পাতে দু-দুটো প্রমাণ সাইজের বাটামাছ ভাজা নিয়েও একটি চিপটেন কেটেছিলেন, বাটা মাছ এনেছ হে! এ যে বড় কাঁটা!
তাই বলে পরের দিন ওই শোধটুকু না নিলে চলত না?
শিবুই আজকাল আমাদের পার্মানেন্ট মার্কেন্টিং অফিসার। ঘনাদাকে কচি মুলো খাওয়াবার সেই কেলেঙ্কারির পর মনে মনে তার বোধহয় একটু জ্বালাই ছিল। বাজারের সেরা বাছাই করা বাটার নিন্দায় সেটা আরও চাগিয়ে উঠেছে।
পরের দিন কী একটা ছুটির তারিখ। দুপুরবেলা বেশ একটু জমিয়ে খেতে বসে ঘনাদাকে ঘন ঘন আমাদের সকলের থালাগুলোর ওপর চোখ বোলাতে দেখে একটু অবাক হয়েছি। আমাদের নজরও তখন গেছে ঘনাদার পাতে।
সত্যিই তো অবিশ্বাস্য ব্যাপার। আমাদের সকলের পাতে বড় বড় জোড়া কই আর ঘনাদার পাতে কী ও দুটো। আরে! ও তো বেলেমাছ! আমাদের কই আর ঘনাদার বেলে!!
ঠাকুর! আমরাই ঘনাদার আগে ডাক দিয়েছি।
কাঁচুমাচু মুখ করে রামভুজ এসে দাঁড়াতেই বুঝেছি ব্যাপারটা নেহাত দৈবদুর্ঘটনা নয়।
ঘনাদার পাতের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে জিজ্ঞাসা করেছি সবিস্ময়ে, ঘনাদার পাতে বেলেমাছ কেন?
রামভুজকে জবাব দিতে হয়নি! এতক্ষণ মাথা নিচু করে যে কইমাছের কাঁটা বাছছিল সেই শিবু মুখ তুলে চেয়ে এ-রহস্যে আলোকপাত করেছে।
সহজ সরল গলায় বলেছে, বেলেমাছ আমি দিতে বলেছি।
তুমি দিতে বলেছ! আমরা হতভম্ব! আমাদের বেলা কই আর ঘনাদার বেলা বেলে!
হ্যাঁ, শিবু যেন আমাদের এই তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে বাড়াবাড়িতেই অবাক, অন্যায়টা কী হয়েছে তাতে! ঘনাদার কাঁটাতে ভয়, তাই ওঁর জন্য আলাদা মোলায়েম মাছ এনেছি।
আমরা স্তম্ভিত নির্বাক।
নিস্তব্ধ ঘরে শুধু একটা হু শোনা গেছে।
না, মেঘের চাপা গর্জন নয়, ঘনাদা তাঁর নিজস্ব মন্তব্য ওই ধ্বনিটুকুতে প্রকাশ করেছেন।
তারপর পাত ফেলে উঠে গেছেন কি? না, তা ঠিক যাননি, তবে এক মুহূর্তে আমরা যেন তাঁর কাছে হাওয়া হয়ে গেছি। আমাদের সাধ্যসাধনা মিনতি যেন তাঁর কানেই পেঁৗছয়নি।
খাওয়া শেষ করে ঘনাদা ওপরে উঠে গেছেন। আমরা শিবুকে নিয়ে পড়ে তাকে। প্রায় ছিঁড়ে খেয়েছি। কিন্তু হাতের তির ছুটে গেলে ধনুকের ছিলা ছিঁড়েখুঁড়ে আর লাভ কী! যা হয়ে গেছে তা তো আর ফিরবে না।
তবু অল্পে-স্বল্পে রেহাই পাবার আশায় বিকেল না হতেই রামভুজকে টঙের ঘরে পাঠিয়েছিলাম। ফল যা হয়েছে তা তো জানা। সেই থেকেই টিফিন কেরিয়ারে হোটেলের খানা আর কাগজ দাগানো লাল মানার দিন চলেছে।
কিন্তু একটা কোনও নিষ্পত্তি তো আর না হলে নয়।
মুশকিলের যে মূল, আসানের ফিকিরটা তার মাথা থেকেই বেরিয়েছে। হ্যাঁ, শিবু-ই উপায়টা বাতলেছে নেহাত রাগের ঝাঁঝটা প্রকাশ করতে গিয়ে।
