যাঁর উদ্দেশে এই বাগবিস্তার তিনি কি কালাবোবা হবার ভান করেছেন?
না। পেন্সিল হাতে নিয়ে খবরের কাগজটার যে পাতায় তিনি দাগ দিচ্ছিলেন সেটা শিবর প্রায় কোলের ওপরেই যেন নিজের অজান্তে সরিয়ে রেখে তিনি গম্ভীরভাবে শিবুর দিকে চেয়ে বলেছেন, আপনাদের ভাবনা করবার কিছু নেই। যাবার আগে এ ঘরের ভাড়া আমি চুকিয়ে দিয়ে যাব। দেখতেই তো পাচ্ছেন বাসা খুঁজছি।
দেখতে শিবু খুব ভাল রকমই তখন পেয়েছে। কাগজে বাড়ি ভাড়ার বিজ্ঞাপনের কলমে ঘনাদা তাঁর লাল পেন্সিলে মোটা মোটা করে দাগ মেরেছেন।
কিন্তু সে দাগরাজি বা তাঁর টঙের ঘরের ভাড়া মিটিয়ে দেবার আশ্বাসে যতটা নয়, তার চেয়ে তুমি থেকে আপনির চুড়োয় আচমকা চালান হয়েই শিবুর তখন টলটলায়মান অবস্থা।
আমাদের সকলেরও তাই।
ঘনাদা পনি বললেন তোকে? শিশিরের চোখ কপালে-তোলা প্রশ্ন।
তুই ঠিক শুনেছিস? আমার সন্দিগ্ধ জিজ্ঞাসা।
হ্যাঁ, হ্যাঁ—শুনেছি। একবার নয়, অন্তত দশবার। শিবু উত্তেজিতভাবে বলেছে, শেষে হ্যান্ডনোটই না লিখে দেবার কথা বলেন, তাই পালিয়ে এসেছি।
হ্যাঁ, লাল নিশানা খুনখারাপির রাঙা চোখে পৌঁছবার পর সেটাও অসম্ভব নয়।
খবরের কাগজের দাগরাজিই ছিল প্রথম লাল নিশানা।
ঘনাদা যে নিত্য নিয়মিতভাবে খবরের কাগজের টু-লেট পঙক্তি দাগাচ্ছেন, গোড়াতেই তা জানা গেছে। অজানা থাকবার জো কী!
ঘনাদার পড়া হয়ে যাবার পর কাগজগুলো আমাদের আড্ডাঘরেই এনে রাখা হয়। এখন আবার তাতে ভুল কি গাফিলি করবার উপায় নেই বনোয়ারির। ঘনাদার জরুরি নির্দেশটা প্রতিদিন টঙের ছাদ থেকে বেশ জোরালো গলাতেই ঘোষিত হয়।
আরে, বনোয়ারি, কোথায় গেলি! কাগজগুলো নিয়ে যা। শেষে কাগজগুলোর ওপর মৌরসি পাট্টার দায়ে না পড়ি।
এ ঘোষণাটা সকালে দুপুরে নয়, ঠিক বিকেলবেলা আড্ডাঘরে আমরা এসে জমায়েত হবার পরই শোনা যায়।
বনোয়ারির যেটুকু দেরি হয় কাগজ নামিয়ে আনতে আমাদের সেটুকু সবুরও যেন সইতে চায় না। কাগজ এলেই একটি বিশেষ পাতার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ি।
বেশি খোঁজাখুঁজি করতে হয় না। ঘনাদার লাল পেন্সিলের দাগ সূক্ষ্ম-টুক্ষ্ম তো নয়, একেবারে লাঙলের ফলা দিয়ে যেন টানা।
কী রকম বাসা ঘনাদা খুঁজছেন তার একটু নমুনা দাগমারা টু লেট-এর বিজ্ঞাপন থেকে অবশ্য পাই।
ঘনাদার বড় খাঁই-টাই নেই। চাহিদা তাঁর যৎসামান্য। মাথা গোঁজবার একটু ঠাঁই হলেই তিনি যে খুশি দাগানো বিজ্ঞাপন পড়লেই তা বোঝা যায়।
এক বিঘা জমিতে বাগান ঘেরা একটি ত্রিতল হাল ফ্যাশানের বাড়ি। আগাগোড়া মোজেইক। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, উপরে নীচে চারিটি শয়নকক্ষ। আচ্ছাদিত বারান্দা। গ্যারেজ ও অনুচরদিগের পৃথক ব্যবস্থা। ভাড়া মাসিক বারোশত টাকা।
কিংবা–
নবনির্মিত বিশ তলা টাওয়ার বিল্ডিংসের উপর তলায় দুইটি সংযুক্ত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যথোচিত আনুষঙ্গিক সহ তিনটি করিয়া শয়নকক্ষের ফ্ল্যাট। একটি স্বয়ংক্রিয় ও আর-একটি অনুচর চালিত লিফট।
এর বেশি উঁচু নজর ঘনাদার নেই।
প্রতিদিন এই লাল পেন্সিলে দাগানো বিজ্ঞাপন তো পড়তেই হচ্ছে। তার ওপর দুবেলা বড় বড় দুটি টিফিন কেরিয়ারের সঙ্গে থালা বাটি গেলাসের ঝোলা আর জলের জগ বয়ে নিয়ে যাওয়ার মিছিল দেখেও ধৈর্য ধরে ছিলাম। কিন্তু শিবুর সঙ্গে আমাদের হঠাৎ আপনি হয়ে ওঠাটা ভাবনা ধরিয়ে দিল। রামভুজের কাছে গোপনে খবরটা তাই নিতে হল।
বড়বাবুর সেবা ঠিক হচ্ছে তো, রামভুজ?
জি, হাঁ। রামভুজ জোর গলায় জানালো।
টিফিন-কেরিয়ার দুটো দুবেলা ঠিক মতো ভর্তি হয়ে যাচ্ছে তো?
রামভুজ সে বিষয়েও আশ্বস্ত করলে। টিফিন কেরিয়ার বোঝাই করে পাঠাবার ব্যাপারে কোনও ত্রুটি নেই। নিত্য নতুন পদ সে নিজে হাতে বেঁধে টিফিন কেরিয়ারে ভরে বনোয়ারিকে দিয়ে পাঠাচ্ছে। টিফিন কেরিয়ার দুটোয় অরুচির প্রমাণও পাওয়া যায়নি এখনও পর্যন্ত। চাঁছাপোঁছা হয়েই তো ফিরে আসছে প্রতিদিন।
তাহলে উপায়?
উপায় ভাববার আগে টিফিন কেরিয়ারের রহস্যের একটু ব্যাখ্যা বোধ হয় প্রয়োজন।
ঘনাদা বেশ কিছুদিন থেকে খবরের কাগজের টু লেট কলমে দাগ মেরে ৩ ধ বাসা-ই খুঁজছেন না, আমাদের বাহাত্তর নম্বরের অন্নজলও ত্যাগ করেছেন।
তাই তাঁর জন্য আজকাল একটা নয়, দু-দুটো টিফিন কেরিয়ারে দুবেলা খাবার যায় তাঁর টঙের ঘরে। সে খাবার নিয়ে যায় অবশ্য রামভুজ আর বনোয়ারি। বাহাত্তর নম্বরের ওপর ওইটুকু দয়া তিনি এখনও রেখেছেন। রামভুজকেই বাইরে থেকে তাঁর খাবার আনবার গৌরবটুকু তিনি দিয়েছেন।
প্রথম দিনই রামভুজকে বাধিত হবার এই দুর্লভ সুযোগ দিয়ে তিনি বলেছিলেন, তোমাদের এখানে ভাল হোটেল-টোটেল আছে, রামভুজ?
রামভুজ তখন আমাদেরই পরামর্শে ঘনাদা নীচে, না ওপরে তাঁর ঘরে বসেই খাবেন সে কথা জিজ্ঞাসা করতে এসেছে।
ঘনাদার উক্তির গভীর তাৎপর্য না বুঝে প্রথমে তাচ্ছিল্যভরে জানিয়েছে যে, হোটেল থাকবে না কেন? অনেক আছে। কিন্তু তাকে কি আর হোটেল বলে! তারপর হঠাৎ একটু টনক নড়ে ওঠায় উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করেছে, হোটেল কী হোবে বড়াবাবু?
কী আর হবে? ঘনাদা যেন নিরুপায় হয়ে বলেছেন, ভাল হোটেল থাকলে সেখান থেকেই খাবারটা আনাতাম। তা যখন নেই বলছ তখন গ্র্যান্ড কি গ্রেট ইস্টার্নেই যেতে হবে।
গ্র্যান্ড, গ্রেট ইস্টার্ন রামভুজ বোঝেনি। কিন্তু হোটেল থেকে খাবার আনাবার কথাতেই শঙ্কিত হয়েছে।
