উদ্বিগ্ন হয়ে তাই জিজ্ঞাসা করতে হল আমাদের, বড়াবাবুকে যা দিয়েছিলে তোমার সে টাকা কি–
কথাটা শেষ করা গেল না। ওইটুকু বলা হতেই ড্রাইভারজি লজ্জিতভাবে জিভ কেটে বলল, রাম! রাম! বড়াবাবু সে রুপয়া তো হমার কোম্পানির বাবুর মারফত ভেজে দিয়েছে ওই দিনেই। আর না দিলে ভি ও রুপয়া কাছে! একটু থেমে একটু লজ্জা লজ্জা ভাব করে বললে, কাল রামনবমী, তাই আমি আসিয়েছে।
রামনবমী! তাই এসেছে ড্রাইভারজি! আমরা হতভম্ভ হয়ে পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম।
রামনবমীর নামে আসা মানে বখশিশের আশায় যে আসা নয় তা তো ড্রাইভারজির আগের আলাপেই পরিষ্কার হয়ে গেছে।
তা হলে?
ড্রাইভারজির পরের কথায় রহস্যটা একসঙ্গে কিছুটা পরিষ্কার ও রীতিমত ঘনীভূত হয়ে উঠল।
কালসে তুলসীদাসজির পূজায় অখণ্ড রামায়ণ পাঠ হোবে কিনা, উস লিয়ে বড়াবাবুকে বোলাতে এসেছি।
মাথায় এবার চরকিপাক লাগা অন্যায় কিছু নয় নিশ্চয়। রামনবমীতে তুলসীদাসের সম্মানে অখণ্ড রামায়ণ পাঠ হবে, তার সঙ্গে ঘনাদার কী সম্বন্ধ?
সম্বন্ধটা ড্রাইভারজির ব্যাখ্যাতেই ভাল করে জানা গেল।
ঘনাদার অনেক আশ্চর্য গুণাগুণ আর ক্ষমতার কথা আমরা জানি, কিন্তু তিনি যে একজন অসামান্য অপরূপ রামায়ণ গায়ক, সারা তুলসীদাসের সপ্তকাণ্ড রামচরিতমানসই যে তাঁর প্রায় মুখস্থ, এই অবিশ্বাস্য খবরটা ড্রাইভারজির কাছেই প্রথম পেলাম। তেল ফুরোবার পর দমদম থেকে প্রায় সমস্ত রাস্তাটাই ভাড়াটে লোক দিয়ে গাড়ি মেস পর্যন্ত ঠেলে আনবার সময় ঘনাদা নাকি তুলসীদাসী রামচরিতমানস-এর শ্লোক গেয়ে শুনিয়েই ড্রাইভারজি আর ঠেলাদারদের পর্যন্ত মুগ্ধ করে রেখেছিলেন। আসন্ন রামনবমী উৎসবে অখণ্ড রামায়ণ পাঠের ভার নিতেও সেদিন তিনি নাকি রাজি হয়েছিলেন।
ড্রাইভারজি তাঁর সেই প্রতিশ্রুতি অনুসারে আজ তাঁকে নিমন্ত্রণ করতে এসেছে।
সেদিন দায়ে পড়ে ঘনাদা যা করেছেন ও বলেছেন তা যতই অদ্ভুত ও চমকদার হোক আজ তার জের টানতে তিনি উৎসাহী হবেন বলে তো বিশ্বাস হয় না। কী ভাগ্য তিনি এখন তাঁর সরোবর-সভা সান্ধ্য বৈঠকে গেছেন। তাঁকে বাঁচাবার জন্য গৌরই বুদ্ধি করে বলল, সব তো ঠিক ছিল ড্রাইভারজি, কিন্তু বড়ি আফশোস কি বাত যে বিলাইত সে এক সাহাব অচানক আকে উনকো দূর কাঁহা টহলমে লিয়ে গেছে! কব যে লৌটেঙ্গে কুছ ঠিক নহি। তাই তোমাদের অখণ্ড রামায়ণ পাঠ উনি আর এবার করতে পারলেন না।
ড্রাইভারজি একটু হতাশ হয়েই তারপর চলে গেল।
ঘনাদার ভাগ্য ভাল যে, তিনি এ সময়ে যথারীতি তাঁর সরোবরসভায় গিয়েছেন।
তাঁর ভাগ্য ভাল বলব, না আমাদের ভাগ্যটাই মন্দ?
ঘনাদা বাহাত্তর নম্বরে এখন উপস্থিত থাকলে ড্রাইভারজিকে সামলাবার হয়ত আর-একটা কাহিনী শোনার ভাগ্য আমাদের হত!
দুনিয়ার ঘনাদা (গল্পগ্রন্থ)
কাঁটা
লাল, না সবুজ?
সবুজ কোথায়? ফিকে গোলাপি পর্যন্ত নয়। একেবারে খুনখারাপি ঘোর লাল যে এখন!
হ্যাঁ, শুধু লাল আর সবুজ নিয়েই আছি কদিন ধরে। মাঝখানে হলদে-উলদে নেই। আমাদের এখানে হয় এসপার, নয় ওসপার। হয় ধন-ধান্য-পুষ্প ভরা, নয় ধু-ধু বালির চড়া।
বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেনের কথা যে বলছি তা যাঁরা বুঝেছেন লাল সবুজের মানে বুঝতেও তাঁদের নিশ্চয় বাকি নেই।
হ্যাঁ, লাল-সবুজ হল সিগন্যাল। রুখব, না এগোব তারই নিশানা। হলদের মতো মাঝামাঝি ন যযৌন তস্থৌ দোনামনা রঙের বালাই আমাদের নেই। লাল আর সবুজ নিয়েই আমাদের কারবার।
গোড়া থেকে লালই চলছিল। আমাদের অবস্থাও অতি করুণ। দোতলার আড্ডাঘরে জমায়েত হই, কিন্তু আসর জমে না। হতাশ নয়নে টঙের ঘরের সিঁড়িটার দিকে তাকাই, কিন্তু ওই পর্যন্তই। ও সিঁড়িতে আমাদের পা বাড়ানো নৈব নৈব চ। লাল সিগন্যাল অমান্য যদি করো তো দুর্ঘটনা। গোঁয়ার্তুমি করতে গিয়ে শিবু যা বাধিয়েছে। সেই থেকেই ঘোর লাল চলছে।
কীসের এত ভয়! শিবু মরিয়া হয়ে একদিন বলেছিল, আমরা সব মেনে নিই। বলে উনিও জো পেয়ে যান। এতদিন গেঁজলাতে না পেরে পেট ফুলে ঢাক হয়ে গেছে। এদিকে। আমি গিয়ে খুঁচিয়ে মুখ খোলালে বর্তে যাবেন। তারা দেখ না, পনেরো মিনিট বাদেই তোদের ডাকছি। আমার আওয়াজ পেলেই সব ওপরে চলে আসবি।
পনেরো মিনিট অপেক্ষা করতে হয়নি।
পাঁচ মিনিট না-হতেই আওয়াজ পেয়েছি। তবে শিবুর গলার নয়, তার পায়ের।
শিবু চটপট সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে।
না, ভয়ে মুখ শুকনো-টুকনো নয়, কিন্তু লজ্জায় যেন কালি মেড়ে দেওয়া।
কী হল কী? গৌর জিজ্ঞাসা করেছে, আমাদের না ডেকে নিজেই নেমে এলি যে!
গৌরের সরল প্রশ্নের আড়ালে সামান্য একটু ঠাট্টার খোঁচা হয়তো ছিল, কিন্তু সেটা অত তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠার মতো কিছু নয়।
হ্যাঁ, এলাম! শিবুর ক্ষুব্ধ চাপা গুমরানি শোনা গেছে, আমায় কী বলেছেন, জানো?
শিবুর কাছে নিজস্ব সংবাদদাতার বিবরণ তারপর পাওয়া গেছে।
শিবু রীতিমতো হই চই করে টঙের ঘরে গিয়ে ঢুকেছিল। যেন মাঝখানে কোথাও কোনও সুতো হেঁড়েনি। ইয়ালটা সম্মেলনের গলাগলিই চলছে, ন্যাটোর নামই জানা নেই।
আরে, কী খবরের কাগজ পড়ছেন অবেলায় বসে বসে! শিবু খবরের কাগজটা প্রায় টেনে নিতেই গেছে, নীচে চলুন। সবাই বসে আছে হাপিত্যেশ করে। আর একটু জোরে নিশ্বাস টানুন না। গন্ধ পাবেন। ফ্রায়েড প্রন তো নয়, যেন মুনি ঋষির প্রতিজ্ঞা-ভাঙা প্রলোভন!
