হ্যাঁ, তাই করি। বলে টঙের ঘরে যেতে যেতে ঘনাদা আমাদের জন্য একটু সহানুভূতি খরচ করে গেলেন, তোমাদের বড্ড দেরি হয়ে গেল আজ।
আমাদের মুখগুলোর দিকে একবার চেয়ে দেখলে ঘনাদা আমাদের কৃতজ্ঞতার পরিমাণটা বুঝতে পারতেন। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হওয়া পর্যন্ত কেন যে ঘনাদা আজ অমন অকাতরে আমাদের সঙ্গে খিদেতেষ্টা অগ্রাহ্য করেছেন, তা বুঝে আমরা আমও অভিভূত।
ঘনাদাকে সিঁড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে নতুন ভক্ত পল্টুবাবুর ফিরে আসার পর তাঁকেই একটু নিশানা না বানিয়ে তাই পারলাম না।
বললাম, বেরাল তো মিলেছে, কিন্তু তার গলায় ঘন্টাটা বাঁধা হবে কী করে?
বেরাল! পল্টুবাবু অবাক হয়ে বললেন, ঘনাদা বেরালের কথা তো কিছু বলেননি
সোজা করেই তাই বলতে হল, আকাশের ঘেঁদা, ওই সর্বার্থসাধিকা কালো ফটো, ও তো শুনলাম দেড় দুই আলোকবর্ষ দূরে। তা ফুটোর গলায় উপগ্রহের বিদ্যুৎবানানো যন্ত্র বসানো হাঁসুলি পরানো হবে কী করে?
প্রায় ঘনাদার মতোই নাসিকাধ্বনি করে নিজের পকেটের ঘনাদার-দেওয়া এনার্জির দানপত্র একটু নেড়ে নিয়ে পল্টুবাবু বললেন, ওসব তোমাদের বোঝবার নয়।
পল্টুবাবুর অন্ধ ভক্তির ছোঁয়াচ লেগেও আর একটা রহস্য হঠাৎ যেন পরিষ্কার হয়ে গেল।
ঘনাদার অনেক রকম বেয়াড়া আবদার অত্যাচারই আমরা অম্লানবদনে সহ্য করে থাকি। কিন্তু আজকের এই অন্যের আনা গাড়ি নিয়ে এমন বেপরোয়া উধাও হয়ে যাওয়াটা তাঁর পক্ষেও যেন বেশ একটু বাড়াবাড়ি। এটা যেন তাঁর গুলসম্রাট চরিত্রের সঙ্গে খাপ খায় না।
হঠাৎ এমন অস্বাভাবিক চরিত্রস্থলনের কারণ কী?
কারণটা গৌরের মাথাতেই প্রথম ঝিলিক দিল।
ঘনাদা আজ কীসের শোধ নিলেন বুঝতে পারছিস?
গৌর বুঝিয়ে বলবার আগেই ব্যাপারটা আমাদের ভাল করেই মনে পড়ল। মাসখানেক আগেই আমাদের একটা ছোটখাটো বেয়াদপি হয়ে গেছে। বিকেলবেলা সেদিন ঘনাদাকে নিয়ে এক নামকরা হোটেলে যাবার কথা দিয়েছিলাম। কিন্তু খেলার মাঠে সর্ব ভারত-প্রতিযোগিতায় বাংলা-দলের অপ্রত্যাশিত হারে এমন মুষড়ে পড়েছিলাম সবাই যে মেসে ফিরে যাবার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম একরকম।
ঘনাদা সেজেগুঁজে রাত প্রায় ন-টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে রামভুজের রান্নাতেই ডিনার সারলেও, পরের দিন এ ব্যাপার যেন বেমালুম ভুলে গিয়েছিলেন।
মোটেই যে তিনি ভোলেননি, আজকের এই প্রতিশোধই তার প্রমাণ।
০৭. অপ্রত্যাশিত উপসংহার
এ কাহিনীর একটু অপ্রত্যাশিত উপসংহার আছে।
ঘনাদার সেদিনকার অন্য সব কীর্তির মোটামুটি কিছুটা ব্যাখ্যা পেলেও পল্টুবাবুর মোটরের ট্যাঙ্কের অতখানি তেল মাত্র দমদম এয়ারপোর্ট পর্যন্ত যেতেই কেমন করে তিনি ফুরিয়ে এলেন, সেই ব্যাপারটা আমাদের কাছে মস্ত একটা ধাঁধা হয়ে ছিল।
আর যাই করুন, ঘনাদা তেলটা কাউকে বিক্রি নিশ্চয়ই করেননি।
তা হলে কি দান-খয়রাত করে এসেছেন?
না, ওরকম উদারতা করে এসে থাকলে সেটার এক কড়া এতক্ষণে পাঁচকাহন হয়ে উঠত নিশ্চয়। ”
তেল খরচের রহস্যটা অমন আশাতীতভাবে আমাদের কাছে ফাঁস হয়ে যাবে তা ভাবিনি।
হল অবশ্য ঘনাদারই চরিত্র মহিমায়।
পঞ্চম গেম-এ কাপভের ভুল চালগুলো কৰ্চনয়ের বদলে ফিশার বা সে নিজে থাকলে কী করত, তাই আমাদের বোঝাচ্ছে শিবু, আর শিশির তার প্রতিবাদে ফিশার থাকলে কাপভের কাছে যে তুলোধোনা হয়ে যেত গলার জোরে তা প্রমাণ করে আমাদের আড্ডাঘর সরগরম করে তুলেছে, এমন সময় ভগ্নদূতের মতো দরজায় বনোয়ারির আবির্ভাব।
হাতে কোনও খাবার-দাবারের খালি প্লেট ছাড়া নিরস্ত্র নিরাভরণ বনোয়ারির আবির্ভাব আমাদের এ ঘরে বড় একটা হয় না।
হলে সংবাদটা কিছু গুরুতর বা চমকপ্রদই হয়ে থাকে।
এবারের সংবাদটা গুরুতর, না শুধু চমকপ্রদ, প্রথম শুনে ঠিক বোঝা গেল না।
বনোয়ারির সংবাদ হল, ড্রাইভারজি আসিছে।
ড্রাইভারজি! আমরা তো অবাক। কে এই ড্রাইভারজি?
সন্দেহ ভঞ্জন হতে দেরি হল না। বনোয়ারির ঘোষণার পরেই দরজায় ড্রাইভারজিকে দেখতে পাওয়া গেল।
প্রথমটা সত্যি চিনতে পারিনি। চেনা একটু শক্তও বটে। ড্রাইভারজিকে আর আমরা কতটুকু দেখেছি? আর যাও বা দেখেছি তা অন্য বেশে-পরিবেশে।
ড্রাইভারজির বেশভূষা এখন আলাদা। ড্রাইভার-মার্কা ধরাচূড়ার বদলে গায়ে পাঞ্জাবি ধরনের কোর্তা, পরনে পাজামা, মাথায় মারাঠি টুপি।
ড্রাইভারজি দরজার ভেতর একটু ঢুকে দাঁড়িয়ে আমাদের সেলাম করে একটু কুণ্ঠিতভাবে রাষ্ট্র প্রাদেশিক মেশানো ভাষায় হেসে জানালে, বড়া বাবুকে সেলাম দেনে আসছি।
ব্যাপারটা যখন প্রায় বুঝে ফেলেছি, ড্রাইভারজির পরের কথায় তখন মাথাটা আবার একটু গুলিয়ে গেল।
আমাদের বোঝবার একটু সুবিধে করে দেবার জন্যে ড্রাইভারজি তার উল্লেখটা একটু বিস্তারিত করলে, যো বড়াবাবুকে ও দিন কোল্যানি লিয়ে গেলাম।
বড়াবাবু যে স্বয়ং ঘনাদা তা বুঝতে তখন আর বাকি নেই, কিন্তু কল্যাণীতে নিয়ে যাবার কথা কী বলছে ড্রাইভারজি?
সে বিভ্রমের চেয়ে একটা শঙ্কিত সন্দেহই গোড়ায় প্রবল হয়ে উঠল।
ঘনাদা নিজেই কবুল করেছেন যে, ড্রাইভারজির কাছে তিনি কিছু ধার নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। পল্টুবাবুও নিজেই সে দেনা সম্বন্ধে তাকে ও আমাদের নিশ্চিন্ত হবার আশ্বাস দিয়েছিলেন।
ঘনাদার সেই ধার শোধের ব্যাপারেই কিছু গলতি হয়ে গেছে নাকি পল্টুবাবুর?
ড্রাইভারজি তারই তাগাদায় এসেছে?
