এয়ারপোর্ট হোটেলের একটা নিরিবিলি টেবিলে একলাই বসে বসে প্লেনের ভেতর বোরোত্রার অবস্থাটা যেন আমি প্রত্যক্ষ দেখতে পেয়েছি।
কী অস্বস্তি নিয়েই সে যে তার সিটে বসে আছে, তা তার মুখের চেহারাতেও এখন আর লুকোনো নেই নিশ্চয়ই। সিটটা এখন যেন তার কাছে কন্টকাসন।
কোনওরকমে নিজের সিটটায় বসে আছে বটে, কিন্তু নজর তার প্লেনের ভেতরে ঢোকবার দরজাটার দিকে যেন আঠা দিয়ে আটকানো। নীচের ঢাকা-দেওয়া সিঁড়িটা সেইখানেই লাগানো। সেই সিঁড়িই বেয়েই এক-এক করে যাত্রীরা উঠে আসছে ভেতরে।
কিন্তু যাত্রীরাও তো যা আসবার প্রায় সবাই এসে গিয়েছে। এখন যা আসছে তা তো বেশ একটু ফাঁক দিয়ে দিয়ে দু-একজন মাত্র। তার মধ্যে দুব্যারি কই? হাত ঘড়িটার দিকে চেয়ে অস্থির হয়ে উঠছে এবার বোরোত্রা, আর সময়ই তো নেই।
মাত্র এক মিনিট, পঞ্চাশ সেকেন্ড, পঁয়তাল্লিশ।
প্লেনের দরজা ওরা বন্ধ করতে যাচ্ছে যে।
নীচে দরজার গায়ে লাগানো সিঁড়িটা সরিয়ে ফেলেছে নাকি।
বোরোত্রার মনের মধ্যে কী হচ্ছে, তা আমি বেশ বুঝতে পারছি তখন।
একটু দেরি হলেও দুব্যারি শেষ মুহূর্তে ঠিক এসে পড়বে এই ছিল তার বিশ্বাস।
সত্যি না এসে দুব্যারি যাবে কোথায়?
কিন্তু এখন কী করবে বোরোত্রা?
নেমে যাবে প্লেন থেকে?
সিট থেকে উঠে পড়তে গিয়ে তার পিঁপিঁর কাছেই সে পরামর্শ চাইছে নিশ্চয়।
কী পরামর্শ দেয় পিঁপিঁ?
পিঁপিঁ এখন চিচি হয়ে গিয়েছে নিশ্চয়। চিঁচি করেই জানায়, কোথায় যাবি? এখন কি আর নামতে দেবে?
দেবে দেবে, কেন দেবে না! ধমক দিয়ে আবার উঠতে চেষ্টা করে বোরোত্রা।
পিঁপিঁর চিচি আবার শোনা যায় নিশ্চয়, নামতে পারলেও যাবি কোথায়? কোথায় এখন পাবি সে-হতভাগাকে? তার চেয়ে চেপে বসে থেকে এরপর কী করবি ভেবেই নে না।
বোরোত্রা আবার বসে পড়েছে দোনামোনা মুখে।
পিঁপিঁর সঙ্গে কথাগুলো বাস্ক-এই হয়েছে সন্দেহ নেই।
আশপাশের লোকেরা কিছু বুঝতে না পেরে ভেন্ট্রিলোকুইজমের মজা পেয়েই তখন হাসছে।
সে হাসিতে গা জ্বলে গেলেও বোরোত্রাকে বোকা-বোকা ভালমানুষের মুখ করে থাকতে হচ্ছে জাদুকরের ভোল নিয়ে।
মনের ভেতর এখন তার ভাবনার তুফান চলছে।
সে যা ভাবছে আমি সব টের পাচ্ছি।
ভাবছে, দুবারি তো শেষ মুহূর্তেও প্লেনে এসে উঠতে পারল না। কেন পারল না?
ইচ্ছে করে দ্যুব্যারি যে এ প্লেনটায় ওঠেনি, তা অবশ্য বোরোত্রার মাথাতেই আসছে না।
দুব্যারি নিশ্চয়ই কোনও কিছুতে আটকে গেছে এই সন্দেহই বোরোত্রার হচ্ছে। কিন্তু কীসে আটকাতে পারে?
কোনওরকম আকস্মিক দুর্ঘটনা? হঠাৎ অসুখ-বিসুখ?
তেমন কোনও দারুণ দুর্ঘটনা কি হঠাৎ অসুখে একেবারে ভেঁসে গেলে তার কাজ তো হাসিল হয়ে যায়।
কিন্তু অত ভাগ্য কি তার হবে? তা ছাড়া অমন দৈব দুর্ঘটনায় কিছু হলে তার বাহাদুরির দাম সে কি পাবে?
না, ওরকম কিছু হয়ে কাজ নেই। আর যাই হোক, পরের ঘাঁটিতে নেমে তাকে ভাল করে খোঁজ নিতে হবে। দরকার হলে আবার ফিরেও যেতে হবে কলকাতায়।
কিন্তু এদিকে পিঁপিঁর বুকের ভেতর প্রায় নিঃশব্দ ধুকধুকুনি যে সমানে চলেছে।
ওই ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে জুড়ে যে শয়তানির প্যাঁচটি আছে, তা নির্ভুল ঘণ্টা মিনিট সেকেন্ডের হিসেব ধরে ঠিক সময়টিতে প্রলয়কাণ্ড বাধাবে।
সেই ব্যবস্থা করেই পিঁপিঁর ভেতর টাইম-বোমাটি লুকিয়ে দুব্যারির প্লেনেই বোরোত্ৰা টিকিট কেটে উঠেছে।
সে মাঝপথে নেমে যাবার সময় টাইম-বোমা-লুকোনো পুতুলটা ওপরের তাকের মধ্যে লুকিয়ে রেখে যাবে। আর সেটা প্লেন আবার ছাড়বার পর সমস্ত প্লেনটাকেই চৌচির করে ফাটাবে। এমন পাকা প্ল্যান যে কোনওভাবে ভেস্তে যেতে পারে, তা সে ভাবতেই পারেনি।
এখন এই পিঁপিঁ পুতুলটার সর্বনাশা শয়তানি প্যাঁচটা কাটিয়ে ভণ্ডুল না করে দিলেই নয়।
বোরোত্ৰা কেমন করে বিপর্যয় ঘটাবে, তাও আমি ভাল করেই বুঝতে পেরেছি।
একটু বাদেই পিঁপিঁকে নিয়ে সে বাথরুমে গিয়ে ঢুকবে। তারপর সেখানে গিয়ে পিঁপিঁর ছালচামড়া ছাড়িয়ে তার ভেতরের ঘড়িটা দেবে বন্ধ করে।
পিঁপিঁকে নিয়ে বাথরুমে ঢুকে তাকে না-নিয়েই আবার ফিরে এলে তার যে সব সহযাত্রী এতক্ষণ তার ভেনট্রিলোকুইজমে মজা পেয়েছে তারা একটু অবাক হয়ে পিঁপিঁর খোঁজ হয়তো নিতে পারে।
তখন কী জবাব বোরোত্রা দেবে, সেটা তার দায়। আমার তা নিয়ে মাথা ঘামাবার দরকার কী!
বোরোত্রার প্লেনটা ছেড়ে যাবার বেশ খানিকটা পরে তাই আমি ফিরে আসবার জন্য উঠেছি।
তা এয়ারপোর্ট হোটেলে তো আর এমনি এমনি বসে থাকা যায় না। তাই একটু খাবার দাবার অর্ডার দিতে হয়েছিল। তা এত দিল যে, ওখানে শেষ করা যাবে না বলে কিছু প্যাক করিয়ে সঙ্গেও আনতে হয়েছে। সে বাক্সটা—
ঘনাদার মুখের কথা পড়তে-না-পড়তে পল্টুবাবু প্রায় জোড়হস্ত হয়ে বললেন, সে খাবারের প্যাকেট আমি আপনার ঘরে পাঠিয়ে দিয়েছি এই এদের বনোয়ারিকে দিয়ে।
ও, দিয়েছ! ঘনাদা একটু প্রসন্ন হাসি দিয়ে পল্টুবাবুকে ধন্য করে কেদারা থেকে উঠে পড়ে পা বাড়াতে গিয়ে হঠাৎ একটা কথা যেন মনে পড়ায় থেমে গিয়ে বললেন, কিন্তু আর-একটা মুশকিল হয়েছে। সঙ্গে তেমন কিছু নিয়ে তো বেরোইনি। ওই হোটেলে যাবার সময় ড্রাইভারের কাছে গোটা চল্লিশই যেন ধার করতে হয়েছিল। সেটা–
সে আপনি কিছু ভাববেন না। পল্টুবাবু কৃতার্থ গলায় বললেন, ও সব কিছুর যা করবার আমি করব। আপনি এখন বিশ্রাম করুন গিয়ে একটু।
