তা হলে টিকিট ক্যানসেল করতে হবে না। তাকে বুঝিয়ে বলেছি, তুমি যেন এই ফ্লাইটেই যাচ্ছ, এইটেই সবাই জানুক। না এসে পৌঁছনো প্যাসেঞ্জার হিসেবে তোমার নাম শেষ পর্যন্ত মাইকে ডেকে যাবে। তাই যাক। শেষ মুহূর্তেও তুমি এসে পড়তে পারো, এইরকম একটা ধারণা ভাঙবার কোনও কারণ যেন না থাকে।
দ্যুব্যারির মালপত্র নিয়ে তাকে ঘরোয়া বিমানযাত্রীদের ঘাঁটিতে রওনা করিয়ে দেবার সময়ে সে হঠাৎ আমার হাতটা ধরে ফেলে বললে, তুমি যা করছ তা অনেক ভেবেচিন্তে বুঝেসুঝেই করছ, এ বিশ্বাস আছে বলে কোনও প্রশ্ন তোমাকে করব না। একটা কথা শুধু তোমায় বলে যাই, দাস। তোমার সঙ্গে দেখা আমার শিগগিরই আবার হবে। আর তা লুকিয়ে চুরিয়ে নয়, দুনিয়ার সকলকে সগৌরবে জানিয়ে। কারণ আমার সাধনা আমি প্রায় ষোলো আনাই সফল করে এনেছি।
এরপর পকেট থেকে একটা নোটবইয়ের মতো খাতা বার করে আমার হাতে দিয়ে আবার বললে, এই খাতাটা সেইজন্যেই তোমায় দিয়ে যাচ্ছি। এতে সব পাতায় আমার সই আছে। তা থাক বা না থাক, শুধু তোমার সই থাকলেই এ খাতার পাতা কিংবা যে কোনও সাদা কাগজ এখন থেকে লক্ষ টাকার চেয়েও দামি। কারণ সবচেয়ে যা দুষ্প্রাপ্য আর মূল্যবান, সেই এনার্জি তুমি যাকে যত খুশি দেবার হ্যান্ডনোট লিখে দিতে পারো। পৃথিবীর সব এনার্জির চাহিদা চিরকালের মতো মেটাবার মতো মহাশূন্যের কালো ফুটো আমি পেয়েছি।
কথাগুলো বলে নিজের আবেগেই দ্যুব্যারি আর আমার দিকে না-ফিরে হন হন করে তার মালের ঠেলার সঙ্গে এগিয়ে চলে গেল।
একটু দাঁড়িয়ে আমি আবার আগের ওয়েটিং হএই ফিরে এলাম। আমার একটু দেরি হয়ে গেছে। কিন্তু তাতে কিছু ক্ষতি হয়নি। বোরোত্রাও এয়ারপোর্ট হোটেলে বেশ ভালরকম সেঁটেই নিশ্চয় সবে তখন তার মালপত্র ওজন করাচ্ছে।
সঙ্গে তার পিঁপিঁ আছে ঠিকই। ওজন করাতে করাতেও তাদের আলাপের বিরাম নেই।
ভাষাটা তাদের অবোধ্য হলেও কাছাকাছি সবাই পুতুল-পিঁপিঁ আর বোরোত্রার আলাপের ধরনে হেসে কুটোপাটি হচ্ছে তখন। বিশুদ্ধ বাঙ্ক-এ সেই আলাপের মর্ম বুঝলে তাদের মুখে কী ধরনের হাসি ফুটত তাই ভাবলাম।
ওজন করাতে করাতে বোরোত্রার বাঁ বগলের পিঁপিঁ তখন বলেছে, খুব যে খুশি, না? প্লেনে গিয়ে ওঠার আর তর সইছে না! বোরোত্রা যেন তাকে ধমক দিয়ে বলেছে, চুপ কর। তর সইছে না-সইছে, তাতে তোর কী?
আমার কী! খ্যানখেনে হাসির সঙ্গে বলেছে, পিঁপিঁ আরে আমারই তো সব। আমি ছাড়া তুই তো ঠুটো!
ঠিক আছে, ঠিক আছে। বোরোত্রা যেন পিঁপিঁকে ঠাণ্ডা করবার চেষ্টা করেছে, সত্যিই তো, সব তো তোরই কেরামতি। আমি তো এর পরের ঘাঁটিতেই নেমে যাব। তারপর তো তোরই খেল।
আমায় ফেলে তুই নেমে যাবি! পিঁপিঁ একটু কাঁদুনে সুর ধরেই আবার তা ভুলে গিয়ে জিজ্ঞাসা করেছে, কোথায় রেখে যাবি আমায়?
সে যেখানেই রেখে যাই না, বলে একটু গরম হতে গিয়েই বোরোত্রা যেন ভয়ে ভয়ে নরম হয়ে বলেছে, রাখব, রাখব, ভাল জায়গাতেই রাখব। তুই তো ওই একরত্তি পুঁচকে একটা পুঁটলি, ওপরের তাকের লাইফবেল্টের ভেতরেই গোঁজা থাকলে কে খেয়াল করবে।
কেউ না! কেউ না! পিঁপিঁ যেন খুশিতে ডগমগ হয়ে বলেছে, ওইখান থেকেই এমন খেল শুরু করব, একেবারে ফটকাবাজি। ফট ফট।
থাম থাম, আহাম্মক কোথাকার। বোরোত্রা তাকে আবার ধমক দিয়েছে, আর ফটকাবাজি দেখাতে হবে না। এদিকে দেরি হয়ে গেছে। পাখি ডালে গিয়ে বসেছে। কিনা দেখা হয়নি।
বসেছে! বসেছে! পিঁপিঁ প্রায় যেন নাচতে নাচতে বলেছে, আমরা আসবার আগেই গিয়ে বসেছে নিশ্চয়! চল! চল!
ওজন-টোজনের ঝামেলা চুকিয়ে এক হাতে ঝোলানো একটা ব্যাগ আর-এক হাতে পিঁপিঁকে নিয়ে কাউন্টারের সকলের হাসির মধ্যে বোরোত্রা এবার তার প্লেনে গিয়ে ওঠবার পথে রওনা হয়েছে। কিন্তু দু-পা গিয়েই তাকে থামতে হয়েছে চমকে হতভম্ব হয়ে।
অন্য সবাই যখন এটাও তার ভেনট্রিলোকুইজমের একটা প্যাঁচ মনে করে হেসে খুন, তখন বোরোত্রা নিজে বেশ দিশাহারা।
তা দিশাহারা হওয়া আশ্চর্য কী? কাউন্টার ছেড়ে দু-পা না যেতে যেতেই তার পিঁপিঁই যেন ছুঁচলো গলায় তাকে সাবধান করে দিয়ে স্প্যানিশে বলেছে, আপ,ি কী হারাইতেছেন, আপনি জানেন না।
বলে কী পিঁপিঁ! আর বলছে কেমন করে? বেশ হতভম্ব হয়েও বোরোত্রা আবার তার ব্যাগ তুলে রওনা হওয়া মাত্র আবার পিঁপিঁ যেন ফরাসি ভাষায় সেই একই কথা তাকে শুনিয়েছে।
বোরোত্রার সত্যিই তখন বেসামাল অবস্থা। মাথাটাই তার হঠাৎ বিগড়ে-টিগড়ে গেছে বলে তার সন্দেহ হচ্ছে।
মাথাতেই কিছু গণ্ডগোল না হলে এমন অদ্ভুত কাণ্ড হয় কী করে। তাও একবার আধবার কী! স্প্যানিশ আর ফরাসির পর জোর করে ব্যাগ তুলে নিয়ে পা বাড়াবামাত্র পিঁপিঁ খাস বাক-এই সেই একই কথা তাকে শুনিয়েছে, আপনি কী হারাইতেছেন আপনি জানেন না।
বোরোত্রার কাণ্ড দেখে তখন মনে হয়েছে, সে যেন পাগলের অভিনয় করছে। আশপাশের লোকে যত এটা তার মজার খেলা মনে করে হেসেছে, সে তত চিড়বিড়িয়ে উঠে, আর-কিছু না পেরে, এক দফা চুটিয়ে গালাগাল দিয়ে পিঁপিঁকেই ছুড়ে ফেলে দিয়েছে সেখানকার মেঝের ওপর।
ছুড়ে ফেলে দিয়েই যেন তার হুশ হয়েছে। তারপর যে রকম অস্থির হয়ে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে সে পুতুলটা তুলে নিয়েছে, তা দেখবার মতো। সেইটুকু দেখেই হিসেবের ভুল কিছু যে আমার হয়নি তা বুঝে বোরাত্রার প্লেন ছাড়া পর্যন্ত বেয়াড়া কিছু ঘটে কিনা, তা একটু দেখে যাবার জন্য এয়ারপোর্ট হোটেলেই গিয়ে একটু বসেছি।
