জানলার খড়খড়িতে বাঁধা চাদর দুটো যে নেহাত ছেলেভুলানো মিথ্যে চালাকি, তা একবার নজর দিলেই বোঝা যায়।
বোরোত্রার মুখ যত থমথমে হয়ে উঠেছে, পিঁপিঁর গলা তত হয়েছে কান-ফুটো করা। অসহ্য ছুঁচলো গলায় বাস্ক-এ সে চেঁচিয়েছে, সব মিথ্যে কথা! তোর সঙ্গে মশকরা করছে কালা নেংটিটা। জিভটা ওর টেনে ছিঁড়ে ফেল! না হয় চটকে দলা পাকিয়ে ফেলে দে এই পাঁচতলা থেকে। দে, ফেলে দে! দেখছিস কী?
বোরোত্ৰা গম্ভীর মুখে যেন মেঘলা আকাশের গায়ে বাজগড়ানো আওয়াজে বলেছে, সবুর, সবুর। দু-দিন ওর দৌড়টা একটু দেখেই টুটি চেপে ধরব।
কিছুই যেন না-বুঝে বোকা-বোকা মুখে আমি বোরোত্রাকে সহানুভূতি জানিয়েছি, সত্যি এমন করে জ্বালাবে, ভাবতেও পারিনি।
পিঁপিঁ চিড়বিড়িয়ে উঠেছে, থোঁ মুখটা ভোঁতা করে দে না। বোরোত্রা যেন মেঘ-ডাকা আওয়াজে বলেছে, দেব, দেব। দুটো দিন শুধু নজরে রাখি।
নজরে রাখতে সে পারেনি। তার নিজের আর তার সঙ্গী চর-অনুচরদের চোখে ধুলো দিয়ে কখন যে আমি হংকং থেকে চিনেদের মাছধরা নৌকোয় সরে পড়েছি, জানতেও পারেনি তারা। জানবেই বা কী করে? তাদের পাহারায় গাফিলি কিছু ছিল না। কিন্তু সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়ার কোনও ট্রলারে মাছের জন্য পাঠানো সব বরফের বাক্সের কোনওটায় যে মানুষ থাকতে পারে, তা তাদের মাথায় আসেনি।
নিজে সরে পড়বার আগে এক বেলার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা সেখানকার পুলিশ-ফাঁড়িতে-জমা-করে-রাখা দুব্যারিকেও সেখান থেকে ছাড়িয়ে ওই জেলে-নৌকোতেই পালাবার ব্যবস্থা করবার সময় তার সঙ্গে সব বোঝাপড়াও করে নিয়েছি। বোঝাপড়া শুধু এই যে, তখন থেকে আমিও তাদের ই-ইউ-ডব্লিউ-সি-র একজন অংশীদার হয়েছি। দুব্যারি তার রেডিয়ো-টেলিস্কোপের গোপন ঘাঁটিতে নির্বিঘ্নে যাতে তার বাকি কাজটুকু সারতে পারে, বাইরের দুনিয়ায় তারই একজন প্রধান পাহারাদার হওয়া আমার কাজ। দুব্যারিকে হংকং থেকে পাচার করবার সময় আর-একটা পরামর্শও তাকে দিয়েছি। ছোট বড় দরকার-টরকার যা মাঝে মাঝে হয়, তার জন্য লন্ডন নিউইয়র্ক প্যারিস তো নয়ই, হংকং-এর মতো দুনিয়াদারির শহরে সে যেন না আসে। আর কাজ শেষ হবার আগে আমার সঙ্গেও কোনও যোগাযোগের চেষ্টা না করে।
তা সে করেনি। কিন্তু আমার পরামর্শ মতোই নিশ্চয়ই অন্য বড় শহর-টহরের বদলে কলকাতায় সওদা করতে এসেই প্রায় সর্বনাশ বাধাতে বসেছিল।
এস-এস-পি-এস তো কম পাত্তর নয়। তারাও চুপ করে বসে থাকেনি। ওত পেতে থেকে থেকে ওদের ওই বোরোত্রা কেমন করে দুব্যারির কলকাতা আসার খবরটা ঠিক পেয়ে গেছে। দুব্যারির পেছনে ও যে কলকাতাতে এসেছে, তা আমি আর কেমন করে জানব।
কিন্তু বোরোত্রার ওই ভেনন্ট্রিলোকুইজমের কায়দায় নিজের সঙ্গে হরদম কথা বলার রোগই তাকে ধরিয়ে দিয়েছে। তার এ রোগ না-থাকলে আর পল্টুবাবুর গাড়িটা ঠিক ওই সময়েই না পেলে পৃথিবীর এনার্জির সমস্যা মিটতে কত যুগ লাগত কে জানে!
০৬. ঘনাদা একটু থামতেই
ঘনাদা একটু থামতেই পল্টুবাবু প্রথম গদগদ হলেন। তা হলে ভাগ্যিস আমি গাড়িটা নিয়ে আজ অমন সময়ে এসে পড়েছিলাম!
আমাদের ক-জনের গলায় খুকখুকে কাশিটা তখন প্রায় ছোঁয়াচে হয়ে উঠেছে। ঘনাদা সেটা অগ্রাহ্য করেই উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, নিশ্চয়ই। ওই গাড়িটা না থাকলে বোরোত্রার হদিস কখনও পেতাম! রাসবিহারীর মোড়ে ট্রাফিক জ্যামে আটকে পড়েছি, বোরোত্ৰা তখন তার বন্ধ গাড়ির ভেতরে মনের সুখে পিঁপিঁর সঙ্গে বাস্ক-এ আলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। সেই আলাপ শোনবার পর আর তার পেছন ছাড়ি! তার দামি বিদেশি গাড়ির সঙ্গে লেগে থাকতে অবশ্য আমাদের জিভ বেরিয়ে গেছে।
তবু শহর ছাড়িয়ে দমদমের রাস্তায় শেষ পর্যন্ত তার গাড়িটাকে এয়ারপোর্ট হোটেলের দিকে যেতে দেখেই তার পিছু ছেড়ে সোজা এয়ারপোর্টে গিয়ে, ইস্টার্ন ফ্লাইটস-এর ওয়েটিং হএ গিয়ে হাজির হয়েছি। অনুমানে আমার ভুল হয়নি, ভাগ্যটাও ভাল, দ্যুব্যারি তার সেই মাকামারা আখখুটে হাঘরে চেহারা পোশাকে একটু আগে আগেই এসে তার মাল ওজন করাতে দাঁড়িয়েছে।
আমাকে দেখে সে তো যেমন অবাক তেমনই আহ্লাদে আটখানা। গলগল করে কী যে জিজ্ঞাসা করবে, আর কোন কথা যে আগে বলবে, তাই ঠিক করতে পারছে না।
গম্ভীর মুখে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেছি, ওজন করাতে হবে না, মাল নিয়ে শিগগির ওদিকে চলো।
এ কথায় একেবারে হতভম্ব হলেও দুব্যারি প্রতিবাদ কিছু করেনি। তাকে নিয়ে তারপর একদিকের নির্জন একটা কোণে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলেছি, এ ফ্লাইটে যাওয়া তোমার হবে না। তোমায় অন্য প্লেনে কোথাও যেতে হবে।
কোথায়? দুব্যারি এই প্রশ্নটুকু শুধু করে আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়েছে।
কোথায় তা জানি না। তাকে আরও বিমূঢ় করে বলেছি, এখন অন্য যে কোনও ফ্লাইটে একটানা-একটা সিট খালি পাওয়া যাবে, তাতেই।
আর-কোনও প্রতিবাদ বা প্রশ্ন না করে দুব্যারি এবার বলেছে, এখনও সময় আছে, আমার যাওয়াটা তা হলে বাতিল করিয়ে আসি।
বাতিল করিয়ে আসবে! একটু থেমে ভেবে নিয়ে জিজ্ঞাসা করেছি, সঙ্গে তোমার পুঁজির অবস্থা কী রকম? এ টিকিট ক্যানসেল না করলেও প্রথমে কাছাকাছি। কোথাও, আর তারপর সেখান থেকে আবার ফিরে তোমার নিজের জায়গায় যাবার নতুন টিকিট করার মতো খরচে কুলোবে?
একটু ভেবে নিয়ে দুব্যারি বলেছে, ক-টা জিনিস এখানে কিনতে পারিনি। তাই সঙ্গে যা আছে তাতে একরকম কুলিয়ে যাবে।
