একটু থেমে দম নিয়ে দুব্যারি গর্বভরে বললে, তেমনই একটি কালো ফুটো আমি আবিষ্কার করে ফেলেছি আমার রেডিয়ো-টেলিস্কোপে। সেটা সিগনাস এক্স-ওয়ান-এর মতো দূরও নয়, মাত্র দুই আড়াই আলোকবর্ষ দূরে। আর কিছু দিন নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারলে তার অবস্থানটা আমি একেবারে নির্ভুলভাবে ছকে ফেলতে পারব। তা হলেই কাম ফতে। ওই খুদে কালো ফুটোর চারধারে কুয়ো বাঁধিয়ে দেবার মতো একটা উপগ্রহের কায়েমি চাকতি হিসেব করে মাপজোখা দূরত্বে লাগিয়ে দিলেই, পাহাড়ি প্রপাতের জল পড়বার বেগ থেকে যেমন, কালো ফুটোর সর্বনাশা টান থেকে তার গলার চাকতিতে বসানো যন্ত্র দিয়ে তেমনই অফুরন্ত অগাধ এনার্জি পৃথিবীতে চিরকাল ধরে জোগান দেওয়া যাবে। আর কিছুদিন মাত্র বিনা উপদ্রবে নিরিবিলিতে কাজ করবার অবসরটুকু আমার দরকার। আমার রেডিয়ো-টেলিস্কোপ যে কোথায় কোন অজানা জায়গায় লুকোনো, তা এরা জানে না। আমায় শুধু মাঝে মাঝে কিছু দরকারি সাজসরঞ্জাম আর রসদের জন্য কোনও-না-কোনও বড় দেশের আধুনিক শহরে আসতে হয় বলে এবারে এদের নজরে আমি পড়ে গেছি। আমার কাজ শেষ করবার জন্য যেমন করে হোক এদের কাছ থেকে লুকিয়ে নিজের ঘাঁটিতে আমায় পালাতে হবে। সেই সুযোগটুকু শুধু আমি চাই।
দুদ্যুব্যারি আমাকেই যেন দেবতা বানিয়ে তার প্রার্থনা জানালে!
অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে তাই বলতে হল, সে সুযোগ তো আপনি পাবেন না, সিয়ে দ্যুব্যারি। যারা আপনার পেছনে লেগে আছে তারা আপনার ওই কালো ফুটো কবজা করবার ফন্দি নেহাত আজগুবি ঘোড়ার ডিম মনে করলেও সাবধানের মার নেই হিসেবে আপনাকে নিজের খুশি মতো পাগলামি করবার জন্যও ছেড়ে দেবে না। তাদের একজন হিসেবে আমি আপনার সামনেই আছি। তা ছাড়া এই হোটেলে আর তার বাইরে ক-জন যে এই শহরে আপনার ওপর নজর রাখবার জন্য আছে, তা আমিও জানি না। এদের হাত ছাড়িয়ে, এখন আর আপনি পালাতে পারবেন না।
এতক্ষণে হতাশায় একেবারে ভেঙে পড়ে দুব্যারি বললে, তা হলে কী করতে চান এখন আমাকে নিয়ে?
আপনাকে আমি ধরিয়ে দেব। শক্ত হয়েই বললাম, তবে আপনার নিজের সম্মানের খাতিরে আর হোটেলের সুনামের জন্য সামনের কোনও লিফটে হোটেলের লবি দিয়ে আপনাকে নিয়ে যেতে চাই না। হোটেলের পেছনের দিকে দরকার মতো হোটেলের মালমাত্র তোলা আর নামানোর জন্য যে সার্ভিস লিফট আছে, তাই দিয়েই আপনাকে নিয়ে যাব। যাবার আগে শুধু দু-একটা কাজ সারবার আছে।
সেসব কাজ সেরে যখন দুব্যারিকে নিয়ে যাবার জন্য ডাকলাম, তখন সে যেভাবে বিনা প্রতিবাদে সোফা থেকে উঠে এল, তাতে মনে হল, সব আশা-ভরসা হারিয়ে সে একটা নিষ্প্রাণ পুতুল হয়ে গেছে। সোফায় এলিয়ে পড়ে থেকে আমি যে এতক্ষণ কী করেছি, তাও সে লক্ষ করেনি।
দুব্যারিকে যা বলেছিলাম, সেইমত পুলিশ-ঘাঁটিতে রেখে আসবার পর সামনের গেট দিয়েই হোটেলে ঢোকবার সময় বোরোত্রাকে প্রথম দেখলাম। তার নিজের চেহারা এমন যে, সামনে কোথাও পড়লে পাঁচশো জনের মধ্যেও লক্ষ না করে উপায় নেই, বিরাট বপু আর তার সেই জালার মতো বিশাল ভূঁড়িটির জন্য মানুষের চেয়ে। তাকে হিপোপটেমাসেরই স্বজাতি বলে মনে হয়। এর ওপর আর-একটি কারণে তাকে সব সময়ে আলাদা করে চেনা যাবে। তাকে কোথাও কখনও একলা দেখা যায় না। একটি নিত্যসঙ্গী তার সঙ্গে সব সময় থাকে।
সেদিনও সেই সঙ্গীটিকে কাছে নিয়েই সে বসেছে। জালার মতো ভুড়ি নিয়ে দৈত্যের মতো চেহারায় নিজে যে চেয়ারটাতে বসেছে, তার পাশের চেয়ারটিতেই রেখেছে তার পুঁচকে সেই নিত্যসঙ্গীটিকে।
লবি দিয়ে লিফটের দিকে যাবার পথে এরকম মানুষটাকে দেখে দু সেকেন্ডের বেশি মনোযোগ হয়তো দিতাম না। কিন্তু হঠাৎ ক-টা কথা কানে গিয়ে ছুঁচের মতো বেঁধায় লিফটের খাঁচার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েও ওপরে এখনই যাব কিনা ভাবতে হল।
তখনও অবশ্য লোকটার দিকে মুখ ঘুরিয়ে পুঁচকে সঙ্গীর সঙ্গে তার কথাগুলো যে শুনেছি, তা আমি বুঝতে দিইনি। লিফটটা তখনও ভাগ্যক্রমে নামেনি। সেটার জন্য দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করার মধ্যে আরও ক-টা কথা শুনে কান ঝাঁঝাঁ করার বদলে মজাই পেলাম।
জ্বলে ওঠার বদলে মজা পাওয়াটাই অবশ্য গোড়া থেকে উচিত ছিল। তবে তখন আচমকা ওই ধরনের কথাগুলো ওইভাবে আর ওই ভাষায় শুনে মেজাজটা একটু টালমাটাল হয়ে গিয়েছিল ঠিকই।
লোকটার আর তার সঙ্গীর দিকে একবার নজর দিয়েই লিফটের দিকে যেতে যেতে একটা সরু পিনপিনে গলায় শুনেছিলাম এই শুঁটকো চামচিকেটাকেই খুঁজছিলি না? তার উত্তরে ভারী গলার কথা শোনা গেছল, হু। তা হলে চুপ করে বসে আছিস কেন?আবার সেই পিনপিনে ছুঁচলো গলায় শোনা গেল, ডাক না ছুঁচোটাকে! আর না যদি আসে, তবে দে মুরগির গলাটা মুচড়ে ছিঁড়ে। কথাগুলোর পরেই সেই পিনপিনে ছুঁচলো গলার হিহি করে বিদঘুটে হাসি। আর সেই ভারী গলায় আদরের ধমক, আরে চুপ চুপ, লোকে বুঝতে পারবে।
লবিতে ওদের কাছাকাছি যারা ছিল, তাদের অনেকেই তখন এই বাক্যালাপে হাসছে। তবে তার মানে বুঝে নয়। কারণ সে মানে বোঝা কারওর পক্ষে সম্ভব নয় এই জন্য যে, বাক্যালাপের ভাষাটা হল বাপৃথিবীর মধ্যে যা বিরলতম ভাষার একটি। লোকগুলো হাসছিল মিহি আর মোটা গলা দুটোর কথা বলাবলির ধরনে।
লিফটটা এতক্ষণে ওপর থেকে নামতে শুরু করেছে। কিন্তু আমাকে আর তাতে উঠব কি উঠব না তা ঠিক করবার দ্বিধায় থাকতে হল না। লিফটের কাছে তখন আমিই একা দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ পেছন থেকে ভারী গলায় ফরাসিতে অত্যন্ত ভদ্র বিনীত অনুরোধ শুনলাম—ও মশাই, লিফটের কাছে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন তাঁকে বলছি। দয়া করে আমাদের এ টেবিলে একট এসে আমাদের বাধিত করবেন? আমার শরীরটা বড় বেসামাল, নইলে আমিই এখনই উঠে যেতাম। কিছু মনে করবেন না।
