কথাগুলো যতক্ষণ বলা হচ্ছে, তার মধ্যে লিফটের দরজার কাছ থেকে প্রথম যেন অবাক হয়ে, ঘাড় ফিরিয়ে কে আমায় ডাকছে দেখে আমি একটু যেন অবাক হয়ে ওই দুই মূর্তির টেবিলের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছি।
দৈত্যাকার মানুষটা তখন তার সঙ্গীটিকে বাঁ হাতের মুঠোয় তার চেয়ার থেকে তুলে নিয়ে ডান হাত বাড়িয়ে আমার সঙ্গে করমর্দন করে বলছে, আমায় মাপ করবেন। একটু বিশেষ কারণে আপনাকে এমন করে বিরক্ত করলাম। আমার নাম বোরোত্ৰা, হ্যাঁ বোরোত্রা, আর এর নাম হল—
আমার নাম পিঁপিঁ। পিঁপিঁ। বোরোত্রার আগেই তার বাঁ হাতের মুঠোর পুঁচকে সঙ্গী যেন ছটফটিয়ে উঠে সরু খ্যানখ্যানে গলায় বলে উঠল, তারপর দাঁতে-দাঁত-চাপা গলায় ফিসফিসিয়ে সেই বাক ভাষাতে বললে, ছুঁচোটা যেন আমায় না ছোঁয়।
যেন কিছুই বুঝতে পারিনি, এমনই মজা-পাওয়া মুখ করে আমি পিঁপিঁর একটা খুদে নরম হাত ধরে নাড়া দিয়ে বললাম, আপনার সঙ্গে আলাপ করে খুশি হলাম, সেনর পিঁপিঁ। আমার নাম হল দাস। শুধু দাস।
পিঁপিঁ তখন কাছাকাছি সকলের হাসির মধ্যেই কঁকিয়ে উঠে চিৎকার করে আমায় গাল পাড়ছে ফরাসি ভাষাতেই। ছিঁড়ে গেছে নড়াটা আমার, ছিঁড়ে গেছে একেবারে! ওরে বাবা রে! মরে গেছি রে!
সেই সঙ্গে বাস্ক ভাষায় ফোড়নও চালাচ্ছে মাঝে মাঝে। যেমন—চিমসেটাকে, দে না নিংড়ে শেষ করে, কিংবা—ছারপোকাটাকে টিপে মার।
বাস্ক তো নয়ই, ফরাসিও কেউ বুঝুক বা না বুঝুক, কাছাকাছি যারা ছিল, তারা পিঁপিঁর সেই সরু খ্যানখেনে গলার কাতরানি আর সেই সঙ্গে চুপ! চুপ বলে বোরোত্রার ভারী গলার ধমকে দারুণ মজা পেয়ে হাসি আর থামাতে পারেনি।
তাদের হাসির কারণ হল পিঁপিঁ। পিঁপিঁ একটা তুলো-ভরে-সেলাই করা পুঁচকে পুতুল। ভেন্ট্রিলোকুইস্টরা মুখ না নেড়ে তাদের ছদ্ম-গলার কথা যেন অন্য জায়গা থেকে বার করবার জন্য এই পুতুল ব্যবহার করে। এ পুতুলকে দিয়ে মজা করে অনেক উলটোপালটা খোঁচানো কথা বলানো যায়।
বোরোত্রা সব সময়ে এই পুতুল তার সঙ্গে রাখে। এ পুতুলকে দিয়ে যখন তখন যেখানে সেখানে বেয়াড়া কথা বলানো তার শুধু মজার খেলা নয়, এটা তার একটা রোগও। নিজের মনের কথাগুলো এইভাবে সে পেট থেকে বার না করে দিয়ে পারে না। কেউ যাতে কিছু বুঝতে না পারে সেই জন্যেই সে অবশ্য বাস্ক-এর মতো এমন একটা ভাষা ব্যবহার করে, যা দুনিয়ার কেউ জানে না বললেই হয়।
ঘনাদা থামলেন। তাঁর একটানা কাহিনী শোনার মধ্যে অবাক হয়ে আর একটা ব্যাপারও আমরা লক্ষ করেছি। এতক্ষণের মধ্যে ঘনাদা একবার একটা সিগারেটও খাননি। শিশির অবশ্য মেজাজ খারাপ থাকার দরুন ইচ্ছে করেই নিজে থেকে তাঁকে সিগারেট এগিয়ে দেবার চেষ্টা করেনি। কিন্তু ঘনাদার তো ভালমানুষের মতো তা মেনে নিয়ে চুপ করে থাকার কথা নয়।
এখন এতক্ষণের অন্যায়টা শোধরাবার জন্য শিশির যখন পকেটে হাত দিতে যাচ্ছে, ঘনাদা তখন নিজের পকেট থেকেই সিগারেটের একটা প্যাকেট বার করে
আমাদের চমকে দিলেন।
সে আবার যেমন-তেমন সিগারেট নয়। প্যাকেটের এক কোণ ছিঁড়ে তা থেকে একটা সিগারেট অবহেলাভরে বার করার সময় খানদানি গন্ধটাই শুধু নাকে গেল না, প্যাকেটের ওপর ছাপা ব্র্যান্ডের নামটা পড়েও চোখ কপালে ওঠবার জোগাড়।
বিদেশি একেবারে পয়লা নম্বরের একটা সিগারেট। ঘনাদা এয়ারপোর্ট হোটেলেই কিনেছেন নিশ্চয়।
এখন সেটা ধরাবার জন্য শিশিরের দেশলাইকাঠি জ্বালবারও অপেক্ষা করলেন। নিজেই আর এক পকেট থেকে এক বিদেশি দেশলাইয়ের খাপ বার করে তার কাঠি খুলে জ্বেলে সিগারেট ধরালেন।
০৫. ঘনাদার মৌজ করে সেই সিগারেট খাওয়া
ঘনাদার মৌজ করে সেই সিগারেট খাওয়ার মধ্যেই গৌর তার হাতঘড়িটা আমাদের দেখাতে বেশ সন্ত্রস্ত হয়ে আমরা পরস্পরের সঙ্গে চোখাচোখি করলাম। বেলা তো প্রায় দেড়টা হয়ে গেছে। আমাদের তো বটেই, ঘনাদা নিজেরও নাওয়া খাওয়ার কথা ভুলে গেছেন নাকি? গল্প যা কেঁদেছেন, তা এত বেশি সবিস্তারে বলার মধ্যে অতিমাত্রায় বেলা বাড়িয়ে দিয়ে আসল কথাটা গোলেমালে হারিয়ে ফেলে দেওয়ার মতলব নেই তো?
সিগারেটে ঘনাদার দু-চারটে রামটানের পর তাই একটু কড়া গলাতেই বলতে হল, এ সব বৃত্তান্ত তো অনেক শোনালেন! সারাদিন ধরে নাওয়া খাওয়া ভুলে এ বৃত্তান্ত শুনে আমাদের মোক্ষলাভ হবে না, পল্টুবাবুর গাড়ির আট-ন গ্যালন তেল ফুকে দিয়ে আসার ঠিক মতো জবাবদিহি পাব? –
কেন? কেন? আমাদের সকলের চোখ কপালে তুলিয়ে পল্টুবাবুই ঘনাদার হয়ে জোরালো ওকালতি করলেন, ওঁকে অমন যা-তা বলছ কেন? উনি যা বলছেন, আমার আটন গ্যালন তেলটা তার চেয়ে দামি হল তোমাদের কাছে? না, না, আপনি বলুন, বলে যান। একদিন অমন নাওয়া খাওয়া বন্ধ হলে যার নাড়ি ছেড়ে যায়, সে চলে গিয়ে খাওয়া-দাওয়াই করুক। বলে যান আপনি।
হায় কপাল! যার জন্য লড়তে নামি, সে-ই বন্দুকের নল দেয় ঘুরিয়ে।
আমাদের উড়ন্ত নিশান একেবারে ভিজে ন্যাকড়ার মতোই নেতিয়ে পড়ে।
ঘনাদা তার ওপর কাটা ঘায়ে যেন নুনের ছিটে দিয়ে বললেন, না, না, খিদেতেষ্টার কথা মনে রাখতে হবে বইকী! সকলের সহ্যশক্তি তো আর সমান নয়।
তা ছাড়া বেলাও বড় কম হয়নি। তবে আমারও বলার খুব বেশি কিছু আর নেই।
বোরোত্রার নিজের সঙ্গে সারাক্ষণ পুতুলের ছল করে কথা বলবার ওই বদভ্যাসটা যে একটা রোগ, সেদিন হংকং-এর চিনা হোটেলের লবিতেই সেরকম সন্দেহ হয়েছিল। আমার সন্দেহটা ঠিক না হলে তার সঙ্গে জীবনে দ্বিতীয়বার দেখা আর অবশ্য হত না। আর তা না হলে ই-ইউ-ডব্লিউ-সি নামটা দুনিয়া থেকে মুছে গিয়ে এসএস-পি-এস-এর সাম্রাজ্যই নিশ্চয়ই সমস্ত পৃথিবী গ্রাস করে নিত।
