সূর্যের তাপ পৃথিবীতে যা পাওয়া যায় তার চেয়ে মহাশূন্যে শুধু অনেক বেশি নয়, সারাক্ষণই পাওয়া যায়। মহাকাশে অসংখ্য সূর্যের তাপ ধরবার যন্ত্র-বসানো স্যাটেলাইট ঘুরিয়ে, তারই উৎপন্ন বিদ্যুৎশক্তি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বেতার অণু-তরঙ্গে পৃথিবীর কারবারিদের নিজস্ব সব অণু-তরঙ্গ-ধরা অ্যান্টেনা-গ্রিডের ঘাঁটিতে পাঠিয়ে, তা থেকেই সর্বত্র নিজেদের লাইনে পাঠাবার মতো হাই-ভোল্টেজ বিদ্যুৎশক্তি উৎপাদন করে এই কারবারিরা ভবিষ্যতের দুনিয়াকে নিজের হাতের মুঠোয় রাখবার জন্য এস-এস-পি-এস নিয়ে এক বিরাট কোম্পানি গড়ে তুলছে। দু-চার বছর নয়, অমন বিশ পঞ্চাশ, এমনকী, একশো বছর এরা অপেক্ষা করতে প্রস্তুত। এরা জানে, একদিন এদের কাছে পৃথিবীর সবাইকে হাত পাততে হবে। তাদের শুধু সাবধান থাকতে হবে যাতে তাদের এই ভাবী শক্তি-সাম্রাজ্যের একাধিপত্যে বাদ সাধবার মতো কোথাও কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী না গোকুলে বাড়তে পারে।
একটু থেমে তার দিকে নালিশের আঙুল তুলে বললাম, আপনি সেই প্রতিদ্বন্দ্বী। কী এক আজগুবি ফন্দি খাটিয়ে আপনি ওদের এই একচ্ছত্র সাম্রাজ্য ধসিয়ে দিতে চান—আপনি—
না, না, অস্থিরভাবে আমার কথায় বাধা দিয়ে বললে দুবারি, আমি যা করতে চাইছি, তা সত্যিই আজগুবি কিছু নয়। আমি একা নয়, আমার সঙ্গে আমারই মতো আরও ক-জন এই কাজে নিজেদের উৎসর্গ করেছে। আমরা সাম্রাজ্য গড়তে চাই না। পৃথিবীর সকলের জন্যে নিতান্ত সস্তায় এমন অঢেল এনার্জির ব্যবস্থা করতে চাই, যা আকাশ-বাতাসকে কোথাও এতটুকু নোংরা করবে না। আমরা একাজে অনেক দূর এগিয়েছি, আর কিছুদিন নির্বিঘ্নে একট নিরিবিলিতে যদি কাজ করতে পারি, তা হলে আমাদের আবিষ্কারে উদ্ভাবনে পথিবী স্বর্গ হয়ে উঠবে। আমাদের আসল কাজটা যা নিয়ে তা এখনও কাউকে বলার উপায় নেই, তাই
বলার দরকার নেই, দ্যুব্যারিকে থামিয়ে বললাম, কী আপনাদের কাজ, তা আমি জানি।
জানেন? অবাক আর সেই সঙ্গে একটু হতভম্ব গলায় বললে দ্যুব্যারি, কিন্তু আমরা তো–
আপনাদের আসল কাজ আর উদ্দেশ্য ঘুণাক্ষরেও কোথাও প্রকাশ করেননি, এই তো? দ্যুব্যারির কথাটা তার হয়ে শেষ করে দিয়ে বললাম, তা না করলেও আপনারা কোথাও কোনও গোপনে একটা নতুন ধরনের রেডিয়ো-টেলিস্কোপ বসিয়েছেন, এই খবরটুকুই অল্পবিস্তর এখানে ওখানে ছড়িয়েছে। কেউ কেউ তার ওপর শুধু আর-একটু অনুমান করেছে যে অমন গোপনে চুপিচুপি কোথাও নতুন রেডিয়ো-টেলিস্কোপ বসানো নেহাত বাতুল খামখেয়াল নয়। আমি কিন্তু জানি যে, আপনাদের কাজকর্মগুলো খামখেয়াল না হলেও ছোট শিশুর চাঁদ ধরতে চাওয়ার চেয়ে কম আজগুবি বাতুলতা নয়।
আজগুবি বাতুলতা বলছেন আপনি? দুব্যারি রীতিমতো ক্ষুণ্ণ।
তা ছাড়া কী বলব? একটু হেসে বললাম, অবোধ শিশু আকাশের চাঁদ ধরতে চায়, আর আপনারা চাইছেন চাঁদ-সূর্য-তারা-টারা কিছু নয়, মহাশূন্যের একটা ঘেঁদা, একটা কালো ফুটো। সেই ফুটো দিয়েই দুনিয়ার সব এনার্জির সমস্যা আপনারা মিটিয়ে দেবেন। কয়লা, পেট্রোল কি পরমাণু শক্তির আর কোনও দরকারই থাকবে —এই তো আপনারা বলতে চান?
খানিক যেন ভোম মেরে চুপ করে থাকবার পর দুব্যারি ধীরে ধীরে বললে, কী করে আপনি এ সব জেনেছেন জানি না, কিন্তু সত্যিই এই কাজেই আমরা লেগে আছি। আকাশের একটা কালো ফুটো, এর মানে যদি সবাই বুঝত!
তার মুখ থেকে কথা প্রায় কেড়ে নিয়ে বললাম, বৈজ্ঞানিকেরা নিজেরাই এখনও ভাল করে বোঝে কি? উনিশশো সত্তরে আফ্রিকার কিনিয়া থেকে উঁহুরু নামে উপগ্রহকে পথিবী প্রদক্ষিণে ছাড়ার তিন মাস বাদে, এক্স-রে-র উৎস ধরে সিগনাস তারামণ্ডলে পৃথিবী থেকে প্রায় আট হাজাব আলোকবর্ষ দূরের, আমাদের সূর্যের বিশগুণ বড়, এক জ্বলন্ত তারার বেতালা অয়নেই তার বিরাট সঙ্গী হিসেবে মহাশূন্যের প্রথম যথার্থ এক কালো ফুটোর হদিস মেলে। মহাশূন্যের সেই কালো ফুটো যে কী তা এখনও প্রায় বেশির ভাগই অঙ্ক দিয়ে হাতড়ানো অনুমান আর কল্পনা। মাধ্যাকর্ষণ এমন এক শক্তি, যা দূরত্বের বর্গ হিসেবে বাড়ে কমে। দূরত্ব দু-গুণ বাড়লে মাধ্যাকর্ষণ চারগুণ কমে যায়, আবার দূরত্ব তিন ভাগ কমলে তা ন-গুণ যায় বেড়ে। বিশ্বের বিরাট বিরাট রাক্ষুসে সব তারার তো বটেই, সব জ্বলন্ত নক্ষত্রই শেষ পর্যন্ত নিজের মাধ্যাকর্ষণের টানে কুঁকড়ে ছোট হতে হতে নিজের মধ্যেই এমন নিশ্চিহ্ন হয়ে তলিয়ে যায় যে, একটা আলোর কিরণেরও ক্ষমতা থাকে না সেই চরম মাধ্যাকর্ষণের টান ছাড়িয়ে বার হতে। জ্বলন্ত নক্ষত্রের সেই শেষ কবর মহাশূন্যের একটা কালো রাক্ষুসে ফুটো হয়ে থেকে যা নাগালের মধ্যে পায় তা শুধু গিলেই খায়। সে শুধু খায়, ওগরায় না কিছু। তার নাগালের মধ্যে পড়লে কোনও কিছুর নিস্তার নেই। সব কিছু সে টেনে নেবেই ফুটোর মধ্যে।
হ্যাঁ, ওই টেনে নেওয়ার ওপরই আমাদের সব ফন্দি খাটানো। দুব্যারি যেন আমার কথার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বললে, মহাশূন্যের কালো ফুটো সম্পর্কে অন্যকিছু সঠিক জানা থাক বা না থাক, তা যে নাগালের মধ্যে যা পায়, অবিরাম নিজের গহ্বর কবরে তা টেনে নেয়, এ-বিষয়ে কোনও দ্বিমত নেই। তা ছাড়া আর-একটা বিষয়ে বেশির ভাগ জ্যোতির্বিজ্ঞানীরই ধারণা যে, সমস্ত নিখিল ব্রহ্মাণ্ডে যেমন অসংখ্য ছায়াপথ নক্ষত্র আছে, তেমনই আছে অগুনতি কালো ফুটো। আমাদের নিজেদের এই ছায়াপথেই এমন অন্তত এক কোটি কালো ফুটো থাকা অসম্ভব নয়। সেসব ফুটো আবার বিরাট না হয়ে নেহাত ছোটও হতে পারে।
