দরজাটা বন্ধ করে তার দিকে চেয়ে এবার একটু কড়া গলাতেই বললাম, এ হোটেলটা পশ যাকে বলে সেইরকম খানদানি মোটেই নয়। তবে অনেকগলের চেনা, আর এদের আদর-যত্নের ব্যবস্থা খারাপ নয় বলে এখানেই আমি সাধারণত উঠি। এ হোটেলের ওপর আর যেমন একটু টান আছে, এখানকার মালিক ম্যানেজারও তেমনই আমায় একটু খাতির করে। তাদের কিছু না-জানিয়ে বেআইনিভাবে সম্পূর্ণ অচেনা একজন লোককে আমার কামরায় থাকতে দেওয়ার মতো বেয়াড়া কাজের কথা যদি তারা জানতে পারে তা হলে আমার অবস্থাটা কী হবে? আমার এ কামরায় হোটেলের বয়-বেয়ারারা নানা ফরমাশ তামিল করতে আসে। হোটেলের ডাইনিং রুমে নয়, আমি এখানেই নিজের কামরায় ডিনার খাই। সে-ডিনার দিতে, প্লেট-টেট নিয়ে যেতে, আর আরও নানা কাজে বয়-বেয়ারারা যখন আসা-যাওয়া করবে, তখন আপনি তাদের চোখে পড়বেন না বলতে চান? কোথায় আপনি তখন লুকোবেন? বাথরুমে?
হ্যাঁ, বলেই থতমত খেয়ে থেমে গিয়ে লোকটি শুকনো মুখে কয়েক সেকেন্ড পরে বললে, তা হলে? তা হলে আমি চলেই যাই।
সে অসহায়ভাবে বাইরের দরজার দিকে পা বাড়াতে তাকে হাতের ইঙ্গিতে বাধা দিয়ে বললাম, আপনার বিপদ খুব বেশি তা বুঝতে পারছি। কিন্তু আপনি তা থেকে বাঁচবার জন্য আমার শরণ কেন নিলেন বলুন তো?
আমি-আমি কিছু না ভেবেচিন্তে প্রথম আপনাকে ট্যাক্সি করে যেতে দেখে আপনার গাড়িতে উঠে পড়েছি।
লোকটি আরও কী বলতে যাচ্ছিল। তাকে বাধা দিয়ে বললাম, আপনি যা করেছেন তা তো আমি নিজের চোখেই দেখেছি। কিন্তু আপনার কাজটা কী রকম হয়েছে জানেন?
একটু থেমে কামরার একটা দেয়ালের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললাম, হোটেলটা খুব নতুন নয়, তা আপনাকে আগেই বলেছি। ওই দেখুন, দেয়ালে একটা শিকারি মাকড়শা ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই ছোট্ট মাকড়শাগুলো জাল পাতে না। একা একা শিকার করে বেড়ায়। পোকা বা মাছি দেখলে ওত পেতে থেকে জো বুঝে ঝাঁপ দিয়ে ধরে।
লোকটি এবার কেমন একটু সন্দিগ্ধভাবে আমার দিকে চাইছে। আমি ঠিক প্রকৃতিস্থ কি না এই বোধহয় সন্দেহ।
তার সন্দেহটা একটু গভীর হতে দিয়েই বললাম, বাগে পেলে এ মাকড়শা মাছি-টাছি শিকার করে, কিন্তু ধরুন, কোনও মাছি যদি নিজে থেকে যেচে এসে ওর খপ্পরে পড়ে, তখন মাকড়শাটার কীরকম ভাব হতে পারে বুঝতে পারেন?
লোকটা কোনও উত্তর না দিয়ে বেশ হতভম্ব আর একটু ভয়-ভয় মুখ নিয়ে আমার দিকে এবার চেয়ে রইল।
বুঝতে ঠিক পারছেন না, না? আমিই আবার একটু হেসে বললাম, আচ্ছা অন্য একটা কথা বলি। আমি কে, তা তো আপনি জানেন না। আমি ট্যাক্সি করে চলে যাচ্ছি দেখে পালাবার জন্য কিছু না ভেবেচিন্তে আমার গাড়িতে এসে উঠেছেন। এখন আমার পরিচয় একটু শুনুন। আমি এই হংকং শহরে কেন এসে আজ সাতদিন ধরে সমস্ত শহর টহল দিয়ে বেড়াচ্ছি? বেড়াচ্ছি শুধু একটি মানুষকে খোঁজবার জন্য। তার নাম দ্যুব্যারি। রোগা পাতলা প্রায় হাঘরে চেহারা পোশাকের একটা নেহাত সাধারণ মানুষ। নাম যশ অর্থ প্রতিপত্তি, কিছুই তার নেই। তবু পৃথিবীর কারও কারও কাছে তার দাম তার ওজনের হিরে-মানিকের চেয়ে বেশি। তেমনই একটি পার্টি দ্যুব্যারিকে খুঁজে বার করবার জন্য যা চাই তা-ই খরচা আর ইনাম কবুল করে আমায় লাগিয়েছে। দুব্যারিকে আমি এই হংকং শহরে খুঁজেও পেয়েছি। শুধু খুঁজেই পাইনি, সে নিজে থেকে—
এরপর আর কিছু আমার বলা হল না। দুব্যারি নামটা করার পর থেকেই একেবারে ভয়ে সিঁটিয়ে ফ্যাকাশে হয়ে লোকটা একটা দেয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে যেন কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। আমার কথার মাঝখানে শুকনো কাঁপা গলায় বললে, আপনি–আপনি আমাকে নিয়ে কী করবেন এখন?
আপনাকে নিয়ে। এক মুহূর্তের জন্য একটি মিথ্যে বিস্ময়ের ভান করতে গিয়ে খুব খারাপ লাগল বলে সোজাসুজিই এবার বললাম, আপনি তা হলে স্বীকার করছেন যে, দুবারি আপনার নাম। কিন্তু কারা আপনাকে যেমন করে হোক, যেখানে হোক ধরবার জন্য সমস্ত দুনিয়া খুঁজে বেড়াচ্ছে তা জানেন কি?
না। শুকনো কাতর গলায় দুব্যারি বলল, সত্যিই ঠিক করে জানি না। তবে তাদের যে অনেক ক্ষমতা, অনেক টাকা, পৃথিবীর সমস্ত দেশেই যে তাদের লোকজন চর-টর আছে, এটুকু ভাল করেই বুঝতে পেরেছি।
হেসে বললাম, তা হলে অনেকটাই বুঝেছেন। কিন্তু কেন তারা আপনাকে ধরতে চায় তা কিছু জানেন কি?
জানি, একটু ইতস্তত করে বললে দুব্যারি, তারা—তারা আমার সমস্ত কাজ নষ্ট করে দিতে চায়, আমায় তারা ব্যর্থ করতে চায়।
কিন্তু কেন তা চায়, কী আপনার কাজ, তা বলতে আপনার একটু দ্বিধা হচ্ছে— কেমন? এবার গম্ভীর হয়ে বললাম, এমনই বেকায়দায় পড়েও আপনার সব রহস্য আমার মতো অচেনা একজনের কাছে ফাঁস করতে চান না। তা হলে কী আপনার কাজের রহস্য, আর কেন কারা আপনাকে নিজেদের খপ্পরে পুরে সে কাজ নষ্ট করে দিতে চায় তা আমিই বলছি, শুনুন।
দুব্যারির করুণ অসহায় চেহারা দেখলে তখন মায়া হয়। দেওয়ালের ধার থেকে তাকে একটা সোফায় বসিয়ে তার পাশের আর-একটা আসনে বসে বলতে শুরু করলাম, উনিশশো তিয়াত্তরে আরব দেশগুলো তাদের অঢেল তেলের পুঁজির জোরেই গোদা গোদা সব রাজাগজার দেশের বড়মানুষি গরম ঠাণ্ডা করে দেবার পর পৃথিবীর সব জায়গায় নতুন করে হিসেবনিকেশ শুরু হয়। এ সব বিষয়ে মাথা যাদের পাকা, তারা এইটে তখন বুঝে ফেলেছে যে, আরবরা হঠাৎ আবার দয়া করলে বা নতুন আরও ক-টা আরব দেশের মতো তেলের খনি বেরুলেও পৃথিবীর জ্বালানির সমস্যা চিরকালের মতো তাতে মিটবে না। এখন যত অঢেলই মনে হোক, মানুষের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে পৃথিবীর বুকের এ সব তেলের পুঁজি ক্রমশই একেবারে ফুরিয়ে যাবে। তখন উপায়? উপায় অনেক রকমই আছে মনে হয়। পারমাণবিক শক্তি থেকে শুরু করে সূর্যের তাপ পর্যন্ত অনেক কিছু ভবিষ্যতের ভরসা হতে পারে। কিন্তু তা, অপর্যাপ্ত শুধু নয়, সস্তা আর সহজে পাবার মতো হওয়া চাই। পৃথিবীর পয়লা নম্বর মহাজনি কারবারিরা তার চেয়েও যা বেশি চায়, তা হল যাকে বলে মৌরসি পাট্টা। দুনিয়ার জ্বালানির সমস্যা যা মেটাবে তা যেন গোনাগুনতি ক-জনের মাত্র দখলে। থাকে। নগদ লাভ ওরা বোঝে, কিন্তু শুধু সেই দিকে নজর দিয়েই কাজ করে না। ওরা অনেক দূর-ভবিষ্যতের ওপর চোখ রেখে খুঁটি সাজাতে জানে। ও সব দেশে তাই এস-এস-পি-এস অর্থাৎ স্যাটেলাইট সোলার পাওয়ার স্টেশন নিয়ে এক বিরাট কারবার ফাঁদা হয়েছে। এ কারবারে জোট বেঁধেছে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় আর ধুরন্ধর টাকার কুমিরেরা।
