বেশ, আমার কাছেই শোনো তা হলে, বলে লেভি এবার এস-এস-পি-এস আর ই-ইউ-ডব্লিউ-সির সমস্ত রহস্য আমায় বুঝিয়েছে। সে রহস্য নিজে জানবার পর এস-এস-পি-এস-এর হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করতে রাজি না হওয়ায় কেমনভাবে তাকে তুরস্কের ইস্তাম্বুল থেকে লোপাট করে কাছের এক ছোট দ্বীপে বন্দি করে রাখা হয়, সেখানে শেষ পর্যন্ত তাকে খতমই করে দেওয়া হবে জেনে কেমন করে সে ভাগ্যক্রমে সেখান থেকে পালায় আর তারপর এসব গোপন রহস্য জানিয়ে যাবার জন্য নিজে এস-এস-পি-এস-এর ভাড়াটে দুশমনদের হাতে ধরা পড়বার বিপদ সত্ত্বেও কীভাবে তার পুরনো বিশ্বাসী বন্ধুদের খোঁজ করে বেড়ায়, সে কাহিনী লেভি আমায় শুনিয়েছে।
আমায় খুঁজে পাওয়াটা নেহাত তার ভাগ্য। প্যারিসের নানা রাস্তায় ছন্নছাড়ার মতো ঘুরতে ঘুরতে একদিন সে একজনের চেহারা দেখে বেশ ফাঁপরে পড়ে। চেহারাটার সঙ্গে তার এককালের বন্ধু আর সঙ্গী দাস-এর খানিকটা মিল থাকলেও, ফেরা পোশাক সবই আলাদা।
০৪. চলাফেরার কায়দা
ও! আপনি বুঝি চলাফেরার কায়দাও বদলে দিয়েছিলেন? ঘনাদার কথার মাঝখানেই মুগ্ধ গদগদ স্বরে বললেন পল্টুবাবু।
হ্যাঁ, চেনার অসাধ্য করে ভোল পালটাতে হলে শুধু চেহারা পোশাকই নয়, হাঁটা, চলা, কথা বলার ধরনও বদলাতে হয়! ঘনাদা একটু অনুকম্পার হাসির সঙ্গে জ্ঞানটুকু দিতে পেরে খুশি হয়েই আবার বলতে শুরু করলেন, কিন্তু লেভিও তো গুপ্তচরগিরির বিদ্যায় বড় কম যায় না। গরমিলগুলো সত্ত্বেও সে দূর থেকে আমার পিছু নেয়, আর তারপর আমার হোটেলটার হদিস পেয়ে দেখা করতে আসে মরিয়া হয়েই।
তার নিজের যে আর কিছু করবার ক্ষমতা নেই তা সে ভাল করেই জানে। এস-এস-পি-এস-র কয়েদখানায় তার শরীরের যা হাল হয়েছে তাতে আর ক-দিনই বা সে টিকবে! তা ছাড়া বেঁচে থাকলেও যে-দুশমনেরা তার পেছনে লেগে আছে, তারা তাকে ধরে ফেলবেই। আমায় তাই লেভি তার জোগাড় করা সমস্ত সুলুকসন্ধান দিয়ে ই-ইউ-ডব্লিউ-সি আর এস-এস-পি-এস সম্বন্ধে যা করবার তাই করতে বলে।
আমার একটা সুবিধের কথাও সে আমায় জানিয়ে দেয়। ই-ইউ-ডব্লিউ-সি তো বটেই, এস-এস-পি-এস-এর চর আর চাঁইদের কাছেও আমি একেবারে অজানা। আমি তাই বেশ চুপিসারে তাদের পেছনে লেগে থেকে নিজের মতলব হাসিল করতে পারব।
সবশেষে লেভি বলেছে, ই-ইউ-ডব্লিউ-সি সম্বন্ধে সমস্ত পৃথিবীর মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে আমার দায়িত্ব যে কী তা আমায় যে বলে দিতে হবে না, তা সে জানে।
লেভিকে তারই ভালর জন্য মাঝিমাল্লার ওই কফি-খানাতেই রেখে আমি একলা সেখান থেকে চলে এসেছি। সাবধানের মার নেই বলে হোটেলটা থেকেও পাওনাগণ্ডা চুকিয়ে সরে পড়েছি সেইদিনই।
তারপর লেভির কাছে পাওয়া সব সুলুক-সন্ধানের খেই ধরে যত জায়গায় ঘুরেছি। তা দেখাতে হলে সারা দুনিয়ার ম্যাপটাই খুলে ধরতে হয়। সারা দুনিয়া চষে বেড়াবার পর তখন ক-দিনের জন্য হংকং-এ আছি। কাজ যে কিছু সারতে পারিনি তা নয়, কিন্তু হঠাৎ সেদিন সন্ধ্যাবেলা যা হয়ে গেল, তা আমার সম্পূর্ণ আশাতীত।
বিকেলের দিকে সেদিন হংকং-এর সব দ্রষ্টব্যের মধ্যে তুলনাহীন সেই সমুদ্র-পার্কে গিয়েছিলাম। পৃথিবীর কোথাও যা নেই, সামুদ্রিক প্রাণীর সেই বিরাট স্বাভাবিক পরিবেশের সমাবেশে অন্য সবকিছুর মধ্যে বিশেষ করে গ্লোরি আর বার্ট নাম দেওয়া দুই ডলফিনের জল থেকে পুরো এক-মানুষ-প্রমাণ লাফ দিয়ে দিয়ে উঠে বল হেড করার বাহাদুরি দেখে বেশ একটু আমোদ পেয়ে কেবল কারে চড়ে বাইরে এসে একটা ট্যাক্সি ভাড়া করে উঠে বসতে গিয়ে তাজ্জব হয়ে গেছি।
ট্যাক্সির দরজাটা খুলে সবে ভেতরে উঠে বসেছি, এমন সময় অন্যদিক থেকে একটা রোগাটে হাঘরে চেহারা ও পোশাকের মানুষ যেন চোরের মতো ছুটে এসে অন্যদিক দিয়ে আমার ট্যাক্সিটায় উঠে পড়ে কাতর মিনতি করে বলল, দোহাই আপনার, যেখানে যাচ্ছিলেন সেখানেই চালাতে বলুন।
মিনতিটা ফরাসিতে করা। ট্যাক্সিতে চিনে ড্রাইভার ফরাসি বুঝুক না বুঝুক এ উপদ্রবে রেগে উঠে তার নিজের ভাষায় আর পিজিন ইংরেজিতে লোকটাকে নেমে যাবার জন্য ধমক দিলে।
আমার দিকে করুণভাবে চেয়ে লোকটা নেমে যেতেই উঠছিল। কিন্তু আমি বাধা দিয়ে তাকে থামিয়ে ড্রাইভারকে আমারে হোটেলের ঠিকানায় চালাতে বললাম। হোটেল পর্যন্ত পৌঁছবার পর লোকটা নেমে চলে যাবে ভেবেছিলাম। তা গেলে তাকে বাধা দিতেও পারতাম না। কিন্তু তা সে গেল না। আমি লবি থেকে অটোমেটিক লিফটে গিয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তার সেই আধময়লা ছেঁড়া হ্যাভারস্যাক নিয়ে সুড়ত করে ঢুকে পড়ে আমার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল।
পাঁচতলায় আমার কামরা। সেখানকার ল্যান্ডিংয়ে নামবার পরেও দেখি, সে আমার সঙ্গ ছাড়ছে না। আমার কামরা সতেরো নম্বর। সে কামরায় যাবার প্যাসেজে তখন কোনও লোক নেই। আমার কামরার সামনে দাঁড়িয়ে দরজায় চাবি লাগাতে লাগাতে তার দিকে ফিরে বললাম, আমি কিন্তু এবার আমার কামরায় যাচ্ছি।
দয়া করে আমাকে তা হলে আজকে রাত্রের মতো এখানে থাকতে দিন। লোকটা আতঙ্ক-মেশানো চাপা গলায় বললে, আমি মেঝের কার্পেটের ওপর শুয়ে থাকব। আপনার এতটুকু অসুবিধে করব না। আর কাল ভোর হবার আগেই এখান থেকে পালিয়ে যাব।
একটু বাঁকা ঠোঁটে হেসে কামরার দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে আমার আগেই সেই আগের মতো সুড়ুত করে যেন চোরের মতো ভেতরে ঢুকে পড়ল।
