আমার দিকে সেইভাবেই কয়েক সেকেন্ড চেয়ে থেকে সে বললে, দাস, তোমায়–
আমার এবার কী করা উচিত তা এইটুকুর মধ্যে আমি ঠিক করে নিয়েছি।
লেভিকে তার কথাটা শেষ করতে না দিয়েই কড়া গলায় বললাম, কাকে কী বলছেন আপনি? দাস বলছেন কাকে? আমি দাস নই! মিছিমিছি কেন আমাকে। ডাকিয়ে নামিয়েছেন?
লেভির মুখচোখের চেহারা দেখে তখন কষ্ট হচ্ছে। কেমন হতাশভাবে আমার দিকে তাকিয়ে সে বলেছে, তুমি-আপনি দাস নন?
না, আমি দাস নই। আমার নাম ললাপেজ গঞ্জালেস। হোটেলের কাউন্টারে জিজ্ঞাসা করলেই আমার নাম জানতে পারতেন–
বেশ গলা চড়িয়ে লেভিকে এসব কথা শোনাবার মধ্যে একটা চোখ কয়েকবার মটকে তাকে ইশারা করবার চেষ্টা করেছি।
লেভির চোখের দৃষ্টিই হয়তো ক্ষীণ হয়ে গিয়েছে বলে সে সে-ইশারা বুঝেছে বলে মনে হয়নি।
তার ওপর ফরাসিতে চড়া গলায় তম্বি করার মধ্যে তাই এবার একবারের জন্য গলাটা একেবারে নামিয়ে তুর্কি ভাষায় একটা কথা শুধু বলেছি। ফ্রান্সের লোক হলেও লেভি যে বহুকাল তুরস্কেই কাটিয়েছে আর সেখানকার ভাষা যে ওর প্রায় মাতৃভাষার মতো তা জেনে চড়া গলার গালাগালির মধ্যে ছোট্ট করে শুধু তুর্কিতে একবার বলেছি, এটা নাটক।
মুখের তোড়টা অবশ্য আগে পরে সমানে চালিয়ে গেছি। বলে গেছি, আসলে কে আপনি, কী মতলবে এখানে এসেছেন ঠিক করে বলুন। আজগুবি একজনের নাম বলে এখানে খুঁজতে আসার ছল করে ঢোকার নিশ্চয়ই একটা কোনও উদ্দেশ্য আছে।—ভয় নেই! এটা নাটক!—আপনার পাকা চুলদাড়ি দেখে ভুলব ভাববেন না। ও সব চালাকি আমার অনেক জানা আছে।
চোখের ইশারায় যা হয়নি, আমার তম্বির মধ্যে ওই তুর্কি কথাটুকুতেই তা হাসিল হয়েছে। ক্লান্ত দুর্বল গলাতে হলেও লেভি এবার ব্যাপারটা বুঝে নিজেও যথাসাধ্য অভিনয় করবার চেষ্টা করেছে।
চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করে বলেছে, না, না, আমারই ভুল হয়েছে। এখানে আসা। আমায় মাপ করবেন। আমি—আমি চলে যাচ্ছি।
কিন্তু চলে যাবে কী, উঠতে গিয়েই লেভি হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাবার জোগাড়।
কোনওরকমে তাকে ধরে ফেলে এবার বাধ্য হয়ে সুর পালটাতে হয়েছে।
যেন অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বলেছি, আরে আপনি হাঁটতে গিয়ে টলে পড়ছেন যে! নেশায় চুর হয়ে এসেছেন বুঝি? অবস্থা যা দেখছি তাতে এই হোটেলের মধ্যেই দাঁত চিরকুটে পড়ে একটা কেলেঙ্কারি বাধাবেন। চলুন, চলুন, আপনাকে বার করে দিয়ে আসি। আরে না, না, ও সামনের দরজা দিয়ে নয়। ওখানে কেউ আপনার এ চেহারা দেখলে এ হোটেলের বদনাম হয়ে যাবে। এদিকে এই খিড়কি দিয়ে আসুন—
এই সব বোলচাল দিতে দিতে লেভিকে ধরে হোটেলের পেছনের দিকের একটা খিড়কি দরজা দিয়ে বেরিয়ে নিরাপদ বলে সেইন নদীর ধারে ওখানকার মাল-টাল বওয়া লঞ্চ, টাগবোটের মাঝিমাল্লাদের একটা কফিখানায় গিয়ে উঠেছি।
সেখানে লেভির এমন হাল কী করে হল জানতে চাওয়ায় তার মুখে এস-এস-পি-এস শুনে অবাক হয়েছি।
জিজ্ঞাসা করেছি, এস-এস-পি-এস! এ নাম তুমি কোথা থেকে জানলে? কী জানো তুমি এস-এস-পি-এস সম্বন্ধে?
যা জানবার সবই জানি, হতাশ ভাবে বলেছে লেভি, আমার এখন এ হাল হয়েছে ওই এস-এস-পি-এস-এরই জন্য।
এস-এস-পি-এস-এর জন্য?অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেছি, তা হলে ওদের সঙ্গে তুমি জড়িত ছিলে?
হ্যাঁ, ছিলাম, ক্লান্তভাবে বলেছে লেভি, কিন্তু ওরা কারা, কী ওদের কাজ, তুমি নিজে কিছু জানো?
তা একটু জানি বইকী, তিক্ত স্বরেই বলেছি, আর কিছু অন্তত না-জানলে আর আরও কিছু জানতে না চাইলে এমন করে নাম ভাঁড়িয়ে এরকম একটা জায়গায় লুকিয়ে বসে আছি কেন? কিন্তু তুমি এখানে আমায় খুঁজে বার করলে কী করে?
নেহাত ভাগ্যের জোরে, বলে লেভি তার নিজের কাহিনীটা আমায় শুনিয়েছে।
লেভি কাজটা এতদিন যা করে এসেছে তা প্রাণ-হাতে-নিয়ে-ফেরার মতো পরম দুঃসাহসের হলেও তার একটা দুর্নাম আছে।
কাজটা গুপ্তচরের। তবে লেভির একটা বিশেষত্ব এই যে, শুধু মোটা ইনামের প্রলোভনে যা সে অন্যায় মনে করে এমন কাজ সে কখনও জেনেশুনে হাতে নেয়নি।
বাইরে ফ্রান্সের একটা ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিতে সেলসম্যানের তোল নিয়ে সে বহুকাল থেকেই তুরস্কেই তার গুপ্তচরবৃত্তি চালিয়ে যাচ্ছে।
এস-এস-পি-এস তার সম্বন্ধে খোঁজ খবর নিয়ে গোপনে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তেলের বাদশাদের একচেটিয়া মালিকানার জুলুম ব্যর্থ করে পৃথিবীর সব মানুষের জন্য এনার্জির অন্য উৎস আবিষ্কারই এদের মহৎ উদ্দেশ্য জেনে লেভি এদের হয়ে কাজ করতে রাজি হয়। তেলের বাদশা-মালিকরাই তাদের আসল শত্রু বলে বুঝিয়ে, তাদের গোপন চক্রান্তের অন্ধিসন্ধি জানবার জন্যই লেভিকে যেন লাগানো হয়।
কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই লেভি এস-এস-পি-এস-এর আসল স্বরূপ জানতে পারে।
কী সে স্বরূপ? এই পর্যন্ত শুনেই লেভিকে প্রশ্ন করেছি। তা তুমি এখনও জানো না? লেভি একটু রুক্ষ স্বরেই আমায় জিজ্ঞাসা করেছিল।
একটু হেসে বলেছিলাম, জানি যে, তারা সমস্ত পৃথিবীকে নতুন এক মহাজনি সাম্রাজ্যের ক্রীতদাস করে রাখতে চায়। তুমি এর চেয়ে বেশি কিছু জানো কি না তাই শুনতে চাচ্ছি।
হ্যাঁ, বেশি কিছুই জানি, জ্বলন্ত স্বরে বলেছে লেভি, একটা নামই প্রথম বলছি, ই-ইউ-ডব্লিউ-সি। শুনেছ কখনও এ নাম?
হ্যাঁ, শুনেছি, এবার একটু নরম গলাতেই বলেছি, ও নাম হল, এনার্জি আনলিমিটেড ওয়ার্লড কার্টেল। ওই নামটুকুর বেশি আর কিছুই জানি না সে কথা অবশ্য স্বীকার করছি।
