ভেতরেই অফুরন্ত শক্তির উৎস সন্ধানের চেষ্টা হচ্ছে।
নানা দেশের রাজশক্তির সরকারি সাহায্য আর উৎসাহ এ-সব চেষ্টার পেছনে অল্পবিস্তর থাকলেও দুনিয়ার কুবেরমার্কা কারবারিরাই নিজেদের স্বার্থে জোট বেঁধে এ কাজ হাসিলের জন্য মুক্তহস্ত হয়েছে।
তেলের বদলি একটা কিছু সবদিক সামলানো সত্যিকার শক্তির উৎস বার করতে খরচায় টান যাতে কোনওমতেই না পড়ে, সেইজন্যই ইউরোপ-আমেরিকার কুবের কারবারিদের এমন করে জোট বাঁধা। সবচেয়ে বড় এ-জোটের নাম এস-এস-পি-এস।
এক দিক দিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বাঘা কারবারি-জোট হলেও এই এস-এস-পি-এস-এর কথা খুব কম লোকেই জানে।
মন্ত্রগুপ্তির ব্যবস্থা তাদের এত পাকা যে, তারা যে দুনিয়ায় নতুন জমানা আমদানি করার ব্যাপারে প্রায় বাজিমাত করতে চলেছে, এখবরটা ঘুণাক্ষরেও বড় বড় দেশের গোয়েন্দা দপ্তরেও পৌঁছয়নি।
মঁসিয়ে লেভির মুখে এনামটা শুনে তাই সেদিন সত্যি চমকে উঠেছিলাম।
প্যারিসের বেশ একটা গরিব পাড়ার নেহাত সস্তা একটা হোটেলের একেবারে টঙের একটা অখদ্যে ঘর নিয়ে তখন থাকি। হোটেলটার এমন অবস্থা যে, নীচের লবির কাউন্টার থেকে বোর্ডারদের কামরায় ফোনের ব্যবস্থাও নেই। বোর্ডারদের কাউকে কোনও খবর দেবার দরকার হলে নীচের জ্যানিটরকেই সেটা দিতে আসতে হয়।
আমার কামরা চারতলার টঙে। সবচেয়ে সস্তা বলে এই গ্যারেট-ঘরটাই নিয়েছি। চার-চারটে তলার সিঁড়ি ভেঙে এসে হোটেলের বুড়ো জ্যানিটর হাঁফাতে হাঁফাতে যে-খবরটা আমায় দিলে, তাতে আমি প্রথমটা বেশ একটু অস্বস্তিই বোধ করলাম।
জ্যানিটর খবর এনেছে যে, কে একজন হোটেলে এসে আমার সঙ্গে দেখা করতে চাইছে।
আমার সঙ্গে দেখা করতে চাইছে এ-হোটেলে! মনে মনেই কথাটা আউড়ে আমি বেশ ভাবনায় পড়লাম।
আমার সঙ্গে এ হোটেলে কারওর দেখা করতে আসা তা স্বাভাবিক ব্যাপার নয়। নিজেকে একটু গোপনে রাখব বলেই খুঁজে পেতে প্যারিসের সেইন নদীর বাঁ পাড়ের এমন একটা অখাদ্য হোটেলে আমি উঠেছি। নিজের সঠিক নামটাও এখানকার রেজিষ্ট্রি খাতায় লিখিনি। পাছে চেনা লোকের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়, তাই রাত্রের অন্ধকারে ছাড়া হোটেল থেকে আমি কখনও বার হই না। তা সত্ত্বেও এখানে আমার খোঁজ করে দেখা করতে যদি কেউ আসে, তা হলে সেটা তো বেশ সন্দেহজনক ব্যাপার।
মনের তোলাপাড়াগুলো অবশ্য বাইরে বুঝতে না-দিয়ে একটু বিরক্তির সুরেই বলেছি, কে আবার এল দেখা করতে। যে এসেছে তাকে ওপরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়নি কেন?
পাঠাব কী করে? জ্যানিটর বুড়ো আমার চেয়েও তিরিক্ষি মেজাজে বলেছে, তার কী এতখানি সিঁড়ি ভাঙবার ক্ষমতা আছে! নীচে এসে যেরকম ধুকছে, তাতে আমাদের হোটেল থেকেই না অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে হয়।
একটু থেমে নীচে যাবার সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়ে বুড়ো জ্যানিটর তারপর যেতে যেতে বলেছে, আমার খবর দেবার দিলাম। তোমার যা করবার করো।
মনে মনে তখন বুঝেছি, নীচে যে-ই এসে থাক, তার সঙ্গে দেখা করতে না-গিয়ে আমার উপায় নেই। জ্যানিটর বুড়ো চলে যাবার পর প্রায় তার পিছু পিছুই তাই সিঁড়ি দিয়ে নেমেছি নীচের লবিতে। যেমন হোটেল তেমনই তার লবি। বসবার চেয়ার সোফাটোফাগুলি ভাঙাচোরা, ভেঁড়া-খোঁড়া, কাউন্টারের কাঠের তক্তার পালিশ-টালিশ কবে উঠে গিয়ে একটা উইয়ে-খাওয়া চেহারা। সমস্ত হোটেলটাই যেন কোনও পুরনো রদ্দি মালের নিলেমের হাট থেকে কিনে এনে বসানো হয়েছে।
হোটেল যেমনই হোক, তার কাউন্টারের ক্লার্ক কিন্তু চটপটে, মোটামুটি ফিটফাট এক ফাজিল ছোকরা। আমি সিঁড়ি দিয়ে নেমে লবিতে কাউকে দেখতে না-পেয়ে কাউন্টারের দিকে খোঁজ করতে যেতেই ঠাট্টা করে বললে, আপনার সঙ্গে স্বয়ং মিথুজেলা দেখা করতে এসেছেন।
রসিকতাটা গ্রাহ্য না করে জিজ্ঞাসা করলাম, কোথায় তিনি!
ফাজিল ছোকরা রসিকতার সুরেই বললে, খোদ মিথুজেলা তো! সিঁড়ি ভেঙে ওপরে যাবার ক্ষমতা নেই, আবার লবিতেও সকলের সামনে বসে থাকতে চান না। একটু নিরিবিলিতে অপেক্ষা করতে চাইলেন বলে সিঁড়ির নীচের কোণে জ্যানিটরের জায়গায় বসিয়ে দিয়েছি। যা অবস্থা! দেখুন এতক্ষণ টিকে আছেন কিনা।
ছোকরার শেষ রসিকতাটা মুখ থেকে বার হবার আগেই সিঁড়ির পেছনের কোণে। জ্যানিটরের বসবার জায়গায় একটু ব্যস্ত হয়েই ছুটে যাবার ইচ্ছে হলেও সে-ইচ্ছেটা চেপে বেশ বিরক্তির সঙ্গেই বললাম, মিথুজেলাই হোক আর যেই হোক, আমার খোঁজে এসেছে বলছ কী করে? নাম বলেছে আমার?
এবার ক্লার্ক ছোকরা একটু ঘাবড়ে গেল। তারপর একটু সামলে কৈফিয়তস্বরূপ জানালে, না, নাম আপনার বলেননি। তবে কাউন্টারে এসে আপনার চেহারা পোশাকের বর্ণনা দিয়ে খোঁজ করাতে আমি ভাবলাম–
তোমার শুধু চুল ছাঁটাবার মাথা। ভাববার জন্য নয়, বলে ফাজিল ছোকরাকে বেশ একটু হতভম্ব করে সিঁড়ির পেছনের কোণে গিয়ে কিন্তু সত্যি অবাক আর স্তম্ভিত হয়ে গেলাম।
সেখানে জ্যানিটরের চেয়ারটায় প্রায় যেন ভেঙে পড়া অবস্থায় যে মানুষটা বসে আছে তাকে চিনতে পারিনি এমন নয়। একমুখ দাড়ি গোঁফ সমেত চেহারায় অমন অবিশ্বাস্য পরিবর্তন সত্ত্বেও সে যে মঁসিয়ে লেভি ছাড়া আর কেউ নয় তা বুঝতে আমার কয়েক সেকেন্ড মাত্র লেগেছে।
কিন্তু মঁসিয়ে লেভি এমন অবস্থায় আমার কাছে কেন? আমার খোঁজই বা সে পেল কী করে! আর আমার এখন তার বিষয়ে কী করা উচিত? এই কটা প্রশ্ন মনের ভেতর ওঠবার মধ্যেই লেভি কোনওরকমে ঘাড়টা তুলে আমার দিকে তাকাল। তার সেই ক্লান্ত কোটরে-বসা-চোখের চাউনি যেন মড়ার চোখের দৃষ্টি।
