আমাদের ভঙ্গিগুলো মিলিটারি হলেও আওয়াজ তখনও খুব নরম। বললাম, এখন উঠছেন কী? ছুটির দিনে বারোটা আবার বেলা! রামভুজ এখনও চিতল মাছের ধোঁকা চড়ায়ওনি বোধহয়। বলুন, বলুন। পল্টুবাবুর গাড়িতে না-চড়লে যে ট্রাফিক জ্যামে পড়তেন না, সেই ট্রাফিক জ্যামে পাশের বন্ধ মোটর থেকে চমকে দেওয়ার মতো কী শুনলেন সেইটা বলুন।
সেইটে শুনতে চাও?ঘনাদা একটু অনুকম্পার হাসি হেসেই বললেন, কিন্তু তা শুনলে তো বুঝতে পারবে না!
বুঝতে পারব না! আমরা একটু অপমানিত— কেন? কোন দেশের ভাষা?
ভাষা ইউরোপেরই! ঘনাদা ব্যাখ্যা করলেন, তবে ইউরোপেরও খুব কম লোকই এ-ভাষায় কথা কয় বা জানে। ভাষাটা হল বাক। স্পেনের উত্তর পশ্চিমের একটা ছোট অঞ্চলের এ ভাষা—
থাক থাক, ওতেই হবে, ঘনাদাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, ভাষাটা আপনার তো জানা। আপনি কী শুনে কী বুঝলেন তা-ই বলুন।
আমি যা শুনলাম, আর যা বুঝলাম, তাও তো তোমাদের কাছে ধাঁধা। ঘনাদা তাঁর কথায় বাধা দেবার শোধ তুলে বললেন, কথা যা শুনলাম তা এনজেল নিয়ে। এনজেল মানে বোঝো কি?
বুঝব না কেন? আমরা তাচ্ছিল্যভরে বললাম, এনজেল মানে দেবদূত, তা কে জানে!
না, এ সে-এনজেল নয়। ঘনাদা বুঝিয়ে দিলেন, এ হল আকাশে প্লেন কি রকেটের ওড়ার উচ্চতার মাপ। এক এনজেল প্রায় তিনশো পাঁচ মিটার। তবে শুধু এনজেল কি বাস্ক ভাষা শুনেই আমি চমকে উঠিনি। আমি বীতিমত স্তম্ভিত হয়ে গেছি গলার স্বরটায়। বাস্ক ভাষার সঙ্গে এ গলা তো দুনিয়ার একটি মাত্র লোককেই নির্ভুলভাবে চিনিয়ে দেয়। ট্রাফিক জ্যাম কেটে গিয়ে আবার গাড়িগুলো সচল হবার মধ্যে আরও ক-টা কথা শুনে আমি তখন নিশ্চিতভাবে বুঝেছি আমার পাশের জানলা-বন্ধ দামি বিদেশি সেডান গাড়িটার ভেতরে বোরোত্রা ছাড়া আর কেউ নেই। বোরোত্রা অবশ্য তার আসল নাম নয়। তারই দেশের অনেক আগেকার এক মস্ত টেনিস খেলোয়াড়ের ওই নামটা সে ছদ্মনাম হিসেবে ব্যবহার করে।
কিন্তু বোরোত্রা হঠাৎ দুনিয়ার সব জায়গা ছেড়ে কলকাতা হেন শহরের রাসবিহারী অ্যাভিনিউর মতো রাস্তায় কেন? বোরোত্ৰা মানেই তো চরম শয়তানি,
সর্বনাশা কিছু! এখানে সেরকম কী মতলবে সে এসেছে!
ট্রাফিক জ্যামটা কাটবার ঠিক আগের মুহূর্তে একটা উচ্চারণে ভয়ংকর রহস্যটার আসল খেই পেয়ে গেলাম। বন্ধ গাড়িটার ভেতর থেকে একটা নামই শুধু চকিতে কানে এল। দুব্যারি! তারপরই গাড়িটা বিদ্যুৎবেগে ছুটে বেরিয়ে গেল সামনে।
বিদেশি দামি গাড়ির যেমন পিক আপ তেমনই বেগ। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। পেছনে লেগে থাকা কি সোজা কথা! তবু বোরোত্রাকে চোখের আড়াল হতে দিলে আমার চলবে না। যেমন করে হোক তার পেছনে আঠার মতো লোগে থাকতে হবেই।
কলকাতার ঘিঞ্জি সব রাস্তার ভিড় আর যানবাহনের অব্যবস্থা আমার সহায় না হলে বোরোত্রার পেছনে লেগে থাকা আমার সম্ভব হত না। তার পেছনে কেউ লেগে আছে তা আন্দাজ করে অথবা নিজের স্বাভাবিক সাবধানতায় বোরোত্রা তার গাড়িটাকে কলকাতার ভেতরে উত্তর দক্ষিণ পুব পশ্চিম দিকে তখন যেন চরকি পাক খাওয়াচ্ছে। ড্রাইভারকে যেমন করে হোক তাকে চোখের আড়াল না-হতে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে আমি তখন কৌতূহল ভাবনা উদ্বেগে অস্থির হয়ে বসে আছি।
বোরোত্রার সঙ্গে প্রথম দেখার কথাটা তো ভোলবার নয়। বোরোত্রার সঙ্গে দেখা হওয়ার কারণটা হয়েছে অবশ্য সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে অন্য একজন। “..
মাত্র বছরখানেক আগে হঠাৎ নিজেদের তেলের খনিগুলোর মধ্যে সারা দুনিয়াকে খুশিমত ওঠবোস করাবার কী ক্ষমতা যে আছে, তা বুঝে আরব দেশগুলো পেট্রলের দাম একেবারে আকাশ-ছোঁয়া করে দিয়েছে। পৃথিবীর আমির-ওমরাহ দেশগুলোই তাতে একেবারে মাথায় হাত দিয়ে পথে বসে পড়েছে। দিনকাল বদলেছে। নইলে আরব দেশগুলোর মতো সামান্য ক্ষমতার কোনও রাজ্য আগেকার দিনে বেয়াদবি করলে গ্রেট ব্রিটেন দেখতে-না-দেখতে তিনটে ম্যান অফ ওয়ার পারস্য উপসাগরে পাঠিয়ে সব ঠাণ্ডা করে দিত। এখনও বড় বড় শক্তিগুলোর একটা ছুতো করে পায়ে-পা-লাগিয়ে ঝগড়া বাধিয়ে দুটো এয়ারক্র্যাফট কেরিয়ার অকুস্থলে রওনা করিয়ে দিয়ে, গোটা পাঁচেক বড় বম্বার সেখানকার আকাশে কবার একটু ঘুরিয়ে বেয়াড়াদের সিধে করে দিতে কি ইচ্ছে করে না? কিন্তু মুশকিল হয়েছে এই যে, সেদিন আর নেই। এক দলের এয়ারক্র্যাফট কেরিয়ার সেখানে দেখা দিতে-না-দিতেই আর-এক নিশান-ওড়ানো কেরিয়ারকে কাছাকাছি টহল দিতে দেখা যাবে নিশ্চয়। একজনের বোমারু বিমান কিছু বাড়াবাড়ি করলে আর-একজনের অ্যান্টি এয়ারক্র্যাফট কামান এখান-সেখান থেকে হঠাৎ হয়তো উঁকি দিতে শুরু করবে।
ও সব পুরনো চাল ছেড়ে মার খাওয়া পালের গোদাগুলো তাই তখন মুশকিল আসানের ভিন্ন উপায় খুঁজছে। – সব বড় বড় দেশগুলোয় তখন অমন গণ্ডা গণ্ডা লুকোনো আর দেখানো
সংকট-মোচনের রাস্তা বার করবার ঘাঁটি।
ন্যু-ইয়র্ক, লন্ডন, প্যারিস, বন, মাদ্রিদ, অসলো, স্টকহোলম তো বটেই, লিমা, ব্রাসিলিয়া, বুয়েনস এয়ারসে পর্যন্ত কোটি কোটি টাকা অকাতরে খরচ করে দুনিয়ার সব বাঘা বাঘা ওই লাইনের বৈজ্ঞানিকদের জড়ো করা হয়েছে তেলের বদলি এনার্জি জোগাবার নতুন কিছু আবিষ্কারের জন্য।
নদীর স্রোতের তোেড়, হাওয়ার বেগ, সমুদ্রের ঢেউয়ের নিত্য ঝাঁপিয়ে আসা আর ফিরে যাওয়া থেকে সূর্যের তাপ আর পরমাণু বিস্ফোরণ পর্যন্ত অনেক কিছুর
