ঘনাদা কি ভেবেছেন, এই বুজরুকি দিয়েই আজ আমাদের কাত করে দিয়ে যাবেন? আজ আর সেটি হচ্ছে না। নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি করে নিয়ে
অবরোধটা একটু নরম করেই শুরু করলাম।
বললাম, এই চিরকুটটা পল্টুবাবুকে রেখে দিতে বলছেন যত্ন করে? এতে তাঁর আট-ন গ্যালনের শোক তিনি ভুলতে পারবেন? তাঁর সব লোকসান পুষিয়ে যাবে?
তা যাবে বইকী! ঘনাদা যেন আমাদের সরল বিশ্বাসের অভাবে বেশ ক্ষগ্ন হয়ে বললেন, অনেক অনেক গুণ যাতে পুষিয়ে যায়, সেইমতই লিখে দিয়েছি।
আপনার অশেষ দয়া! আমাদের গলায় এবার স্টেনলেস স্টিল ব্লেডের ধার, তা পল্টুবাবুর সব লোকসান ওই চিরকুটেই পুষিয়ে যাবে কেমন করে, তা একটু জানতে পারি? হিজিবিজি কী সাপের মন্তর লিখেছেন ওই চিরকুটে?
সাপের মন্তরও নয়, হিজিবিজিও না! ঘনাদা যেন ধৈর্যের অবতার হয়ে উঠেছেন হঠাৎ, লেখাগুলো পড়তে পারোনি বুঝি?
না, পেরেছি! অসাধ্যসাধনের গর্ব নিয়েই বললাম, অক্ষরগুলো ইংরেজিতেই লিখতে চেয়েছিলেন মনে হচ্ছে! কিন্তু মানে কী ওই ই-ইউ-ডব্লিউ-সি আর এম-বি-ডি-ও-ই-র? ও কোথাকার হিং-টিং-ছট?
হিং-টিং-ছট নয়, শুধু ক-টা আদ্যক্ষর, গভীর সহানুভূতি দেখালেন ঘনাদা, তবে তোমাদের কাছে অক্ষরগুলো ধাঁধার মতোই লাগবার কথা। ওই ই-ইউ-ডব্লিউ-সি-র মানে এনার্জি আনলিমিটেড ওয়ার্লড কার্টেল। অর্থাৎ অফুরন্ত শক্তির বিশ্বসঙ্ঘ। এ নামটা নতুন সাজানো। তবে এম-বি-ডি-ও-ই শক্তি বিজ্ঞানীদের মহলে পুরনো আধুলির মতো সর্বত্র চালু। অক্ষরগুলোর জট ছাড়ালে কথাটা দাঁড়ায়, মিলিয়ন ব্যারেলস ডেইলি অফ অয়েল ইকুইভ্যালেন্ট। মানে, প্রতিদিন দশ লক্ষ পিপে তেল বা তারই সমান কাজ দেবার মতো যে-কোনও বদলি বস্তুর জোগান!
কী বললেন? আমাদের গলাগুলো একটু ধরাধরা। প্রতিদিন দশ লক্ষ পিপে তেল বা তার বদলি কিছু জোগান দেওয়া! এই এত জোগান দিচ্ছে কে?
দিচ্ছি আমরাই, ঘনাদা দুঃখের সঙ্গে জানালেন, উনিশশো তিয়াত্তরে আরবরা তেলের দাম আকাশে তুলে দিয়েছে। হাহাকার পড়ে গেছে চারদিকে, তা সত্ত্বেও রুশ দেশ ছাড়াই বাকি দুনিয়া দিনে একাশিরও বেশি এম-বি-ডি-ও-ই খরচ করছে। ওদের পণ্ডিতরা বলছে, বছর কুড়ি বাদে ওই একাশি দুশোয় পৌঁছবে।
কাজটা ওদের খুব অন্যায় তো তা হলে? আমরা সবিনয়ে জিজ্ঞাসা করলাম।
তেলের দিক দিয়ে ওদের যা ভাঁড়ে মা ভবানী অবস্থা, তাতে অন্যায় বইকী। বলে সায় দিলেন ঘনাদা।
আর সেই মওকাতেই তাঁকে চেপে ধরলাম। তাঁরই চিরকুটটা তাঁর দিকে এগিয়ে। দিয়ে বললাম, কিন্তু এটা আপনি কী লিখে দিয়েছেন পল্টুবাবুকে? এটা তো তেলের হ্যান্ডনোট বলেই মনে হচ্ছে। পল্টুবাবুকে এক বছর প্রতিদিন পাঁচ এম-বি-ডি-ও-ই দেওয়া হবে, সেইরকমই কি এতে লেখা না? না আমাদের ভুলই হয়েছে পড়তে?
এবার ঘনাদাকে যে মোক্ষম প্যাঁচে ফেলেছি তাতে নির্ঘাত কুপোকাত! তাঁর নিজের হাতে সদ্য লিখে দেওয়া চিরকুট! এ ফাঁদ থেকে বার হবেন কী করে? নিজের হাতের লেখা আর মুখের ব্যাখ্যা হটজলদি বদলে দেবার চেষ্টা করবেন? তা হলে ফাঁস টানব আরও জম্পেশ করে? অবস্থাটা কত বেগতিক, তা বুঝেই বোধহয় ঘনাদা সেদিক দিয়েই গেলেন না। চিরকুটের লেখাটার মানে বদলে দেবার চেষ্টা না করে একেবারে উলটো সুর ধরলেন।
আমাদের সন্দেহেই যেন অবাক হয়ে বললেন, পড়তে ভুল হবে কেন? ঠিকই পড়েছ। আর তেলের হ্যান্ডনোট ধরে নিয়ে ও চিরকুটের কড়ারের বহর দেখে যদি অবাক হয়ে থাকে, তা হলে জেনে রাখো যে, ও হ্যান্ডনোট জেনেশুনে বুঝেসুঝেই লিখেছি। সত্যি কথা বলতে গেলে পল্টুবাবুর ঋণ ওতেও পুরো শোধ হবে না।
তাই নাকি! আমরা গলার সুরটা যথাসম্ভব সরল রেখেই বললাম, ওই আট-ন গ্যালনের ঋণ?
হ্যাঁ, ওই আইন গ্যালন! ঘনাদা একেবারে গদগদ হলেন, ওই আট-ন গ্যালন আর পল্টুবাবুর গাড়িটা না থাকলে ই-ইউ-ডব্লিউ-সি নামটাই হয়তো পৃথিবীতে অজানা থেকে যেত। তার জায়গায় এস-এস-পি-এস-এর মালিকদেরই আমরা গোলামি করতাম সারা দুনিয়ায়। এত বড় উপকারের জন্যে দিনে পাঁচ এম-বি-ডি-ও-ই লিখে দেওয়া কি বেশি কিছু হয়েছে?
এস-এস-পি-এস, এম-বি-ডি-ও-ই, ই-ইউ-ডব্লিউ-সি। তার মানে বেড়াজাল কেটে বেরোবার রাস্তা না পেয়ে ঘনাদা ওই সব আবোলতাবোল প্রলাপ বকে আমাদের মাথায় ঘোর লাগাবার চেষ্টা করছেন। উঁহুঁ, সেটি আর হচ্ছে না।
বললাম, বেশ কাজের মতো কাজই করেছেন। কিন্তু এত যে সব ভেল্কিবাজি হয়ে গেল, সবই তো সাতসকালে পল্টুবাবুর আটন গ্যালন তেল ভরে আনা গাড়িটির জন্যে। সেটি আজ আপনার হাতে না পড়লে দুনিয়ার মস্ত লোকসান হয়ে যেত তা হলে?
হ্যাঁ, হত। ঘনাদা এতক্ষণের মধুর ভাব ছেড়ে হঠাৎ যেন গর্জন করে উঠলেন, ও গাড়িতে চড়ে না বেরুলে গড়িয়াহাটের মোড়ের ওই বিশ্রী ট্রাফিক জ্যামে পড়তাম না। সেই ট্রাফিক জ্যামে না পড়লে পাশের জানলা-ভোলা একটা বিদেশি সেভান-এর ভেতর থেকে ক-টা কথা কানে গিয়ে চমকে উঠতাম না। তারপর সেই গাড়ির পেছনে ধাওয়া করে অর্ধেক কলকাতা ঘুরে শেষ পর্যন্ত এয়ারপোর্ট হোটেলে গিয়ে আসল পালের গোদার দেখা পেতাম না। আর তার দেখা তখন না পেলে এতক্ষণে ব্যাংককের পথে মালয়ের ওপর একটা অপ্রত্যাশিত বিমান দুর্ঘটনার খবর নিশ্চয়ই বেতারে ছড়িয়ে পড়ত। যাক, এর বেশি আর কিছু বলার নেই এখন। বারোটা বেজে গেছে। এখন ওঠাই ভাল।
০৪. ঘনাদা কেদারা ছেড়ে ওঠার উপক্রম করলেন
ঘনাদা কেদারা ছেড়ে ওঠার উপক্রম করলেন। কিন্তু তার আগেই বাইরের দরজা আগলে আমরা জবরদস্ত ভাবে খাড়া।
