সেখানে ঢুকেও অবশ্য নিস্তার পাননি। এ-বিবরণ যা দিয়ে শুরু করেছি সেই সব বাক্যবাণ তাঁর ওপর তখন নির্মমভাবে ছোড়া হয়েছে। একজন থামতে-না-থামতে
আর-একজন শুরু করে। এক মুহূর্তের সামলাবার ফাঁক তাঁকে দেওয়া হয়নি।
শিশির কয়লার আসন্ন চরম দুর্ভিক্ষের বিভীষিকার কথাটা শুনিয়ে দেবার পরেই গৌর একেবারে সর্বনাশা ছবিটা অঙ্কের হিসেবে এঁকে দিয়েছে। এ সব হিসেবে সে এমনিতেই একটু পাকা। তার ওপর ঘনাদার জন্য সারা সকাল অপেক্ষা করায় অধৈর্য আর যন্ত্রণার মধ্যে নানা কাগজপত্র এই জন্যই সে হাঁটকাচ্ছিল নিশ্চয়।
আপনি যা করেছেন,গলা থেকে যেন আগুনের হলকা বার করে গৌর বলেছে, তা আজকের দিনে রীতিমত একটা সামাজিক অপরাধ, তা জানেন! মরুভূমির যাত্রী হয়ে খুশির খেয়ালে তেষ্টার জল নষ্ট করা যা, এও তা-ই।
গৌরের আক্রমণের তোড়ের সামনে দাঁড়াতে না-পেরে ঘনাদা তাঁর অত সম্মানের আর শখের কেদারায় এবার যেন অসহায়ভাবে বসে পড়েছেন।
গৌর তাতে থামেনি। নির্মমভাবে বলে গিয়েছে, দুনিয়ার সত্যিকার অবস্থাটা কী, তা আপনার জানা আছে? তেল আর মাত্র পাঁচশো পঁয়তাল্লিশ বিলিয়ন ব্যারেল, আর মাত্র ছশো বিলিয়ন টন কয়লা পৃথিবীর এখন সম্বল!
হ্যাঁ, বেশ একটু অপরাধীর মতো স্বীকার করেছেন ঘনাদা, তেল তো আছে। মাত্র তিন হাজার সাতশো চল্লিশ বি-টি-ইউ! এম-বি-ডি-ও-ই যা বাড়ছে, বছর দশেকের মধ্যেই তা দুশো ছাড়িয়ে যাবে!
বি-টি-ইউ! এম-বি-ডি-ও-ই! এ সব কী বলছেন ঘনাদা! অন্য সময় হলে এরকম দুটো বুকনিতেই বেশ কাত হয়ে পড়তাম সবাই। কিন্তু আজ মেজাজ যে পর্দায় বাঁধা, তাতে এ সব ভড়কিতে আর আমরা তোলবার পাত্র নই।
তাই, গলাটা আরও কড়া করে, প্রায় ধমক দিয়েই উঠলাম, রাখুন আপনার ওসব গুল-টুল!
তারপর পল্টুবাবুকে দেখিয়ে বললাম, দুনিয়ার হিসেব ছেড়ে দিয়ে এই ভদ্রলোকের কথা একটু ভেবে দেখেছেন? ভদ্রলোক নিজে থেকে খাতির করে আপনাকে তাঁর গাড়িটা চড়তে দিলেন। ভদ্রলোকের নিজের গাড়ি নয়, তাঁর কোম্পানির খরিদ্দারদের দেখাবার জন্য তিনি সেটা এখানে-সেখানে নিয়ে যান! সেই গাড়ি তাঁর পিসতুতো ভাই শিবুকে আর সেই সঙ্গে আমাদের একটু দেখাবার আর চড়াবার জন্য তিনি তেলের এই আকালের দিনে ট্যাঙ্ক-ভর্তি করে এনেছিলেন। আপনার অনুরোধে দু-পা যাবার জন্য আপনাকে সে-গাড়ি উনি একটু চড়তে দিয়েছিলেন মাত্র। আপনি-আপনি সেই গাড়ি নিজের খুশি মতো পুরো পাঁচ ঘণ্টা কোথায় না কোথায় চালিয়ে সমস্ত তেল খরচ করে শেষে রাস্তার লোক দিয়ে ঠেলিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে এলেন! ভদ্রলোকের ওপর কী অন্যায় যে করছেন, সে কথা একবার মনে হল না!
প্রসিকিউশনটা ভালই করেছি নিশ্চয়। অন্যেরা একটু উসখুস করলেও ঘনাদা সারাক্ষণ একেবারে চুপ। আমরা কথা শেষ হবার পর বেশ একটু যেন শুকনো গলাতেই বললেন, না, পল্টুবাবুর ওপর খুবই অন্যায় অত্যাচার হয়েছে, ট্যাঙ্কে গ্যালন কুড়ি তেল ছিল নিশ্চয়!
না, না, কুড়ি নয়, পল্টুবাবু বিনীতভাবে জানালেন, আটন গ্যালনের বেশি নয়।
ও একই কথা! ঘনাদা নিজের অপরাধের গ্লানিতেই বোধহয় উদার না হয়ে পারলেন না, আটন গ্যালন তো আর কম তেল নয়, বিশেষ আজকের বাজারে। এ-লোকসান আপনার হবে কেন? দাঁড়ান, দাঁড়ান।
আমরা এবার বেশ একটু হতভম্ব।
ঘনাদা বলছেন কী? আর জামার এ-পকেট ও-পকেট হাতড়ে খুঁজছেনই বা কী? ভাবখানা তো পকেট থেকে বার করে তখুনি যেন নগদানগদি পল্টুবাবুর তেলের দামটা দিয়ে ফেলে সব ঝামেলা চুকিয়ে দেবার মতো। কিন্তু পকেটে ওঁর বকেয়া সেলাই ছাড়া আর কিছু কখনও থাকে না। আজ তা হলে এত খোঁজাখুঁজি কীসের?
খোঁজাখুঁজিতে কিছু অবশ্য পাওয়া গেল না। ঘনাদা কিন্তু তাতে যেন বেশ একটু বিস্মিত হয়ে বললেন, না, কোথায় যে ফেললাম! তেল ফুরিয়ে যাবার ওই ঝামেলার মধ্যেই কোথায় পড়ে গেছে বোধহয়! এখন একটা সাদা কাগজ দিতে পারো?
হাসব, না জ্বলে উঠব, তখন আমরা বুঝতে পারছি না। কাগজ খুঁজে নিয়ে ঘনাদার হাতে দেবার মতো অবস্থা সুতরাং আমাদের তখন নয়। তবে আমাদের আগেই পল্টুবাবু তাঁর পকেট থেকে নোটবই বার করে তার একটা পাতা ছিঁড়ে ঘনাদাকে এগিয়ে দিলেন।
ততক্ষণে আমাদের মুখে কথা ফুটল, কী খুঁজছিলেন আপনি, ঘনাদা? কী হারিয়েছে? টাকা?
না, না, টাকা নয়! ঘনাদা যেন টাকার কথায় অপমান বোধ করে বললেন, হারিয়েছে দুব্যারির সই করা ছাপা কাগজের ছোট একটা খাতা। যাক, এতেই হবে।
ঘনাদা কলমটাও পল্টুবাবুর কাছে ধার নিয়ে খসখস করে কী লিখে কাগজটা আর কলমটা পল্টুবাবুকে ফিরিয়ে দিয়ে একটু স্নেহের হাসি টেনে বললেন, যত্ন করে রেখে দেবেন?
যত্ন করে রেখে দেওয়ার মতো কাগজের চিরকুটটা এবার হুমড়ি খেয়ে পড়ে পল্টুবাবুর হাত থেকে টেনে নিয়ে দেখতেই হল।
দেখে সত্যিই মাথায় চরকিপাক!
কাগজটার ওপরের ক-টা অক্ষরের নীচে ঘনাদার একটা সই। ঘনাদার সইটাকে বোঝা মহেঞ্জোদরোলিপির পাঠোদ্ধারের চেয়ে শক্ত হতে পারে, কিন্তু তার ওপর তাঁর অদ্বিতীয় হস্তাক্ষরে এসব তিনি কী লিখেছেন? লেখাগুলোর ছিরি যাই হোক সেগুলো পড়া যায়।
ঘনাদা ওপরে বড় বড় অক্ষরে ইংরেজিতে ই-ইউ-ডব্লিউ-সি লিখে তার নীচে লিখেছেন পাঁচ এম-বি-ডি-ও-ই এক বছর।
এম-বি-ডি-ও-ই শব্দটা তাঁর মুখে খানিক আগেই শুনেছি, ই-ইউ-ডব্লিউ-সি-টা নতুন। কিন্তু কী মানে এই হিং-টিং-ছটের?
