বলেন কী ঘনাদা! এমন একটা গাড়ির সুবিধের দিনে আমাদের ফেলে একলাই আগে কোথায় যেতে চান। কিন্তু হাঁ হাঁ করে উঠে বাধা দেওয়া আর হল না।
নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই। যান না, আমাদের সকলের আগে পল্টুবাবুই ব্যস্ত হয়ে ড্রাইভারকে হুকুম দিলেন, ড্রাইভারজি, লে যাইয়ে সাবকো যাঁহা যানে চাহতে হেঁ।
ড্রাইভারজি মোটরের দরজা খুলে দিলেন। ঘনাদা গাড়িতে উঠে বসলেন। ড্রাইভারজি তাঁর আসনে বসে দুবার হর্ন বাজিয়ে আমাদের বনমালি নস্কর লেন থেকে বেরিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
০২. সমস্ত ব্যাপারটা আমাদের চোখের ওপর
সমস্ত ব্যাপারটা আমাদের চোখের ওপর যখন ঘটল, তখন প্রায় কাঁটায় কাঁটায় সকাল সাতটা।
গাড়ি চলে যাবার পর পল্টুবাবুকে নিয়ে আমাদের একটু ওপরে গিয়ে অপেক্ষা
করা ছাড়া আর কী করবার আছে।
ঘনাদা বলেছেন, তাঁকে দু-পা মাত্র পৌঁছে দিতে হবে। তা দু-পা মাত্র যেতে আসতে আর কতক্ষণ!
কিন্তু সাতটা বেজে সাড়ে সাতটা হল। সাড়ে সাতটা থেকে ঘড়ির কাঁটা পৌঁছল আটটায়। আটটার পর ন-টা বাজল। বাজল দশটা।
তবু ঘনাদাকে যথাস্থানে রেখে পল্টুবাবুর গাড়ি ফেরত এল কই?
ততক্ষণে তিন-তিনবার চায়ের পালা আমাদের শেষ হয়ে গেছে। প্রথমে শুধু পাঁপর ভাজাই ছিল টাকনা, তারপর সেটা পাড়ার দোকানের হিঙের কচুরি থেকে শেষে তেলেভাজা-বেগুনিতে গিয়ে উঠল, তবু গাড়ির দেখা নেই।
বেগুনি-ফুলুরি তখন আর মুখে রোচে! শিবুর মামাতো ভাই পল্টুবাবুর মুখের দিকে চেয়ে অন্তত নয়। কোনও লাভ নেই জেনেও ওপর থেকে নীচে আর বাহাত্তর নম্বর থেকে বেরিয়ে বনমালি নস্কর লেন ছাড়িয়ে বড় রাস্তা পর্যন্ত এমন বার দুই যাওয়া-আসা করলাম। পল্টুবাবুর গাড়ি তখনও নিপাত্তা।
দশটা ক্রমে ক্রমে এগারোটা হল। তারপর বারোটা! আরও বার দশেক ওপর-নীচ আর ঘর বার করে, গাড়িটার কোথাও কোনও অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে বলেই ধরে নিয়ে আমরা পাড়ার থানায় খোঁজ করতে যাব বলে নামতে যাচ্ছি, এমন সময়ে বনোয়ারি নীচে থেকে খবর দিলে, গাড়ি আওত বানি! অর্থাৎ গাড়ি আসছে।
সবাই মিলে এর পরে হুড়মুড় করে নীচে নেমে বাইরে গিয়ে দাঁড়ালাম।
বনোয়ারির খবর ভুল নয়। গাড়ি মানে পল্টুবাবুর গাড়িই আসছে বটে, তবে সেটাকে ঠেলে নিয়ে আসছে রাস্তার ক-জন মজুর।
কী হয়েছে তা হলে? দারুণ কোনও দুর্ঘটনা? না। গাড়ি সম্পূর্ণ অক্ষত। তা থেকে প্রথমে যিনি নামলেন, সেই ঘনাদাও সম্পূর্ণ তা-ই।
নেমে এসে বাহাত্তর নম্বরের দেউড়িতে ঢোকবার আগে আমাদের দিকে চেয়ে ঈষৎ যেন দুঃখের সঙ্গে বললেন, একটু দেরি হয়ে গেল, না?
একটু দেরি হয়ে গেল! সাতটায় দু-পা পৌঁছে দেবার জন্য গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে বেলা বারোটার পরে ফিরে ঘনাদা বলছেন কিনা, একটু দেরি হয়ে গেল!
বিহ্বল, হতভম্ব তো হয়েই ছিলাম, তার ওপর ঘনাদার এই আত্মধিক্কারের আতিশয্যে অভিভূত হয়ে সবাই যেন বোবা হয়ে গেলাম।
কথা ঘনাদাই আবার বললেন। যেন হঠাৎ তুচ্ছ একটা কথা মনে পড়ায় আমাদের জানিয়ে দিয়ে বললেন, হ্যাঁ, ওই গাড়ি যারা ঠেলে এনেছে, তাদের মজুরির সঙ্গে কিছু কিছু বকশিশও দিয়ে দিয়ো। কমখানি তো নয়, প্রায় মাইল দুয়েক ঠেলে আনছে।
প্রায় মাইল দুয়েক ঠেলে আনছে! এবার একসঙ্গে হঠাৎ সলতে ধরে-ওঠা বোমার মতো আমরা ফেটে পড়লাম।
ঠেলে আনছে কেন? জিজ্ঞাসা করলে শিবু।
গাড়ির কি কোনও অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে কিছু? জানতে চাইলাম আমি।
ইঞ্জিন কি কলকবজা কিছু বিগড়েছে? কড়া গলায় জেরা করল গৌর।
না, না, কলকবজা বেগড়াবে কী! ঘনাদা যেন পল্টুবাবুর গাড়ির অপমানে ক্ষুণ্ণ হয়ে বললেন, দস্তুরমতো ভাল নিখুঁত নতুন গাড়ি।
তবে? শিশিরের মাত্র একটি শব্দের তীক্ষ্ণ প্রশ্ন।
তবে আর কী! ঘনাদা আমাদের বুদ্ধির স্থূলতাতেই যেন হতাশ হয়ে বললেন, গাড়িতে তেল ছিল না, তাই।
তেল ছিল না!
আর্তনাদটা এবার আমাদের নয়, পল্টুবাবুর গলা দিয়ে বার হল, আমি যে এখানে। আসবার আগে নিজে দাঁড়িয়ে ট্যাঙ্ক ভর্তি করে তেল এনেছি। ট্যাঙ্কে কোথাও কোনও ফুটো—
পল্টুবাবুকে কথার মাঝখানেই থামিয়ে ঘনাদা আশ্বাস দিয়ে বললেন, ট্যাঙ্ক ফুটো-টুটো কেন হবে! পুরো ট্যাঙ্ক-ভর্তি তেলই ছিল। সবটা অমন ফেরবার আগেই ফুরিয়ে যাবে সেইটে ঠিক বুঝতে পারিনি।
নীচের সিঁড়ি দিয়ে তখন আমরা দোতলার বারান্দায় এসে পৌঁছেছি। ঘনাদার সরল বিনীত স্বীকারোক্তিটুকুর পর কয়েক সেকেন্ড রীতিমত হতবাক হয়ে থাকবার পর নিজেদের আর সামলানো সম্ভব হল না।
তার মানে, শিশির প্রায় চিড়বিড়িয়ে উঠে বলে, ওই ট্যাঙ্ক-ভর্তি তেল সব আপনি খরচ করে এসেছেন?
এই আজকের দিনে তেলের জন্য যখন সারা দুনিয়ায় হাহাকার পড়ে গেছে!
এক ফোঁটা তেলের জন্য যখন দেশে দেশে গলাগলির বন্ধুত্ব গলাটেপাটেপিতে পৌঁছে যাচ্ছে।
আপনি কি জানেন না যে, তেলের দাম দিন দিন ঘণ্টায় ঘণ্টায় নয়, মিনিটে মিনিটে কীভাবে বাড়ছে! আর আজকের পৃথিবীতে তেলের বাদশা আরবেরা হঠাৎ তেলের বাজারের চাবিকাঠিটি নিজেদের হাতে নেবার পর সারা দুনিয়ার কীভাবে টনক নড়েছে!
হিসেব করতে বসে কেন সবাই মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছে জানেন? জানেন যে, আরবরা হাতের মুঠো খুলুক বা না খুলুক, দুনিয়ার ভবিষ্যৎ পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে আসতে আর দেরি নেই!
এই পর্যন্ত বলতে বলতেই টঙের ঘরের ন্যাড়া সিঁড়ির তলা পর্যন্ত আমরা পৌঁছে গিয়েছিলাম। আমাদের জবরদস্ত ঘেরাওয়ের ধরনে সিঁড়ির দিকটা আটকানো বলে ঘনাদাকে এবার আড্ডাঘরেই ঢুকতে হয়েছে।
