ওই উসকানিটুকু দিয়েই আমরা চুপ। ঘনাদার বাঁধানো দাঁতে মচমচে অমৃতি চিবানোর শব্দ ছাড়া ঘরে আর আওয়াজ নেই। যে খেইটা জুগিয়ে দেওয়া গেছে তা থেকে কী গুলগল্পর গালিচা ঘনাদা বুনে তোলেন তা দেখবার জন্য আমরা একেবারে উদগ্রীব।
কিন্তু ঘনাদা অমন করে শোধ নেবেন তা কি জানি! শোধ তাঁর মুখের খাবার সরিয়ে নিয়ে তাঁকে দাগা দেবার।
গালচের আশা একেবারে খঞ্চেপোশে কুঁকড়ে দিয়ে ঘনাদা যেন মর্স কোডে জানালেন, তাই!
তাই! কী তাই? আমরা যেমন হতাশ তেমনই অস্থির। পাণ্ডবদের জিৎ হত-ই বলতে চান?
হ্যাঁ। এবার ঘনাদার সংক্ষিপ্ত সরল জবাব।
দুর্যোধন যদি দলে টানতে গিয়ে ঘুমন্ত শ্রীকৃষ্ণের শিয়রে না বসে পায়ের দিকে বসত তবুও? আমরা শেষ আশায় যেটুকু সাধ্য চাগাড় দিলাম।
যদি কেন, পায়ের দিকেই তো বসেছিল দুর্যোধন! ঘনাদা এতক্ষণে বোমাটি ছাড়লেন।
পায়ের দিকেই বসেছিল দুর্যোধন? চোখগুলো যতটা পারি ছানাবড়া করে বললাম, কিন্তু মহাভারতের কোথাও তো নেই! পায়ের বদলে মাথার দিকেই দুর্যোধন বসেছিল বলে তো লেখা আছে।
লেখা আছে যা তাও ঠিক?
তাও ঠিক? ঘনাদার ধাঁধায় এবার একটু কাবু হয়েই জিজ্ঞাসা করলাম, পায়ের দিক মাথার দিক হয় কী করে?
হবার কারণ অতি সোজা! ঘনাদার মুখে যেন একটু অনুকম্পার হাসি, শ্রীকৃষ্ণ ঘুমের মধ্যে উলটে শুয়েছিলেন বলেই পায়ের দিকটা মাথার দিক হয়ে গিয়েছিল।
ঘুমের মধ্যে উলটে শুয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণ? এবার আর আমাদের অবাক হবার ভান করতে হল না।
হ্যাঁ, উলটে শুয়েছিলেন। ব্যাখ্যা করলেন ঘনাদা, দুর্যোধন বোকা যেমন নয়, তেমনই গড়িমসি আলসেমিও তার ধাতে নেই। অর্জুন রথে ঘোড়া জুতে রওনা হতে না হতেই দুর্যোধন শ্রীকৃষ্ণের শিবিরে এসে হাজির। বাসুদেব ঘুমোচ্ছেন শুনে সে শোবার ঘরেই গেল অপেক্ষা করতে। ঘরে ঢুকেই সে কিন্তু একটু ফাঁপরে পড়ল। ঘুমন্ত বাসুদেবের মাথার দিকে যেমন পায়ের দিকেও তেমনই একটি করে আসন পাতা। এখন কোথায় তার বসা উচিত। ভেবে-চিন্তে শেষ পর্যন্ত সে পায়ের দিকেই বসল।
শ্রীকৃষ্ণ এবার পড়লেন মুশকিলে। তাঁর তো কপট নিদ্রা। যা ভেবেছিলেন দুর্যোধন তার উলটোটা করেছে জেনে, আর কোনও উপায় না পেয়ে নিজেও তিনি ঘুমের মধ্যেই যেন স্বপ্নে উঠে পড়ার ভান করে উলটে শুলেন।
দুর্যোধন আহাম্মক নয়, কিন্তু অহংকারী। শ্রীকৃষ্ণকে ঘুমের মধ্যে উলটে শুতে দেখে তার দেমাকে একটু সুড়সুড়িই লাগল। ভাবল, বাসুদেবের ঘুমের মধ্যেও তার মতো রাজাগজাকে পায়ের দিকে রাখতে বাধছে। এই দম্ভেই হল তার মরণ। নইলে মাথা থেকে আবার পায়ে গিয়ে বসতে পারত না!
কিন্তু? আমরা সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করলাম, এসব কথা মহাভারত থেকে সরালে কে? সেই আপনার ভীমসেন দারুক আর বনবরা মার্কা মূষিক কোম্পানি?
না। ঘনাদা বনোয়ারির সদ্য এনে হাজির করা চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে একটু হাসলেন, এ বৃত্তান্ত সরাবার দরকার হয়নি, কারণ লেখাই হয়নি মহাভারতে।
লেখাই হয়নি! আমরা সত্যিই তাজ্জব—কেন?
কেন জানতে চাও? ঘনাদা শিশিরের ধরিয়ে দেওয়া সিগারেটে রামটান দিয়ে তার ধোঁয়ার সঙ্গেই চোখ বুজে যেন ধ্যানস্থ হয়ে গেলেন।
এ ধ্যান কি ভাঙবে?
আমরা গরুড়পক্ষী হয়ে তাঁর দিকে চেয়ে আছি।
ধ্যান শেষ পর্যন্ত ভাঙল আর চক্ষু উন্মীলন করে সামনের দেয়ালটার দিকে তাকিয়ে তিনি ত্রিকালদৃষ্টির যে নমুনা দেখালেন তাতে আমরা হাঁ।
কেন লেখা হয়নি তা, সামনের ফাঁকা দেয়ালটার দিকে সিগারেট ধরা আঙুল দুটোই উঁচিয়ে তিনি বললেন, ওই ওর তস্য তস্য আদি সপ্তশত সংঘ-ভ্রাতা হয়তো বলতে পারত!
মাথাগুলো তখন ঘুরতে শুরু করেছে। ঘোরার আর অপরাধ কী? সংঘ-ভ্রাতা, তস্য তস্য, আদি সপ্তশত—এ সব কী বলছেন ঘনাদা! আর বলছেন কিনা ওই সেদিনের চুনকাম করা সাদা দেয়ালটার দিকে তাকিয়ে!
ওখানে ও সব বলে সম্বোধন করছেন কাকে?
যাকে করছেন অনেক কষ্টে তাকে আবিষ্কার করা গেল এরপর। আবিষ্কার যা করলাম চক্ষু তাতে চড়কগাছ। ঘনাদার দিকে ফিরে হতভম্ব হয়েই তাই বলতে হল, ওখানে তো একটা শুধু সুড়সুড়ে পিঁপড়েই দেখছি!
হ্যাঁ, ওই। ঘনাদা ধ্যাননিমীলিত হয়েই বললেন।
হ্যাঁ, ওই! সুড়সুড়ে পিঁপড়ে। ওরই কী বললেন, তস্য তস্য সার্ধতিনসহস্র-আদি— –
হ্যাঁ, হ্যাঁ! ঘনাদা আমাদের থামিয়ে দিয়ে জ্ঞান দিলেন। ব্যাখ্যা করে বোঝালেন, কুরুক্ষেত্রের ভারতযুদ্ধের আগে-পরে যা যা হয়েছে দিব্যদৃষ্টিতে সবই ব্যাসদেবের জানা। তিনি রেখে ঢেকে কিছু বলবার মানুষ নন, আর যত ঝড়ের বেগেই বলুন, গণেশঠাকুরের শর্টহ্যান্ডে তা ধরা না পড়েই পারে না। তবু যে মহাভারত থেকে ওই মোক্ষম খবরটুকু বাদ পড়েছে, তার মূল হল ওই সুড়সুড়ে পিঁপড়ে। ও মানে, ওরই সাড়ে তিন হাজার বছর আগেকার তস্য তস্য কোনও বাসাতুতো ভাই। পরমায়ু ওদের চার থেকে সাত বছরের বেশি নয় বলে গড়পড়তা হিসেবে আদি সপ্তশত সংঘ-ভ্রাতা বলছি। কথায় কথায় বুকের মধ্যে যিনি বিশ্বরূপ দেখান, বিশ্বচরাচর যাঁর রেফারিগিরিতে চলে, সেই চতুর চূড়ামণি কৃষ্ণ তাঁর মান বাঁচাতে ওই সামান্য পিঁপড়েটিকেই বেছে নিয়েছিলেন। পিঁপড়ে তো নয়, ও আদি কীটাবতার, একাই পৃথিবীর প্রথম পঞ্চমবাহিনী।
ঘনাদা থামলেন। আমাদের ধরা গলায় আর টু শব্দটিও নেই দেখে ঘনাদা শেষ জ্ঞানটুকুও দিলেন।
