তারপর টঙের ঘরে গিয়ে দোতলার তর্কটা একেবারে যেন তপ্ত ভোলা থেকে নামিয়ে দিয়েছি ঘনাদার সামনে।
গৌর প্রায় বিধানসভার মেজাজ নিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে ঘনাদার কাছে স্পিকারের রুলিং চেয়েছে দাঁত মুখ খিঁচিয়ে—শুনেছেন, শুনেছেন এদের কথা! বলে পাণ্ডবরা নাকি গোহারান হারত কুরুক্ষেত্রে!
হারতই তো, শিবু তাল ঠুকেছে ঘনাদার তক্তপোশটাই চাপড়ে, দুর্যোধন অমন গবেট না হলে তুলো ধোনা হত পাণ্ডবেরা।
তুলোধোনা হত পাণ্ডবেরা! শিশির আর গৌর যেন অর্জুনের গাণ্ডীব আর ভীমের গদা-ই হাতে নিয়ে হুংকার দিয়েছে, কে তুলোধোনা করত, কে? দুর্যোধনের নিরানব্বই-এর বদলে আরও নশো নিরানব্বইটা ভাই থাকলেও তাতে কুলোত না।
দুর্যোধনের ভাইদের আবার ডাকা কেন? আমি গলায় একেবারে লঙ্কাবাটা মাখিয়ে বলেছি, তাদের মাঠে নামবার দরকার হত না। গ্যালারিতে বসেই তারা ফাইন্যাল দেখতে পেত। দেখত কর্ণ—হ্যাঁ, একা সূতপুত্র কর্ণ কেমন করে কুরুক্ষেত্রের কাঁকুরে মাটিতে পাঁচ ভাই পাণ্ডবের নাকগুলো ঘসে দেয়। নেহাত দুর্যোধন নিজের আহাম্মুকিতে রেফারিকেই খচিয়ে দিলে তাই।
কথাগুলো বলতে বলতে আড়চোখে ঘনাদার দিকে অবশ্য নজর রেখেছি। এত পাঁয়তারা যে জন্য কষা সে মতলব একটু হাসিল হচ্ছে কি?
কোথায়—
ঘনাদা তাঁর কাশীরাম দাসের বিরাট গন্ধমাদনটি সামনে খুলে ধরে শোলোক আওড়ানো থামিয়েছেন বটে, কিন্তু নিজে যেন তাঁর এই টঙের ঘরেই আর নেই। দেহটা শুধু ফেলে রেখে কুরুক্ষেত্রেই বুঝি চরতে গেছেন।
তা গেছেন, যান। ফিরতে যাতে হয়, তার জন্য নারাচ, নালিক, পাশুপত থেকে ব্রহ্মাস্ত্র পর্যন্ত সবরকম অস্ত্রের ব্যবস্থা না করে আজ আমরা আসিনি।
দু-এক সেকেন্ডের ফাঁক যা পড়েছিল রেফারি কথাটার খেই ধরে তা ঢেকে গৌর খিঁচিয়ে উঠল রেফারি! রেফারি আবার কে?
রেফারি কে জানো না! সঙ্গে সঙ্গে শিবুর টিটকিরি আর আমার নব মহাভারত পাঠ শুরু।
শিশির আর গৌরের দিকে চেয়ে কানমলা দেওয়া গলায় বললাম, মহাভারতটাও পড়িসনি! শোন তা হলে—
মহাভারতের কথা কী কহিব আর।
কী হলে যে কী হইত অন্ত পাওয়া ভার।।
দুর্যোধন দুর্ভাগার মতিচ্ছন্ন হইল।
পদতল ছাড়িয়া বুদ্ধ শিয়রে বসিল॥
তাই না চটে চতুর কৃষ্ণ গাড়োয়ান হইয়া।
পাণ্ডু বয়েজ টিমকে দিলেন ম্যাচটা জিতাইয়া॥
চালের ভুলে রুষ্ট যদি না হতেন রেফারি।
কুরুক্ষেত্রে যায় কুরুরা পেনাল্টিতে হারি?॥
ঘনাদার দিকে চোখ রেখেই পদগুলো আওড়াচ্ছিলাম, কিন্তু শুভলক্ষণ কিছু দেখলাম না। ঠিক কুরুক্ষেত্রে না থাকলেও এখনও হস্তিনাপুর ছেড়ে তিনি আসতে প্রস্তুত নন মনে হল।
ঠিক ঘড়ির কাঁটায় সাতটা বাজতে পাঁচ মিনিট। বনোয়ারি তখন ঘরে ঢুকে ঘনাদার সামনে খাস্তা কচুরির আর অমৃতির প্লেট দুটো ট্রে থেকে নামিয়ে রাখছে।
ঘনাদার মুখের ভাব দেখে মনে হল এবারে তাঁর হস্তিনাপুরের প্রবাস থেকেই তিনি আনমনে সে প্লেটে হাত বাড়াতে দেরি করবেন না। ব্রহ্মাস্ত্রটা চটপট তাই প্রয়োগ করতে হল এবার।
ঘনাদার লুব্ধ হাত প্লেটে এসে পৌছবার আগেই দুদিক থেকে গৌর ও শিবু চক্ষের নিমেষে দুটি প্লেট তুলে নিয়ে বনোয়ারিকে ধমকে উঠল কী, হচ্ছে কী এসব! যখন তখন খাবার দিলেই হল! এখন এসব কে আনতে বলেছে।
বনোয়ারি অভিনেতা নয়। আগে থাকতে অনেক শেখানো পড়ানো সত্ত্বেও গৌর শিবুর ধমক খেয়ে সে সব ভুলে তোতলা হয়ে গিয়ে দুবার শুধু হামি হা..মি…তো গোছের কিছু একটা উচ্চারণ করল। আমাদের মতলব হাসিলের পক্ষে তাই কিন্তু যথেষ্ট।
ঘনাদার মুখের চেহারাটা তখন সাড়ে তিন হাজার বছর আগেকার হস্তিনাপুর। থেকে এক ঝটকায় উনিশশো পঁচাত্তরের বাহাত্তর নম্বরে এসে পড়ার জন্যই বোধহয় বেশ একটু ভ্যাবাচাকা।
আর যাই হোক এরকম একটা অবস্থার কথা তিনি কল্পনা করতেই পারবেন না জেনে মতলবটা ভাঁজা হয়েছিল।
কচুরি অমৃতির প্লেট দুটো বোয়ারির ট্রেতে তুলে তাকে চলে যাবার হুকুম দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কাজ যা হবার হল।
ঘনাদা অবশ্য এইটুকুর মধ্যেই নিজেকে সামলে নিয়েছেন। সেই ভ্যাবাচাকা ভাবটা মুখ থেকে মুছে এতক্ষণে যেন আমাদের সম্বন্ধে সচেতন আর বনোয়ারির প্রতি করুণাময় হয়ে উঠলেন, আহা, বেচারাকে মিছে কষ্ট দেওয়া কেন? আবার তো সেই আনতেই হবে ওকে!
ওগুলো রেখে যেতেই বলছেন! আমাদের গলায় একটু মৃদু প্রতিবাদের সুরই ফোটালাম, কিন্তু আমাদের জরুরি কথাগুলো…
কী তোমাদের জরুরি কথা বলো না! ঘনাদা বনোয়ারির হাত থেকে পুরো ট্রেটা একরকম কেড়ে নামিয়ে নিলেন, এগুলোর তো আর গলা নেই যে গোলমাল করবে। বলে ফেললা কী তোমাদের জরুরি কথা!
ঘনাদার শেষ কথাগুলো মুখে ঠাসা কচুরি ভেদ করে একটু জড়ানো অবস্থাতেই বার হল। আবার পাছে মুখের গ্রাস ফসকে যায় এই ভয়ে তিনি তখন প্রায় দুহাতে কচুরি আর অমৃতি মুখে বোঝাই করছেন।
তা যা করেন, করুন। আমরা এতদিনে তাঁকে বাগে পেয়েই খুশি। বেশ একটু জমিয়ে বসে জিজ্ঞাসা করলাম, জরুরি কথাটা কী, তা এখনও বোঝেননি? শুনুন না ওই আহাম্মকের কথা। বলে কিনা কৌরবরা কিছুতে হারত না!
আহাম্মকেরা মানে শিশির আর গৌর। তারাও ঠিক সিনেরিও মাফিক ঝাঁপিয়ে উঠল—কখনও হারত না, কিছুতেই হারত না।
শুনলেন? শুনলেন তো!—একটা জমজমাট বৈঠকের আশায় জ্বলজ্বলে চোখে ঘনাদার দিকে তাকালাম—এই ওদের মহাভারতের বিদ্যের দৌড়! কুরুক্ষেত্রে পাণ্ডবদের জিৎ নাকি হতই! আপনিই বলুন তো ঘনাদা!
