ঘনাদা চলে গেলেন।
এরপর চিড়িয়াঘর বানাবার উৎসাহ আর থাকে?
ভারত-যুদ্ধে পিঁপড়ে
ভারত-যুদ্ধে পিঁপড়ে! সে আবার কী?
শুনে হাসি পাচ্ছে তো? কথাটা বিশ্বাস হচ্ছে না? কাঠবিড়ালিরাও যেমন কাজে লেগেছিল, ভারত-যুদ্ধে মানে কুরুক্ষেত্রের সেই মহাযুদ্ধে পিঁপড়েদেরও সেইরকম কোনও মদত ছিল বলে মনে হচ্ছে হয়তো।
না, সরাসরি ভারত-যুদ্ধে পিঁপড়েদের কোনও পার্ট ছিল বলে জানা নেই। তবে—যাক, বলেই ফেলা যাক—পিঁপড়েদের—না, বহুবচনটা ভুল, আসলে— একটি ক্ষণজন্মা পিঁপড়ে তার কেরামতিটুক না দেখালে ভারত-যুদ্ধের প্রামাণিক ইতিহাসে ওই পাঁচ লহমার ফাঁক মানে ফাঁকিটুকু থাকত না।
ক্ষণজন্মা পিঁপড়ে! তার কেরামতিতে ভারত-যুদ্ধের ইতিহাসে ফাঁক?
কেরামতিটা কী?
তা বোঝবার জন্য গোড়া থেকে শুরু করা উচিত। একেবারে বাহাত্তর নম্বরের সেই দোতলার আড্ডাঘরে বত্রিশ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে শুরু এক রবিবারের গুমোেট সকালবেলায়।
কাগজে আবহাওয়ার পূর্বাভাষ দিয়েছে সারাদিন ভ্যাপসা গরম, বিকালে
বজ্রবিদ্যুৎসহ প্রচুর বৃষ্টির সম্ভাবনা।
কাগজে তো হপ্তাভোর রোজই ওই ভাঁওতা দিচ্ছে। কিন্তু সব ভরসাই ফরসা। না আকাশ, না টঙের ঘর থেকে এক ছিটেফোঁটা বর্ষণের লক্ষণ পাচ্ছি।
আকাশে কি টঙের ঘরে বজ্র-বিদ্যুৎ অবশ্য নেই। কিন্তু তাতেই তো আরও জ্বালা।
বজ্র-বিদ্যুতের জায়গায় দুবেলা কোকিলের বদলে দাঁড়কাক গিলে খাওয়া গলার অমৃতসমান মহাভারতের কথা শুনছি।
কখনও—
গোপালের চরিত্র দেবের অগোচর।
অন্য কে কহিতে পারে ত্রৈলোক্য ভিতর।।
ব্রহ্মাণ্ড বলি যে এক চতুর্দশ লোকে।
বিরাট পুরুষ ধরে এক লোমকূপে॥
তিল অর্ধ কোটি সে ব্রহ্মাণ্ড ধরে গায়।
এমত বিরাট যার নিঃশ্বাসে প্রলয়॥
কখনও বা—
অশ্বত্থামা নামে হস্তী তার তুল্য অন্য নাস্তি
এমনই উত্তম গজবর।
বর্ণে তিনি জলধর, ঈষা সম দন্ত সর
দেখিতে বড়ই ভয়ঙ্কর॥
তাহে আরোহণ করি, আসে কুরু অধিকারী
যথা আছে বীর বৃকোদর।
হাতে গদা ঘঘারতর, রোষযুক্ত নৃপবর
ভীমসেন করিতে সমর।
গলাটি কার তা আর বলে দিতে হবে না নিশ্চয়।
হ্যাঁ, সেই একমেবাদ্বিতীয়ম তেতলার টঙের ঘরে তিনি কিছুদিন ধরে আর সব ছেড়ে মহাভারত ধরেছেন। আমরাও সেই সঙ্গে পথে বসেছি।
সময়ে অসময়ে তাঁর নিজস্ব ট্রেডমার্ক-মারা গলায় ওপর থেকে কাশীরাম দাসের পয়ার ভেসে আসে। সে পয়ারের ঢেউ ঠেলে কোনওরকমে যদি তাঁর কাছে গিয়ে পৌঁছই, তিনি যেন মহাভারতের অমৃতরসে ড়ুবে আমাদের দেখতেই পান না।
তাঁর মতিগতি একটু ফেরাবার আশায় স্বস্ত্যয়নের উপচার জোগাতে আমরা কিছু ত্রুটি করিনি এ পর্যন্ত। কখনও আমিষ কখনও নিরামিষ, সাত্ত্বিক বা তামসিক বেশ কিছু আমাদের সমভিব্যাহারে গিয়েছে।
নৈবেদ্য সামনে ধরে দিয়ে আমরা একান্ত বশংবদ হয়ে এধারে ওধারে বসেছি। তাঁর শূন্য দৃষ্টি দু-একবার আমাদের দিকে ফিরলেও এ স্থূল বর্তমান ভেদ করে সেই সূদূর হস্তিনাপুরেই বোধ হয় চলে গেছে। আমরা যে তাঁর গোচরীভূত তার কোনও প্রমাণ পাইনি।
শুধু দক্ষিণ হস্তটা তাঁর নিজের অজান্তেই প্লেটের প্রত্যক্ষ বর্তমানের ওপর প্রসারিত হয়েছে। অচেতনভাবেই মুখে গিয়ে পৌঁছেছে তারপর।
সেখানে যান্ত্রিক দন্ত নিষ্পেষণ চলতে চলতে হঠাৎ ক্ষণিকের জন্য থামায় আমরা শশব্যস্ত হয়ে বলার সুযোগ পেয়েছি—কবিরাজিটা কি জুত হয়নি, ঘনাদা? একেবারে টাটকা ভাজিয়ে এনেছি কিন্তু!
ঘনাদার কর্ণকুহরেই বোধ হয় কথাগুলো প্রবেশ করেনি। সাড়ে তিন হাজার বছর ছাড়িয়ে গিয়ে কৃষ্ণার্জুনের কাছে অগ্নিদেবের খিদের বায়নাই তিনি তখন শুনছেন।
হাসিয়া কহেন পার্থ, কহ বিচক্ষণ।
কোন ভক্ষ্য দিলে তৃপ্ত হইবা এক্ষণ॥
আমি অগ্নি, বলি দিয়া নিজ পরিচয়।
আশ্বাস পাইয়া বলে অগ্নি মহাশয়॥
ব্যাধিযুক্ত বহুকাল আমার শরীর।
নিব্যাধি কহ মোরে পার্থ মহাবীর॥
খাণ্ডব বনেতে বহু জীবের আলয়।
সেই বন ভক্ষ্য মোরে কর ধনঞ্জয়॥
উদর পুরিয়া খাই এই অভিরুচি।
কোনও পশুপক্ষী মৎস্যে নাহিক অরুচি।।
অগ্নিদেবের খিদের আবদার শোনাতে শোনাতে খাণ্ডব বনের অভাবে সামনে ধরে দেওয়া প্লেটগুলো ঘনাদা চেটে পুটে সাবাড় করেছেন। আমাদের উপস্থিতি টের পাবার কোনও লক্ষণই কিন্তু দেখা যায়নি।
মনে মনে গজরাতে গজরাতে নীচে নেমে এসেছি সবাই। আর তারপরই ঘনাদাকে কাত কবার এই নতুন মতলব ভাঁজা হয়েছে।
ফন্দিটা বিষে বিষক্ষয়, মানে যাকে বলে অটোভ্যাক্সিন। যা দিয়ে আমাদের জ্বালাচ্ছেন তাই দিয়ে ঘনাদাকে জব্দ করাই অর্থাৎ তাঁর ওপরই মহাভারত চাপানো।
সকাল থেকেই আমাদের তর্কটা শুরু হয়েছে। ঘণ্টার কাঁটা ছ-টা থেকে সাতটার দিকে যত এগিয়েছে আমাদের গলা ধাপে ধাপে তত তেতলার টং পর্যন্ত পৌঁছেছে নিশ্চয়।
একদিকে শিবু আর আমি, অন্য দিকে গৌর আর শিশির।
তর্ক তো নয়, যেন দ্বিতীয় কুরুক্ষেত্র।
ছ-টা একুত্রিশে শিবুর হাঁক ন্যাড়া সিঁড়িটা বোধহয় পেরিয়ে গেছে, আলবত হারত পাণ্ডবেরা।
কখনও না! শিশিরের প্রতিবাদ খোলা ছাদ পর্যন্ত নিশ্চয়।
কচুকাটা হত তা হলে! আমি গলাটা টঙের ঘরে পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পেরেছি বোধহয়।
ওপরে ঘনাদার সুরেলা মহাভারত শোলোক আওড়ানো হঠাৎ যেন থেমেছে। এই জিরো আওয়ার বুঝে নিজেদের গলার পেছনে আমরাও এবার ন্যাড়া সিঁড়ি বেয়ে টঙের ঘরের দিকে পা বাড়িয়েছি। পেছন দিকে তাকিয়ে খাবারের ট্রে সমেত বনোয়ারি ঠিক হিসেব মতে হাজির হবার জন্য তৈরি কি না দেখে নিতে ভুলিনি।
