পাউলো আবার একবার লাফিয়ে ওঠবার চেষ্টা করতেই একটি আলতো রদ্দায় তাকে কেদারায় কাত করে দিয়ে বললাম, সে উৎস হল প্রাণীজগতের সত্যিকার রক্তখাকি এক রাক্ষসি, ডেসমোডাস রোটনডাস, যার চলতি নাম হল ভ্যাম্পায়ার। বাদুড়। ভ্যাম্পায়ার সম্বন্ধে সত্যি মিথ্যে অনেক রকম কিংবদন্তীই আছে। প্রাণীটিকে চোখে দেখলে তার সর্বনাশা ভীষণতা বোঝা কঠিন। এক কাঁচ্চা থেকে খুব বেশি হলে তিন কাঁচ্চা এই জীবটির ওজন। কিন্তু রাত্রে ঘুমন্ত মানুষ গোরু-ঘোড়ার রক্তই শুধু সে চুষে খেয়ে যায় না, সাংঘাতিক জলাতঙ্ক রোগের বিষও শরীরে ঢুকিয়ে দিয়ে যায়। ভ্যাম্পায়ার বাদুড়ের এই ভয়ংকর ক্ষমতার কথা জেনে তুমি অনেক টাকা খরচ করে বিশেষভাবে তৈরি কাঠের খাঁচায় তোমার প্লেনে বেশ কিছু ঝাঁক সে বাদুড় আনিয়ে জুয়ানের র্যাঞ্চের কাছাকাছি সেরা দো মার পাহাড়ের গুহায় তো ছাড়বার ব্যবস্থা করেছ। এবারও এক ঝাঁক তুমি এনে ছাড়তে ভোলোনি। কিন্তু সব শয়তনি ফন্দি তোমার ভণ্ডুল। যত ভ্যাম্পায়ার তুমি ছেড়েছ তার একটাও আর বেঁচে নেই। কাল নিজে গিয়ে সবগুলো পরীক্ষা করে তুমি দেখে আসতে পারবে। আসল মরণকাঠি নেড়ে রক্তচোষা মরণ-বিষ-ছড়ানো সব রাক্ষসি আমি শেষ করে দিয়ে যাচ্ছি।
শেষ একটি থাবড়ায় পাউলোকে ইজি চেয়ারে একেবারে চিত করে শুইয়ে দিয়ে বললাম, অকারণে ব্যস্ত হয়ো না। এখন ওঠার চেষ্টা করে কোনও লাভ নেই। তুমি যতক্ষণে উঠে দাঁড়াবে ততক্ষণে আমি তোমারই দেওয়া জিপে প্লেনে পৌঁছে যাব। সেখানে একজন পাইলটকে আমি সব কথা বলে নিজের দলে টেনেছি। আর একজনকে আগে থাকতে সেখানে বেঁধে রাখবার ব্যবস্থা আছে। তোমার প্লেন আমি চুরি করব না। শুধু কিছুক্ষণের জন্য ধার নিয়ে ওই প্লেনে হন্ডুরাস কী গুয়াতেমেলা কোথাও গিয়ে নামব। বেঁধে রাখা পাইলট ছাড়া পেয়ে সেখান থেকে তোমার প্লেন ফিরিয়ে নিয়ে আসবে। তোমায় শেষ একটা উপদেশ। এরপর আর কোনও শয়তানি চালাকির চেষ্টা কোরো না। এখানে কারখানা বসানোর মতলব ছেড়ে অন্য কোনও কারবারে তোমার শয়তানি বুদ্ধি খাটাও গিয়ে। আচ্ছা, বিদায়!
আমি উঠে আসতেই কেদারা থেকে ওঠবার চেষ্টা করে পাউলোর সে কী করুণ মিনতি।
শোনো, শোনো, দাস! সত্যি তোমার কাছে হার স্বীকার করছি। রাক্ষুসি। ভ্যাম্পায়ারদের মরণকাঠি কী তা-ই শুধু বলে যাও!
কে তার জবাব দেয়!
তার আকুল মিনতি জিপের আওয়াজেই তখন চাপা পড়ে গেছে।
ঘনাদা থামলেন।
দরজায় ট্রে হাতে বনোয়ারি। ট্রে থেকে প্লেট নামানো থেকে সেটি একবারে চাঁছাপোঁছা না হওয়া পর্যন্ত ঘনাদার মুখে আর কথা নেই।
আমাদের ধৈর্য অসীম।
প্লেটটা তিনি নামাবার পরই মুখিয়ে থাকা কথাটা জানালাম।
জবাবটা কিন্তু আমাদের যে চাই! রাক্ষুসিদের মরণকাঠিটা কী, ঘনাদা?
মরণকাঠিটা হল, শিশিরের এগিয়ে দেওয়া সিগারেটের টিনটা খুলতে খুলতে ঘনাদা বললেন, ওই ডাইফেনাডিয়োন। মানুষের, বিশেষ করে হার্টের রুগির, পক্ষে এটা দামি ওষুধের সামিল, কিন্তু ইঁদুর বাদুড় গোছের প্রাণী মারবার একেবারে ব্রহ্মাস্ত্র। রক্ত চুষে যারা বাঁচে এ ওষুধ তাদের রক্ত জল করে দিয়েই মারে। ওষুধটার গুণ জানবার পরও এটা ব্যবহারের উপায় প্রথমে পাওয়া যায়নি। রাক্ষুসে ভ্যাম্পায়ার বাদুড় এ ওষুধ খেলে মরবে। কিন্তু তাদের খাওয়ানো যাবে কী করে? এক-একটা করে বাদুড় ধরে ওষুধ গেলানো তো যায় না। ভ্যাম্পায়ার বাদুড়ের একটা অভ্যাসের কথা জেনে এ সমস্যার আশাতীত সমাধান বার করা গেছে। ভ্যাম্পায়ারের একটা অভ্যাস হল বাঁদরদের মতো পরস্পরের গা চেটে পরিষ্কার করা। চামড়ার দস্তানা পরা হাতে একটা রাক্ষসিকে ধরে তার গায়ে আধ চামচ ভেসলিনের সঙ্গে মাত্র পঞ্চাশ মিলিগ্রাম ডাইফেনাডিয়ান মিশিয়ে লাগিয়ে দিলেই হল। একটা ওষুধ মাখানো রাক্ষুসির গা চেটে গোটা পঁচিশ ত্রিশ অন্য রাক্ষুসির ভবলীলা শেষ হবে।
ক-দিন ধরে পাউলোর জিপে ঘুরে ঘুরে ভ্যাম্পায়ার বাদুড়ের গুহাগুলো খুঁজে বার করে এই কাজই করেছিলাম। পাউলো তার শয়তানি ফন্দিতে মোটমাট ষাট-সত্তরের বেশি ভ্যাম্পায়ার আমদানি করতে পারেনি। তার উদ্দেশ্য অবশ্য তাতেই সিদ্ধ হয়েছে। আমারও সুবিধে হয়েছে দিন তিনেকের মধ্যে তাদের সব কটাকে খতম করার।
ওষুধের গুণ যতই হোক, ওই জাপানি কুয়াশা যাকে বলেছি তা না থাকলে সব কিছুই মিথ্যে হয়ে যেত। জাপানি কুয়াশা আসলে হল কুয়াশার মতো সূক্ষ্ম নাইলনের একরকম অদৃশ্য জাপানি জাল। তার সুতোগুলো এত সূক্ষ্ম যে রাত্রে তা অতি তীক্ষ্ণ চোখের দৃষ্টিতেও একেবারে দেখাই যায় না, বাদুড়দের শব্দতরঙ্গও তাতে কাজ করে না। অত বেশি মিহি বলেই এ জালের নাম জাপানি কুয়াশা জাল।
ভ্যাম্পায়ারদের গুহার মুখে এই কুয়াশা জাল টাঙিয়েই তাদের সব কটাকে আমি ধরতে পেরেছিলাম।
ঘনাদা মুখের সিগারেট ধরিয়ে যথারীতি শিশিরের টিনটা ভুলে হাতে নিয়ে উঠে পড়লেন।
তিনি দরজার কাছে যাবার পর শেষ প্রশ্নটা হঠাৎ মনে পড়ল।
গলা ছেড়ে জিজ্ঞাসা করলাম, আচ্ছা, এতদিন বাদে ওই কার্ল পাউলো আপনার খোঁজ পেল কী করে?
ওই জাপানি কুয়াশা থেকে! ঘনাদা ফিরে দাঁড়িয়ে অনুগ্রহ করলেন, চলে আসবার পর নির্দেশ লিখে ওটা ওষুধপত্র সমেত জুয়ান ভার্গাস-এর কাছে পার্শেল করে পাঠিয়েছিলাম কিনা। সেদিন আবার তোমাদের চিড়িয়াঘরের কথায়, আশার গুনগুনিয়া রাখবার জন্য জুয়ানের কাছে সেটা আবার চেয়ে পাঠিয়েছি। সেই চিঠি কোনওভাবে পাউলোর হাতে পড়েছে বোধহয়। জাপানি কুয়াশা সুতরাং আর পাবার আশা নেই। তার দরকারও নেই অবশ্য। ঘনাদা একটু যেন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, তোমরা গুণগুনিয়া তো আর আনছ না।
