না। কৃতজ্ঞতায় প্রায় গলে গিয়ে জানালাম, ওই জিপটা যে দিচ্ছ সেই দয়াই যথেষ্ট।
কিন্তু তুই?হঠাৎ একটু যেন সন্দিগ্ধ সুরে পাউলো জিজ্ঞাসা করলে, তুই তো শুধু ওই একটা ফোলিওব্যাগই সঙ্গে এনেছিস। আর কিছু নেই?
না। আর কিছুতে কী দরকার? সবিনয়ে জানালাম, আকাশে উড়তে যত হালকা থাকা যায়।
কোঁচকানো ভুরু জোড়া সোজা হয়ে এল এবার। পাউলো একটু ঠাট্টার সুরেই জিজ্ঞাসা করলে, কী আছে ওই ব্রিফকেস-এ? কী এমন দামি নথিপত্র?
না, সে সব কিছু নেই। সরলভাবেই জানালাম, দাঁতমাজা দাড়ি কামানোর সরঞ্জাম আর এক প্রস্থ হালকা পোশাক বাদে যা আছে তা শুনলে হাসবে।
বেশ, হাসা তা হলে। পাউলোর মেজাজ এখন খোশ।
আস্তে আস্তে বেশ স্পষ্ট করে বললাম, আছে খানিকটা জাপানি কুয়াশা, এক কৌটো ভেসলিন, ছোট এক শিশি ডাইফেনাডিয়োন আর এক জোড়া মোটা চামড়ার দস্তানা।
সেকেন্ড দুয়েক সামান্য ভুরু কুঁচকে থেকে সত্যিই এবার হেসে ফেলল পাউলো। তারপর একটু কড়া গলাতেই বললে, ও সব ভড়কি আর যাকে পারিস দিস। কাজ যা দিয়েছি তা হাসিল করতে না পারলে ওসব ভড়কি তোর সঙ্গে গোরেই যাবে মনে রাখিস। নামবার পর এক হপ্তা তোকে সময় দেব। তার মধ্যে জুয়ান ভাগাসকে বাগ মানানো চাই-ই।
নীরবে মাথা নেড়ে সায় দিতে দিতে মনে মনে বললাম, আমার পকেটের জুয়ান ভার্গাসের চিঠিটা যদি এখন দেখতে পেতে, পাউলো!
সেরা দো মার পাহাড়ের ধারে কার্ল পাউলোর শিকারি আস্তানায় নামবার পর নিজের একটা কামরা পেয়ে একটু নিরিবিলি হবার পর জুয়ান ভার্গাস-এর চিঠিটা আবার বার করে পড়লাম।
চিঠির কথাগুলো আমার প্রায় অবশ্য মুখস্থ হয়ে গেছে। নিউ অর্লিনস থেকে ওয়াশিংটন যাবার পথে আমার ট্র্যাভেল এজেন্সি মারফত এই চিঠিটা পেয়েই আমি প্ল্যান বদলে ডালাস থেকে ব্রেজিলের ব্রাসিলিয়া যাবার প্যাসেঞ্জার প্লেন ধরবার জন্য এয়ারপোর্টে গিয়েছিলাম। সেখানে যেন নিয়তির নিজের কারসাজিতে কার্ল পাউলোর সঙ্গে দেখা। সে অমন জোর করে ধরে না নিয়ে এলে বেশ একটু ঘুরপথে আরও দেরিতে এই জুয়ানের কাছে আমায় পৌঁছতে হত। জুয়ান যে দারুণ ব্যাপারের কথা লিখেছে তাতে, যেমন করে হোক, না এসে অবশ্য আমি পারতাম না।
জুয়ান তার চিঠিতে প্রায় দিশাহারা হয়ে আমার সাহায্য চেয়েছে। বেশ কয়েক বছর আগে এই অঞ্চলের বিস্তৃত জমি ইজারা নিয়ে সে যখন গোরু-ঘোড়ার পাল বাড়াবার র্যাঞ্চ বসায় তখনকার কথা আমি জানি। নিজের যা কিছু সম্বল সব সে এই আদর্শ র্যাঞ্চে ঢেলে দিয়েছিল। সে দুঃসাহস তার বৃথা হয়নি। এই কবছরে তার র্যা—সব দিক দিয়ে সার্থক হয়ে উঠেছিল। হঠাৎ কোথা থেকে এক সর্বনাশা অভিশাপে সব ছারখার হবার জোগাড়। তার গোরু-ঘোড়ার পালে ভয়ংকর রকম মড়ক লেগেছে। সে মড়কের কারণও অবিশ্বাস্য। পালে পালে তার গোরু-ঘোড়া মরছে জলাতঙ্ক রোগে। ভয়ে দুর্ভাবনায় তার মাথা খারাপ হয়ে যাবে বলে মনে হচ্ছে। তার এ অঞ্চলের জমির মালিক কার্ল পাউলো কিছু দিন থেকে তার কাছে জমিগুলো ফেরত চাইছে। কারখানা বসিয়ে এই পবিত্র সুন্দর অঞ্চলটা নোংরা বিষাক্ত করতে দিতে চায় না বলে এতদিন সে পাউলোর পেড়াপিড়ি বা হুমকি কিছুতেই আমল দেয়নি। কিন্তু এবার বোধহয় হয়ে তাকে নিজে থেকে সেধেই র্যাঞ্চ বেচে চলে যেতে হবে। এই বিপদের মধ্যে শেষ পরামর্শের জন্য সে আমায় ডেকে পাঠিয়েছে।
কার্ল পাউলো আমায় সাতদিন মাত্র সময় দিয়েছিল।
সাতদিন কিন্তু আমার লাগল না। মেয়াদের দুদিন বাকি থাকতেই সেদিন বিকেলে পাউলোর নিজের কামরায় গিয়ে হাজির হলাম। হাতে আমার নিজের ব্রিফকেসটি।
পাউলো তখন তার আরাম-কেদারায় গা এলিয়ে কী একটা ডায়রি গোছের খাতার পাতা ওলটাচ্ছে।
কোনও সম্ভাষণ না করে তার কাছেই একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসলাম।
একটু চমকে ওঠার সঙ্গে মুখটা একটু লাল হয়ে উঠলেও পাউলো নিজেকে সামলাল। তারপর গলার স্বরটা যথাসম্ভব হালকা করে জিজ্ঞাসা করলে, কী? এ ক-দিন তো চুলের টিকিটি দেখতে পাইনি। কেন? আর দু-দিন মাত্র বাকি তা তো মনে। আছে?
দু-দিন আর লাগবে না।
আমার গলায় তাচ্ছিল্যের সুরটাতেই কেমন একটু সন্দিগ্ধ হয়ে পাউল এবার সোজা হয়ে উঠে বসে কুটির সঙ্গে জিজ্ঞাসা করলে, লাগবে না মানে? কাজ হাসিল হয়ে গেছে এর মধ্যে? জুয়ান ভার্গাস রাজি হয়েছে?
জুয়ান ভার্গাস-এর রাজি না রাজি হওয়ার কী আছে!আগের মতোই তাচ্ছিল্যের সুরে বলেছি, তার সঙ্গে দেখাই হয়নি। হয়নি মানে করিনি।
তার সঙ্গে দেখাই করিসনি! রাগে পাউলোর মুখ দিয়ে যেন ফেনা বেরুবে মনে হল, আর পাঁচ দিনেও কাজ হাসিল না করে তুই আমার কাছে সাহস করে এসে বসেছিস?
পাউলো খ্যাপা ষাঁড়ের মতো ইজি-চেয়ারটার খাল থেকে উঠতে গেল।
পিঠে একটি ছোট কিল দিয়ে তাকে আবার কেদারাতেই বসিয়ে দিয়ে বললাম, অস্থির হচ্ছ কেন মিছিমিছি? আসল যা কাজ তা পাঁচ দিনে সত্যিই হাসিল হয়ে গেছে যে! আজ এক বছর ধরে মোক্ষম শয়তানি ফন্দি তুমি খাটাচ্ছ বটে। আমার সঙ্গে এবারের প্লেনেও একটি ক্রেট-এ শয়তানি চক্রান্তের সব যমের দূতদের বয়ে এনে নামাতে দেখলাম। তাদের সব খেল কিন্তু এবার খতম। জুয়ান ভাগাসকে বাগ মানাতে না পেরে তাকে একেবারে ধনে প্রাণে মারবার যে ফন্দি তুমি করেছিলে তা যেমন পৈশাচিক তেমনই ভয়ংকর। কোথাও কিছু নেই, তার গোরু-ঘোড়া পালে পালে আচমকা মারা যেতে শুরু করল এক বছর আগে থেকে। আর মারাও যাচ্ছে এ-রোগ সে-রোগে নয়, হাইড্রোফোবিয়া মানে জলাতঙ্ক রোগে, যার চিকিৎসা নেই। কোথা থেকে এ-রোগ এল গূঢ় রহস্য না জানলে কেউ ভেবেও পাবে না। ক-জন জানে যে জলাতঙ্ক রোগ শুধু খ্যাপা কুকুরের কামড়েই হয় না, তার চেয়ে মারাত্মক উৎস এ রোগের আছে।
