কোথায় যাচ্ছি দেখতেই তো পাবে! বলে পাঁচমণি বপুটি কাঁপিয়ে পাউলোর সে কী হাসি!
আমি দেখতে পাব! তার লাউঞ্জফাটানো হাসির মাঝখানে বলতেই হল অবাক হবার ভান করে, কী বলছ?
ঠিকই বলছি। হাসির মাত্রাটা একটু শুধু কমিয়ে বললে পাউলো, তুমি তো আমার সঙ্গেই যাচ্ছ। দেখা যখন হয়েছে তখন আর তোমায় ছাড়ি!
ছাড়লে সত্যিই। কার্ল পাউলোর হাত থেকে ছাড়া পাওয়ার চেয়ে ব্রেজিলের আনাকোন্ডার পাক কি অক্টোপাসের নলোর আলিঙ্গন ছাড়ানো সোজা।
পাউলোর সঙ্গে দেখা হয়ে তারই প্লেনে সঙ্গী হয়ে যাওয়া নেহাত নিয়তির বিধান বলেই মেনে নিয়ে শেষ পর্যন্ত বেশি আপত্তি করলাম না। নিজের প্লেনের টিকিট আমার পকেটেই রইল, সেইসঙ্গে জুয়ান ভার্গাস-এর চিঠিটাও।
ডালাসের এয়ারপোর্টে প্লেনে চড়তেই আমি এসেছিলাম। তবে সেটা নেহাত সাধারণ প্যাসেঞ্জার প্লেনে, পাউলোর নিজস্ব জেট বিমানে নয়। প্যাসেঞ্জার প্লেনে গেলে আমার যা গন্তব্য, সেখানে একটু দেরিই হত ঘুরপথে পৌঁছতে। কার্ল পাউলো আমার সে কষ্টটুকু যদি জোর করে বাঁচিয়ে দেয়, তা হলে কত আর আপত্তি করা যায়?
নিজস্ব প্লেনটা পাউলো একেবারে বাদশাহি মেজাজে সাজিয়েছে। কোনও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যেরই সেখানে অভাব নেই। প্লেনে নয়, পাউলোর নিজের বাড়িতেই যেন বসে আছি।
সেই বাদশাহি বিলাসের মধ্যে বসিয়ে প্লেনে যেতে যেতে পাউলো তার নতুন পরিকল্পনার কথা সোৎসাহে আমায় শোনালে।
ব্রেজিলের মাথায় উত্তর-পুব দিকে সেরা দো মার পর্বতমালা। সেই সেরা দো মার-এর দক্ষিণে বিরাট এলাকার সে মালিক। সেখানে সে এতদিন শুধু শিকারে গিয়ে থাকবার একটা আস্তানাই করে রেখে ছিল। এখন সেখানে সে রবারের একটা বিরাট কারখানা বসাতে চায়। মোটর এরোপ্লেন ইত্যাদির টায়ার টিউব থেকে শুরু করে রবারের যা কিছু সম্ভব সব সেখানে তৈরি হবে। ও অঞ্চলে মজুরি সস্তা। দুনিয়ার সেরা বেলেম-এর রবারও কাছেপিঠেই জন্মায়। তা ছাড়া সমুদ্রের কাছে আর আবহাওয়া জুতসই বলে মাল তৈরি আর চালানের অন্য সুবিধেও যথেষ্ট। এমন একটা ললাভের পরিকল্পনা শুধু এক তেওঁটে হাড় বজ্জাতের বদমায়েশির দরুন ভেস্তে যেতে বসেছে।
এতদূর পর্যন্ত শুনে একটু অবাক হবার ভান করে বলতেই হল, তাই নাকি?
শোনো না আগে! তার রবারের কারখানায় যে বাদ সাধছে তার ওপরকার রাগটা একটা দুরমুশপেটানো কিলে আমার পিঠেই ঝেড়ে পাউলো বললে, কয়েক বছর আগে এ কারখানার কথা যখন মাথায় আসেনি, তখন না বুঝে এক হতভাগা জুয়ান ভার্গাস-কে ওখানকার অনেকখানি জায়গা ইজারা দিয়েছিলাম। সে হতভাগা জুয়ান সেখানে গোরু ঘোড়ার র্যাঞ্চ বসিয়েছে। এখন এত সাধাসাধি করছি, তার ইজারার টাকা ফেরত দিয়ে গোরু-ঘোড়া সমেত সমস্ত র্যাঞ্চ কিনে নেব বলছি, তবু সে বদমাশটা কিছুতেই তার দখল ছাড়বে না। ডেকে পাঠালে আসে না। লোক দিয়ে বলে পাঠায় যে রবারের কারখানার চেয়ে গোরু-ঘোড়ার কারবার অনেক পবিত্র জিনিস। প্রাণ থাকতে তার দখল সে ছাড়বে না। এরকম বদমায়েশকে শায়েস্তা করবার সোজা ওষুধ আছে। কিন্তু মুশকিল হয়েছে এই যে কারখানা বসানোর ব্যাপার নিয়ে ওই জুয়ান-এর সঙ্গে গোলমালের কথাটা রাজধানী ব্রাসিলিয়ার খাস দপ্তরে পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। খবরের কাগজেও লেখালেখি হয়েছে এই নিয়ে। এখন হঠাৎ ওই বদমাশটার ভালমন্দ কিছু হয়ে গেলে, বড় বেশি জবাবদিহির দায়ে পড়তে হতে পারে। কারখানা তাতে আরও পিছিয়ে যাবে।
একটু থেমে আমার আগাপাশতলা একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে তার আসল মতলবটা জানালে পাউলো।
গলায় যেন একটু আদর ঢেলে বললে, তোমাকে যে পেয়ে গেছি এইটেই আমার ভাগ্য, দাস। তোমায় একটা কাজ আমার করে দিতেই হবে। সেই জন্যই তোমায় ধরে নিয়ে যাচ্ছি।
মুখে কিছু না বলে তার দিকে অবাক-হয়ে-চাওয়া চোখেই প্রশ্নটা রাখলাম।
তুমি প্যাঁচের রাজা।আমায় তাতিয়ে বললে পাউলো, যে কোনও ফিকিরে হোক ওই পাজি জুয়ান ভার্গাসকে তোমায় বাগ মানাতে হবেই।
আমাকে! এবার বিস্ময়ে সরব হলাম।
হ্যাঁ, তোমাকে! সঙ্গে সঙ্গে কার্ল পাউলোরও মুখের চেহারার সঙ্গে গলার স্বরটা বদলাল। আগের সে মধু আর নেই।
না, না, ওসব আমি পারব না! ইচ্ছে করেই আপত্তিটা বেশ জোর দিয়ে জানালাম, আমায় খাতির করে নিয়ে যাচ্ছ, যাচ্ছি। তোমার ওসব ঝামেলায় আমি ঘাড় পাতব কেন?
সঙ্গে সঙ্গে ঘাড়ের ওপর প্রচণ্ড একটি রদ্দা।
ঘাড় পাতবি জান বাঁচাবার জন্য রে কেলে নেংটি! পাউলোর গলা যেন এবার কার্বলিক অ্যাসিডে মাখানো, তোর মতো একটা উচ্চিংড়েকে কি এমনই ধরে নিয়ে যাচ্ছি মনে করছিস! ভুজুং দিয়ে, কি তুরুম ঠুকে, যা করে হোক, জুয়ান ভার্গাস-এর ও ইজারা বাতিল করাতে তোকে হবেই। আর কিছু না পারিস, চুরি করবি ওর সে ইজারার দলিল। কী? বুঝেছিস এবার?
মাথা নেড়ে জানালাম যে বুঝেছি। তারপর বেশ যেন ঢিট হওয়া করুণ বশংবদ গলায় জানালাম, কিন্তু আমায় তা হলে একটু সুবিধে দিতে হবে যে।
কী সুবিধে? কার্ল পাউলো খেঁকিয়ে উঠল।
একটু ঘুরে ফিরে বেড়াবার সুবিধে! যেন ভয়ে ভয়ে নিবেদন করলাম—ও তল্লাটে দু-চারদিন টহলদারি করতে করতে ওই তোমার কী নাম জুয়ান না তুয়ানের সঙ্গে ভাব জমাতে হবে তো। নইলে হট করে গিয়ে হাজির হলে সন্দেহ করবে যে!
থাম, থাম! ধমকে থামিয়ে দিয়ে পাউলো বললে, বেশি বকতে হবে না। ঘোরাফেরা করার জন্য আমার শিকারের আস্তানার একটা জিপ-ই তুই পাবি। আর কিছু চাস?
