হামেশা ভারী ভয় দেখান আমাদের ছেড়ে যাবেন বলে। কথায় কথায় এ হুমকি আর সহ্য হয় না। ছেড়ে যাওয়ার মজাটা ওঁকে বোঝানো দরকার।
বোঝাবার সেই পণ থেকেই এ কাহিনীর গোড়ার পরিকল্পনার জন্ম। সে পরিকল্পনা অমন বেয়াড়া ভাবে ভেস্তে যাবে তা কি জানি! জোর করে বলা যায়, আমাদের কোথাও গলতি কিছু হয়নি। যেমন ছকা হয়েছিল পরিকল্পনাটা ঠিক সেই লাইন ধরেই এগিয়েছে। রাত ভোর না হতে রামভুজ আর বনোয়ারিকে আগে বিদেয় করে শিশির আমাদের ক-জনকে আড্ডাঘরেই তালা বন্ধ করে, অন্য সব কামরাতেও সেই সঙ্গে তালা লাগিয়ে বাহাত্তর নম্বর ছেড়ে বেরিয়ে গেছে।
বাড়ি ছেড়ে গেলেও বেশি দূরে কোথাও সে যাবে না। সকালে ওঠবার পর খাঁ খাঁ বাড়িতে ঘনাদার একটু উচিত শিক্ষা হবার পরই ফিরে এসে আমাদের তালা খুলে বার করবে।
শিশির যতদূর সম্ভব নিঃশব্দে তালা এঁটে চলে যাবার পর থেকেই আমরা একেবারে কান খাড়া করে সজাগ।
কিন্তু যার জন্য এত আয়োজন, ছাদের সিঁড়িতে ঘনাদার সেই ভয়ে ভাবনায় নামা পায়ের আওয়াজ কই?
ঘনাদার খাওয়া শোয়া ওঠা বসা সব তো একেবারে ঘড়ি ধরা। আজ তাঁর সেই ঘড়িই বিকল হয়ে গেল নাকি? তাঁর এতটুকু সাড়া-শব্দও নেই।
না। আছে। ওই তো চিলের ছাদে তাঁর বিদ্যাসাগরি চটির কেমন একটু অধৈর্যের চটপট ফটফট। তারপর খোলা সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে সে অধৈর্যের আওয়াজটা একটু দ্বিধা-সংশয়ে ঢিমে হয়ে আসা।
তারপর ঠিক যেমনটি কষে রাখা হয়েছিল, ঘনাদার পদধ্বনি একেবারে সেই ছন্দে মোনো।
বারান্দায় নেমেই চটপটের জায়গায় চটি জোড়ায় যেন একটু ঘসটে চলা। ঘনাদা এখন হতভম্ব হয়ে তালাগুলো দেখছেন নিশ্চয়।
আড্ডাঘরের সামনে থেকে যেন নেহাত দিশাহারা হয়ে পরের কামরাটা পর্যন্ত পা দুটো টেনে নিয়ে যাওয়া।
তারপরই সভয়ে আবার ওপরের দিকে ছুটের উপক্রম।
কী, ব্যাপার কী, ঘনাদা!
ঠিক একেবারে কটায় কাঁটায় লিলিয়ে সেই মুহূর্তে নীচের সিঁড়ি দিয়ে উঠে শিশিরের যেন বিস্মিত সম্ভাষণ।
সেই সঙ্গে ঝটপট তালা খুলে দেওয়ার সঙ্গে আমাদেরও ও ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ঘনাদাকে ঘিরে ধরা।
এ কী! আপনি এমন সময় এখানে! আমাদের কেমন একটু সন্দিগ্ধ জিজ্ঞাসা।
হাতে হাতে ধরা পড়ে এবার ঘনাদা একেবারে বেড়াজালে ঘেরা।
কোনও দিকে কোনও ফাঁক নেই পিছলে বার হবার। কী করবেন এখন, কী বলবেন?
ঘনাদা কিন্তু বললেন। যা বললেন, তাতে সবাই আমরা হাঁ। আমরা তাঁকে লজ্জায় ফেলব কি, তিনিই আমাদের অভয় দিলেন।
না, আর কোনও ভয় নেই। ঘনাদার দাঁড়াবার ভঙ্গি থেকে গলার স্বরে পর্যন্ত পরম বরাভয় আশ্বাস। আর সেই সঙ্গে আমাদের প্রশস্তি—খুব ভাল করেছ দরজায় তালা লাগিয়ে রেখে। ওই তালা দেখেই চলে গেছে।
এসব শুনে মাথায় চক্কর দেওয়াটা খুব অন্যায় নিশ্চয় নয়। কীসের ভয় ছিল আর কেন তা আর নেই, দরজায় তালা দেখে কে-ই বা চলে যাওয়ায় আমাদের বিপদ কাটল এ সব খোলসা করবার জন্য ঘনাদাকে আর ওপরে যেতে না দিয়ে বৈঠকিঘরেই টেনে নিয়ে যাওয়া ছাড়া কী করতে পারি তখন?
বনোয়ারি রামভুজের এখনও আসতে দেরি হবে হয়তো, কিন্তু আরামকেদারাটা আছে, শিশিরের সিগারেটের টিনও। তাই প্রণামী দিয়ে জিজ্ঞাসা করতে হল, দরজায় তালা দেখে চলে গেছে কে?
কে আর? ঘনাদা শিশিরের ধরিয়ে দেওয়া সিগারেটে জুত করে টান দিয়ে বললেন, সেই সেরা দো মার-এর শিকারের আস্তানা থেকে হন্যে হয়ে যে আমায় সারা দুনিয়া খুঁজে বেড়াচ্ছে সেই কার্ল পাউলো।
কার্ল পাউলো! নামটা দুবার জিভে সড়গড় করে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, সেই পাউলোকেই আপনার ভয়? তা সে আপনাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে কেন! মারবে-টারবে নাকি?
হ্যাঁ, পারলে সে আমায় পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে কাটবে, কিন্তু তার আগে সেরা দো মার-এর ধাঁধাটার উত্তর না বার করতে পারলে শান্তি পাবে না।
ওই পাউলোকে একটা ধাঁধা শুনিয়ে তার উত্তর না জানিয়ে পালিয়ে এসেছিলেন। বুঝি! আমাদের বলতেই হল, খুব অন্যায় কিন্তু।
হ্যাঁ, অন্যায় একদিক দিয়ে তো বটেই। ঘনাদা স্বীকার করলেন, তা ছাড়া কার্ল পাউলোর ধারণা, তার সঙ্গে আমি বিশ্বাসঘাতকতা করেছি।
সত্যি তাই করেছেন নাকি? আমাদের গলায় অবিশ্বাস।
হ্যাঁ, যা করেছি তা একরকম বিশ্বাসঘাতকতাই ভাবতে পারে পাউলো। কারণ সে-ই তো আমায় সঙ্গে করে তার নিজের প্লেনে–
ঘনাদা থামলেন। তাঁর দৃষ্টি অনুসরণ করে চোখ ফিরিয়ে দেখি দরজায় স্বয়ং শ্রীমান বনোয়ারি হাজির। আমাদের নির্দেশ মতো ভোরটা পার করে দিয়ে রামভুজের সঙ্গে সে যথাসময়েই ফিরে এসেছে।
অবস্থাটা আমাদের পক্ষে একটু অস্বস্তির হতে পারত, কিন্তু গৌর চায়ের সঙ্গে টা হিসেবে টোস্ট, ডবল অমলেট আর পাড়ার বিখ্যাত খাস্তা কচুরির লম্বা ফরমাশ দিয়ে সেটা কাটিয়ে দিলে।
ঘনাদাকে এবার আর উসকে দেবার দরকার হল না। বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেন থেকে সোজা কার্ল পাউলো-র প্লেনে গিয়ে উঠলেন আমেরিকার টেক্সাসের ডালাস শহরের এয়ারপোর্টে।
বললেন, ডালাসের এয়ারপোর্টে আমি পাউলোকে দেখে যতখানি বিব্রত, সে আমায় দেখে ততখানি অবাক আর খুশি।
আরে দাস! তুমি এখানে কী করছ?দূর থেকে আমায় দেখেই কাছে এসে পেটে একটা বুলডোজার মার্কা আদরের গুঁতো দিয়ে পাউলো বলল, তোমার সঙ্গে এখানে দেখা হবে ভাবতেই পারিনি।
আমিও পারিনি! পেটের আচমকা তোটার ঠেলা একটু কষ্ট করে সামলে নিয়ে বললাম, তা এখন চলেছ কোথায়?
