অন্ধকার দেখলাম গৌরের কথা শুনে।
ঘনাদার আবদার নোটবই-এ টুকে নিয়ে গৌর ছুটেছিল তার পক্ষীতত্ত্ববিদ কাকার কাছে।
সেখান থেকে ফিরে আসার পর তার মুখের চেহারা দেখেই আমরা সন্ত্রস্ত। ভগ্নদূতের পার্ট করতে হলে তার কাছে কিছু শেখা যায়।
গৌরের মুখে প্রথমে কোনও কথাই নেই।
ব্যাপার কী? —জিজ্ঞাসা করতেই হল উদ্বিগ্ন হয়ে—ঘনাদার পাখি পাওয়া যাবে তো?
না। উত্তর নয়, গৌর যেন একটি হাত-বোমা ছাড়ল।
পাওয়া যাবে না মানে? তবু শেষ আশাটুকু আঁকড়ে ধরে জিজ্ঞাসা করলাম, ঘনাদা বাজে গুল ছেড়েছেন? যা চেয়েছেন সেরকম কোনও পাখি দুনিয়ায় নেই?
না, আছে ও ছিল! গৌরই হেঁয়ালি ছাড়ল।
তার মানে? খিঁচিয়ে উঠতে হল আমাকেই, এখন কী তামাশার সময়?
তামাশা করছি না। গৌর প্রায় করুণ হয়ে বোঝাল—সত্যিই যা বলেছি, তা-ই। উনি যা বায়না ধরেছেন তার একটা পাখি থেকেও নেই, আর অন্যটা এককালে ছিল, কিন্তু এখন নিপাত্তা। দুটোর কোনওটাই তাই জোগাড় করা অসম্ভব।
আমাদের খোঁচাখুঁচিতে এরপর গৌর সবিস্তারে যা বোঝালে তাতে আমরা সত্যিই অকূল পাথারে।
ঘনাদা যে দুটি পাখি চেয়েছেন, তার মধ্যে গুনগুনিয়া বা মেল্লিসুগা হেলেনি নিপাত্তা নয়। দুনিয়ায় এ পাখিটা যথেষ্ট সংখ্যাতেই আছে। তবে আমাদের ভারতভূমিতে তো নয়ই, সমস্ত এশিয়া ইউরোপ আফ্রিকাতেও নেই। এ পাখিটিকে পাওয়া যায় শুধু মাত্র আমেরিকার উত্তর ও দক্ষিণের মাঝামাঝি অঞ্চলে। গুনগুনিয়া এর নামও নয়। দুনিয়ার সবচেয়ে ছোট প্রায় একটা ভোমরার মতো খুদে এ পাখির চলতি নাম হামিংবার্ড। ঘনাদা তাই থেকে গুনগুনিয়া বানিয়েছেন। ঘনাদার দ্বিতীয় পাখিটি কিন্তু দুনিয়াতেই আর আছে কি না সন্দেহ। পাখিটি আমাদের দেশের হলেও আঠারোশো ছিয়াত্তরে শেষ পর্যন্ত একবার নৈনিতালের পাহাড়ি জঙ্গলে পাবার পর আর কেউ এ পর্যন্ত এ পাখি কোথাও দেখেনি। পাহাড়ি লৌয়া নামটাও হয়তো ঘনাদারই দেওয়া। পাখিটি কিন্তু নির্বংশ হয়ে গেছে বলেই মনে হয়।
গৌরের এ বিবরণ শুনে সবাইকে এবার মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়তে হয়েছে।
ঘনাদা যে ল্যাংটি মেরেছেন, তারপর কী আমাদের করা উচিত?
সোজা তাঁকে গিয়ে অবশ্য চেপে ধরতে পারি, আজগুবি অন্যায় আবদার করেছেন বলে।
কিন্তু তাতে নিজেরা গবেট বলে ধরা তো পড়বই, তার ওপর হিতে বিপরীত হতে কতক্ষণ?
তার চেয়ে সেয়ানে সেয়ানে কোলাকুলির প্যাঁচই ভাল। আমরা যে ডাহা উজবুক বনেছি তা বুঝতে না দিয়ে ঘনাদার আবদারটা কোনওরকমে পালটে দেবার ফিকিরে থাকা।
সেই ফিকিরেই তোয়াজ সাধাসাধি ঘুষ কিছু আর বাকি রাখিনি। সেদিন বিকেলেই বনোয়ারির সযত্নে বয়ে-আনা জোড়া কবিরাজি কাটলেটের প্লেট তাঁর হাতে ধরিয়ে বলেছি, মিস্ত্রিদের শনিবারই তা হলে কাজ শুরু করতে বলে দিই? কী বলেন?
শনিবারই কাজ শুরু করতে চাও বুঝি? ঘনাদা কাটলেট জোড়ার সদ্ব্যবহার করতে করতে যেন ভাববার সময় নিয়েছেন।
তারপর চাঁছাপোঁছা প্লেটটি ট্রের ওপর রেখে চায়ের পেয়ালার দিকে হাত বাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করেছেন, তোমাদের সব জোগাড়যন্ত্র হয়ে গেছে বুঝি?
তা একরকম হয়ে গেছে! গৌর অম্লান বদনে বলেছে, একটু শুধু অদলবদল হয়েছে আগের ফর্দের!
অদলবদল! ঘনাদা চায়ের পেয়ালা মুখে তুলতে গিয়ে নামিয়েছেন।
হ্যাঁ। গৌর যেন তাঁর কোঁচকানো ভুরু জোড়া লক্ষ না করেই বলেছে, ওই আপনার গুনগুনিয়া আর পাহাড়ি লৌয়ার বদলে আরও ভাল পাখির ব্যবস্থা করেছি।
আরও ভাল পাখি! ঘনাদার মুখ এক মুহূর্তেই একেবারে আষাঢ়ের মেঘ। জোড়া কাটলেটের খুশির বাষ্পও সেখানে নেই।
কিন্তু এখন সে দিকে কালাকানা না সেজে উপায় কী? গৌর তাই যেন বাহাদুরি জানাতে বলেছে, ভাল বলে ভাল! আপনার ওই গুনগুনিয়ার বদলে তুরপ আনাচ্ছি। মেল্লিসুগা হেলেনির বদলে মুস্কিকাপা পার্ভা।
অনেক কষ্টে কাকার কাছ থেকে মুখস্থ করে আসা নাম দুটো বলে গৌরকে থামতে হয়েছে। ঘনাদার মুখে আর তখন কথাই নেই।
গৌর ততক্ষণে পরের মুখস্থ নাম দুটোও মনে মনে আউড়ে নিয়ে গড়গড় করে বলে গেছে, আর আপনার ওই পাহাড়ি লৌয়ার বদলে আনছি চানক। ওফ্রিসিয়া সুপার সিলিওসার জায়গায় কোটরনিক্স কোরামাণ্ডালিকা।
হুঁ, যেন পাতাল গুহা থেকে আওয়াজ বেরিয়েছে এবার, তা অত কষ্টই বা করা কেন? তোমাদের চিড়িয়াঘরে তোমাদের পাখি-ই থাক। ভালমন্দ কোনও পাখিরই আমার দরকার নেই।
এই থেকে শুরু হয়ে একেবারে ছকবাঁধা ধাপে ধাপে ঠাণ্ডা লড়াই তারপর এগিয়ে গেছে। প্রথমে আমাদের আড্ডাঘরে আসা বন্ধ, তারপর নিজের ঘরে রামভুজকে দিয়ে দুবেলার খাবার আনানো, তারপর বনোয়ারি মারফত বার্তা প্রচার।
হামাকে তো এক গো লরি বন্দোবস্ত কোরতে বোলিয়েছেন বড়াবাবু?
পরের দিন বিকেলে আড্ডাঘরে চা দিতে এসে বনোয়ারির বিহ্বল করুণ অসহায়তা প্রকাশ।
লরি! লরি! কী হবে বড়বাবুর? আমার সন্দিগ্ধ প্রশ্ন। আঃ! লরি কী হবে বুঝলে না? শিবুর জ্ঞান দান—বড়বাবু দুর্জন সংসর্গ ত্যাগ করবেন ঠিক করেছেন।
তা করতে চান করুন। গৌর এবার খাপ্পা—কিন্তু তার জন্য লরি কী হবে? ওঁর যা অস্থাবর তার জন্য একটা টেম্পােও তো লাগে না। টঙের ঘরখানাই উনি লরিতে চাপিয়ে নিয়ে যাবেন নাকি? বেশ, তাই যেন যান, আর যত তাড়াতাড়ি হয়।
রাগের অভিমানের হলকাটা গৌরের মুখ দিয়ে বার হলেও আমাদের সকলের মনের কথাটা তখন এক।
