তা হলে এতবড় একটা কাণ্ড হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও ঘনাদা কিছু টের পাননি কেন?
এরকম দিশাহারা অবস্থায় কী করবেন এখন ঘনাদা এই খাঁ-খাঁ শূন্য পুরীতে?
সেইটেই দেখবার ব্যবস্থা করে রেখেছিলাম।
এবার আর শুধু মনে মনে কল্পনা করা নয়, পুরোপুরি ব্যাপারটা ঘটাবার জন্য যা কিছু দরকার তার কোনওটা বাদ দিইনি। রামভুজ আর বনোেয়ারিকে সাচ্চা ঝুট নানা রকম যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে মাঝরাতেই চুপি চুপি বাহাত্তর নম্বর ছেড়ে রাতটা অন্য কোথাও কাটাতে রাজি করিয়েছি, নীচের রান্নাঘর ভাঁড়ার-খাবার-ঘর সমেত ওপরে বৈঠকিঘর নিয়ে আমাদের সকলের সব কটা ঘরের তালা জোগাড় করবার ব্যবস্থা করেছি আর ঘনাদার নাজেহাল অবস্থাটা স্বচক্ষে দেখবার জন্য নিজেদের মধ্যে লটারি করে একজনকে শেষ তালাটা দিয়ে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যাবার জন্য বাছাই করতেও ভুলিনি।
লটারিতে এ দুর্ভাগ্যটা শিশিরের ওপরই পড়েছে। লটারিতে ফাঁকি আছে বলে গোড়ায় বেশ একটু বেয়াড়াপনা করলেও এ ব্যবস্থা শেষপর্যন্ত শিশিরকে মেনে নিতে হয়েছে। বনোয়ারি আর রামভুজ চলে যাবার পর, আমাদের বাকি সকলকে এক এক ঘরে তালা বন্ধ করে রেখে, শিশির বাইরে কোথাও গিয়ে রাতটা কাটিয়ে সকালে এসে আমাদের খালাস করবে এই হল ব্যবস্থা।
ব্যবস্থাটা একটু অন্যায় বলে মনে হচ্ছে কি?
ঘনাদাকে জব্দ করার দিক দিয়ে একটু হয়তো বাড়াবাড়ি আছে ব্যবস্থাটায়, তবু তার জন্য নিজেদের খুব বেশি দোষ কি দিতে পারি?
যা জ্বালান তিনি জ্বালাচ্ছেন কিছুদিন ধরে তাতে একটু দাওয়াই তাঁকে না দিলে নয়। আর যদি দিতেই হয় তা হলে কোনও কাজ যাতে হবে না এমন জাদুর গায়ে হাত বুলোনো গোছের দাওয়াই দিয়ে লাভ কী! তাঁর ওল যতখানি বুনো, আমাদের তেঁতুলও তাই ততখানি বাঘা।
এমন বাঘা তেঁতুলের ব্যবস্থা করার আগে তাঁর তোয়াজ করতে কি কিছু বাকি রেখেছি? বুঝিয়েছি, মিনতি করেছি, ঘুষও দিয়েছি যতখানি সম্ভব দুটি বেলা, শুধু বাঁকা ঘাড়টা অন্যদিকে একটু হেলাবার জন্য।
কী বাহার ছাদটার হবে দেখবেন, ঘনাদা! শিবু তাঁকে লোভ দেখিয়েছে, দরজা খুলেই দেখবেন যেন ফুলের দেওয়াল। আর তার সঙ্গে কী সব পাখির মিষ্টি ডাক। বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেনে আছেন তাই ভুলে যাবেন।
আর আপনার ভোলা ছাদ ঢাকা তো পড়ছে না। শিশির বুঝিয়েছে, শুধু মিহি তারের জাল দিয়ে সামনেটা ঘেরা থাকবে।
এসব শুনতে শুনতে কী করেছেন ঘনাদা? যেন কানেই যাচ্ছে না এমন ভাবে নিজের গড়গড়ার নলে টান দিতেই তন্ময় হয়ে থেকেছেন?
না। তা থাকেননি বলেই তো মুশকিল। তাঁর কালা বোবা সাজার প্যাঁচ আমাদের। জানা। তা কাটাবার উপায়ও আছে অনেক রকম।
কিন্তু এবার ঘনাদা যে নতুন চালাকি ধরেছেন! যেন উৎসাহভরে খোঁজ নিয়েছেন আমাদের ওই খবরের কাগজের ভাষায় যাকে বলে প্রকল্পের।
ও! ছাদটাকে তোমরা ফুলের বাগান আর চিড়িয়াখানা বানাতে চাও? যেন সরল ভাবেই জিজ্ঞাসা করেছেন, তার জন্য লোহার জাল-টাল দিয়ে সব ঢেকে দেবে?
না, না—সব ঢাকব কেন? আমাকেই মৃদু প্রতিবাদ জানাতে হয়েছে, ওই উত্তরের আলসের ওপর দুটো খুঁটি বসিয়ে তাতে লোহার খানিকটা জাল টাঙাব, আর তার নীচে শুধু একটা লম্বা খাঁচা থাকবে জালের। টাঙানো জালে ফুলের লতা উঠবে আর খাঁচায় থাকবে দুর্গা, টুকটুকি, ফুল-চুকি, মুনিয়া গোছের কটা পাখি।
খুব ভাল কথা! ঘনাদা যেন আগ্রহই দেখিয়েছেন।
আর তখন আমাদের পায় কে? উৎসাহভরে আমাদের পেটে যা ছিল সব কিছু ঘনাদার কাছে উজাড় করে দিয়েছি।
আমাদের ভাগ্যে যে এখন মণিকাঞ্চন যোগ। বলেছে শিশির।
শিবুর এক মামা এসেছেন আলিপুর হর্টিকালচারাল গার্ডেনে কাজ নিয়ে।–আমি ব্যাখ্যা করেছি, আর গৌরের এক কাকা পেয়েছেন শহরে নতুন এক এভিয়ারি খোলার ভার।
এই দুজনের ভরসাতেই আমাদের এই মিনি বাগান বানাবার শখ। বলেছে গৌর।
আর শেষ জোরালো যুক্তিটা জানিয়ে শিবু বলেছে, এমন সুযোগ তো আর রোজ রোজ মেলে না!
ঠিক! ঠিক! ঘনাদা শিবুর যুক্তিতেই যেন পুরোপুরি কাত হয়ে বলেছেন, তা এতই যখন করছ তখন আমারও কিছু সাধ যদি মেটাতে—
মেটাতাম মানে! আমরা সবাই তখন একবারে এক পায়ে খাড়া-বলনো কী। চান? আপনার সাধ তো আমাদের কাছে হুকুম! সবার আগে সে সাধ না মেটালে বাগানই বাতিল।
আমাদের ভক্তির উচ্ছাসেই যেন ভরসা পেয়ে ঘনাদা এবার তাঁর বাসনাটুকু জানিয়েছেন।
বেশি কিছু নয়, একটু যেন দ্বিধাভরেই বলেছেন ঘনাদা, তোমাদের ওই সব পাখির সঙ্গে আমার পছন্দের দুটো পাখি রাখতে বলছি। তার একটার জন্য অবশ্য একটু স্পেশাল জাল লাগবে!
তা লাগুকনা যা লাগবার।–আমরা তাঁকে ঢালাও আশ্বাস দিয়েছি–কোনও ভাবনা নেই আপনার। বাজারের একেবারে সেরা জাল আমদানি করব দেখবেন, এখন পাখি দুটো কী বলুন।
ঘনাদা পাখি দুটোর নাম-গোত্র সব জানিয়েছেন এবার।
একটাকে পাহাড়ি লৌয়া বলতে পারো, ঘনাদা বিস্তারিত পরিচয়ই দিয়েছেন, পোশাকি নাম হল ওফ্রিসিয়া সুপারসিলিওসা, আর অন্যটাকে গুণগুনিয়া বলা যায়, পোশাকি নাম হল, মেল্লিসুগা হেলেনি।
ব্যস, আর কিছু বলতে হবে না। গৌর পকেট থেকে নোটবই বার করে পোশাকি আর ডাক নাম টুকে নিতে নিতে জোর গলায় জানিয়েছে, আগে আপনার পাখির ব্যবস্থা করে তার পরে বাগানের কাজ শুরু।
ঘনাদাকে অত সহজে রাজি করতে পেরে হাতে একেবারে চাঁদ পেয়ে যেদিন নেমে এসেছিলাম, সেইদিনই ঘণ্টা দুয়েক বাদে সবাই চোখে অমন অন্ধকার দেখব তা কি জানতাম!
