শিশির যথারীতি সিগারেটটা ধরিয়ে দেবার পর মৌজ করে দুটো রাম টান দিয়ে শিশিরের বইটা একটু নাড়তে নাড়তে ঘনাদা তাঁর ধাঁধার ব্যাখ্যা শোনালেন নাটকীয়ভাবে।
ধাঁধাটা কী? সেনাপতি ঘোর জঙ্গলে ঢুকিয়ে দিয়ে দিলেন পথ হারিয়ে, মন্ত্রী খুঁজে খুঁজে গাছ কাটলেন ভোঁতা কুড়ুলে। তাতে শুধু বদগন্ধই ছড়াল, কাজ হল না কিছু। তখন রাজা এসে জঙ্গল জ্বালিয়ে উনুন পেতে বসাতেই সব সমস্যা মিটে গেল। এ ধাঁধার মোদ্দা মানে শুধু এই যে তোমার যা রোগ এখন তাতে সেঁক নেওয়া দরকার।
সেঁক? কীসের সেঁক? আমাদের সকলেরই হতভম্ব প্রশ্ন।
রাজা যা জ্বালিয়ে উনুন পেতে বসালেন সেই জঙ্গলের মতো গোলমেলে মস্ত প্রকাণ্ড কিছুর। ঘনাদা বোঝালেন, যে জঙ্গলে ঢুকে ব্যাধি শুরু, ছাড়া ছাড়া ভাবে সামলাতে গিয়ে যা রোগ বাড়িয়ে দিয়েছে, সেই গোটা জঙ্গলই চেলাকাঠ করে উনুনে দিয়ে তার সেঁক নিতে হবে। পারবে তা নিতে?
প্রশ্নটা শিশিরকে করলেও আমরা সবাই নিজেদর সম্মতি আর উৎসাহ জানালাম— পারবে না মানে! নিশ্চয়ই পারতে হবে। এত বড় রোগ বলে কথা!
কিন্তু সেঁকটা নেব কী জ্বালিয়ে? শিশিরের বিমূঢ় জিজ্ঞাসা।
কী জ্বালিয়ে নেবে? দাঁড়াও, দাঁড়াও, ঘনাদা যেন তৎক্ষণাৎ আকাশ-পাতাল সব খুঁজে নিয়ে বললেন, একটা খুব মোটা ঢাউস বই হলে হয়। বই মানেই তো জঙ্গল। তা তোমার এই বৃহৎ চিকিৎসা বারিধিটাই সবচেয়ে ভাল।
ওই বই! শিশির আপনা থেকেই একটু শিউরে উঠে বললে, কিন্তু ও বই যে—
কিন্তু টিন্তু কিছু নয়, ঘনাদা তাকে প্রায় ধমকে থামিয়ে দিলেন, ওই বই-ই তোমার জঙ্গল। ভাল চাও তো পুড়িয়ে সেঁক নাও আজই।
ঘনাদা আর এ ঘরে থাকলেন না। গট গট করে ওপরে নিজের টঙের ঘরে চলে গেলেন, শিশিরের সিগারেটের টিনটা অবশ্য সঙ্গে নিয়ে।
শিশির সেদিকে চেয়ে একটু দ্বিধাভাবে বললে, আচ্ছা, এটা কি সত্যি ওই জুদশির বিধান?
আলবত জুদশির বিধান? আমরা সমস্বরে তাকে আশ্বস্ত করলাম, ধাঁধার নমুনা দেখেই বুঝতে পারলি না, একেবারে খাঁটি নির্ভেজাল জুদশি!
জুদশির বিধান অব্যর্থ। শিশিরের সব রোগ সেরে গিয়েছে।
পু:—ঘনাদার মারাত্মক ঝুঁ-এর ম্যাজিক বড়িটা কীসের, সে রহস্যভেদ কিন্তু শেষ পর্যন্ত হয়নি। ঘনাদাকে আড্ডাঘরে পেয়ে সেদিন আমি বলেছি, ওটা বড়ি নয়, ক্যাপসুল। অ্যামোনিয়া কারবোনেট, মানে স্মেলিং সল্ট-এ ভরা। ঘনাদা মুখে নিয়ে দাঁতে কেটে বলীবদের মুখে ফুঁ দিয়ে ওটা ছিটিয়েছেন।
না, শিবু আমার থিওরি নস্যাৎ করে দিয়ে বলেছে, ওটা ক্যাপসুল, তবে স্মেলিং সল্ট-টল্ট নয়। শুকনো ধানি লঙ্কার গুঁড়োয় ভরা। না ঘনাদা?
ঘনাদা জবাব না দিয়ে ঈষৎ হেসে তাঁর টঙের ঘরের দিকে চলে গেছেন।
ন্যাড়া ছাদের সিঁড়িতে তাঁর পায়ের শব্দ পাবার পর গৌর বলেছে, ও কিছু নয়, স্রেফ হ্যালিটোসিস।
বেড়াজালে ঘনাদা
চিলের ছাদে কীসের আওয়াজ?
কীসের আর, একজোড়া বিদ্যাসাগরি চটির।
বিদ্যাসাগরি চটির আওয়াজ তারপর চিলের ছাদের ওপর থেকে খোলা সিঁড়ি বেয়ে দোতলায়।
চটির আওয়াজ গোড়ার দিকে যা ছিল, নীচে নামবার সঙ্গে সঙ্গে তার চেয়ে আস্তে হয়ে আসবে।
বারান্দায় এসে তা একেবারে থেমে যাবে কি?
না। একেবারে থামবে না, তবে এখন আওয়াজটা হবে যেমন নিচু তেমনই আবার আস্তে। সে চটাপট চটাপট আর নেই, এখন ক্ষীণ একটু চট, এরপর পটটা অনেক দেরি করে শোনা যাবে।
কেউ যেন থতমত খাওয়া পা দুটো কেমন হতভম্ব হয়ে কোনও রকমে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
বিদ্যাসাগরি চটি-পরা হতভম্ব হয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া পা জোড়া কার?
তা কি আবার বলে দিতে হবে?
হ্যাঁ, বুঝতে যা কারও বাকি নেই ব্যাপারটা তাই—ও বিদ্যাসাগরি চটি-পরা পা জোড়া স্বয়ং ঘনাদার।
তা, তিনি তাঁর টঙের ঘর থেকে বেরিয়ে ছাদের খোলা সিঁড়ি দিয়ে নেমে বারান্দায় এসে অমন থতমত খাবেন কেন? আর তারপর কেমন হতভম্ব হয়ে যেন পা টেনে টেনে যাওয়ার কারণই বা কী?
কারণ গুরুতর। ঘনাদা ভোরবেলা উঠে তাঁর নিজের রুটিনমাফিক সব কিছু করার মধ্যে তেমন খেয়াল হয়তো না করতে পারেন, কিন্তু টিকে ধরিয়ে তামাকটি সেজে তাতে সুখটান দেবার জন্য তৈরি হয়ে বেশ একটু অবাক হবেন।
তাঁর তামাক সাজা শেষ হবার আগেই তো বনোয়ারি বাহাদুরের ভালমন্দ কিছু সমেত ধূমায়িত চায়ের পট পেয়ালার ট্রে নিয়ে হাজির হবার কথা। এখনও তার দেখা নেই কেন?
একটু খেয়াল করার পর নীচেটা কেমন যেন ঠাণ্ডা বলেও মনে হবে। সকালবেলার নিয়ম মাফিক সাড়া-শব্দ যেন পাওয়া যাচ্ছে না।
আরও মিনিট কয়েক ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে ঘনাদাকে চিলের ছাদে বেরিয়ে আসতে হবে। সেখান থেকে গম্ভীর গলায় ডাকও দিতে হবে বনোয়ারি বলে।
তাতেও কোনও সাড়া মিলবে না।
এবার বেশ একটু চিন্তিত হয়ে ঘনাদাকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে হবে আশ্চর্য ব্যাপারটার খোঁজ নেবার জন্য।
সিঁড়ি দিয়ে বারান্দা পর্যন্ত নামবার পরই কিন্তু চক্ষুস্থির।
বৈঠকিঘরের দরজা বন্ধ শুধু নয়, তার কড়ায় মজবুত একটা তালা এঁটে ঝোলানো।
এই দৃশ্য দেখবার পর হতভম্ভ হয়ে পা টেনে চলার আর অপরাধ কী? ঘনাদা ওই অবস্থাতেই সমস্ত বারান্দাটা পার হয়ে নীচে রান্না আর খাবারঘর পর্যন্ত ঘুরে আসবেন নিশ্চয়।
সব দরজায় তালা ঝুলছে, মায় রান্না ভাঁড়ার খাবারের ঘরে পর্যন্ত।
কী হল হঠাৎ বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেনের? রাতারাতি কোনও যখ কি জিন ভোজবাজিতে সবাইকে উড়িয়ে নিয়ে গেছে নাকি? হঠাৎ মাঝরাতের কোনও হামলার ভয়ে সবাই একসঙ্গে বাড়ি ছাড়া? .।
