ক-বার অমনি পা ঠুকেই শিং বাগিয়ে মেল ট্রেনের মতোই সে ছুটে এল আমার দিকে।
ঘনাদা আবার একটু থামলেন।
কী করলেন তখন? আমাদের মধ্যে শিশিরই সব চেয়ে উগ্রীব, ওই এসতোক যাহোক একটা তুলে নিলেন তো?
না। সত্যাশ্রয়ী ঘনাদা যেন বাধ্য হয়েই স্বীকার করলেন, এসতোক কি বল্লম কিছুই তুললাম না। ও গোহত্যা আমার কাজ নয়।
তা হলে? আমরা উৎকণ্ঠিত।
গাম্বার জন্য আনা সেই গুলিটা পকেট থেকে বার করে মুখে দিলাম। ষাঁড়টা তখন একেবারে সামনে এসে বাগানো শিং জোড়া তুলতে যাচ্ছে। তার মুখের ওপর বুকের সমস্ত নিশ্বাস জমা করে সজোরে দিলাম এক ফুঁ!
ফুঁ দিলেন! আমাদের চোখ ছানাবড়া।
হ্যাঁ, শুধু ফুঁ সবিনয়ে বললেন ঘনাদা, তাইতেই ধেই নৃত্য করতে করতে মাটিতে মুখ ঘসবার চেষ্টায় তার কী আছাড়িপিছাড়ি। আমার ভয়ের আর তখন কিছু নেই, কিন্তু শিং বাগিয়ে চড়াও হবার পর আমার ফুঁ দেবার আগেই আমার লাল শালুর বান্ডিলের এক খাবলা সে যে কামড়ে তুলে নিয়েছে।
সমস্ত অ্যারিনার লোক যেন তখন পাগল হয়ে গিয়েছে উত্তেজনায়। ষাঁড়ের খাবলানো পুঁথির ভাগ আর উদ্ধার করবার নয় বুঝে যেটুকু পেরেছি তাই নিয়েই আমি সেই হট্টগোলের মধ্যে সরে পড়বার পথ খুঁজছি।
প্লাজার আর কেউ তা গ্রাহ্য না করুক, চেয়াক গাম্বো তাতে চুপ করে থাকতে পারে! মরিয়া হয়ে আমায় ধরবার জন্য সে-ও লাফিয়ে পড়েছে লড়াইয়ের মাঠে।
আর তাতেই হয়েছে সর্বনাশ। মাটিতে নাক-মুখ ঘসবার চেষ্টা করেই ষাঁড়টা আমার ফু-এর ধাক্কা খানিকটা তখন সামলে উঠেছে। গাম্বোকে ওভাবে লাফিয়ে পড়তে দেখে সে একেবারে প্রলয়ের বাহন।
একটা ছুট, একটা চিৎকার আর সেই সঙ্গে একেবারে এফোঁড় ওফোঁড় শিংয়ের গুঁতো।
প্লাজা ভরতি সমস্ত দর্শকই তখন দিশাহারা হলেও কর্তব্যে ত্রুটি কর্তাদের হয়নি। ওই হট্টগোলের মাঝে অ্যাম্বুলেন্সকে গাম্বোর দিকে ছুটে যেতে দেখে তুমুল গোলমালের সুযোগে মাঠ থেকে বেরিয়ে এসেছি। জুদশির পুঁথির অনেকখানিই সেই খুনে ষাঁড়ের পেটে গেছে, কিন্তু যা বেঁচেছে তাও বড় কম নয়। সেই অমূল্য জিনিস নিজের কাছে আর রাখিনি। যে মুলুকের জিনিস, সেই মঙ্গোলিয়ার উলানবাটারে নিয়ে সবটাই জমা করে দিয়ে এসেছি। ও তা হলে? শিশিরকে একটু বেশি ভাবিত মনে হল, সে জুশি তো এখন নাগালের বাইরে। আপনি তো ভাল করে পড়েও দেখেননি।
তা কি আর দেখিনি? ঘনাদা শিশিরের ভুল ভাঙলেন। – পড়েছেন? শিশির অত্যন্ত উৎফুল্ল। কিন্তু যা পড়েছেন তা কি আর মনে আছে?
মনে থাকবে না কেন? ঘনাদা যেন এরকম সন্দেহে অপমানিত। গোটা পুঁথিতে চোদ্দো হাজার আর আমার ওই ভেঁড়াটায় ন-হাজার শ্লোক মাত্র।
মাত্ৰ ন-হাজার? ঘনাদার স্মৃতিশক্তির এই যৎকিঞ্চিৎ নিদর্শনে আমাদের মুহ্যমান গলা দিয়ে ওই বিহ্বল উচ্চারণটুকু বার হল।
হ্যাঁ, ন-হাজারের বেশি নয়। ঘনাদা একটু বিশদ হলেন, তবে মানে না বুঝে শুধু মুখস্থ করে লাভ কী? সেই মানে বোঝাই দায়—
কেন? কেন? আমাদের ব্যাকুল প্রশ্ন, ভাষা খুব শক্ত বুঝি!
ভাষা তো বটেই, তার চেয়ে বেশি কঠিন ভাব। ঘনাদা ব্যাখা করলেন, সব জটিল ধাঁধায় লেখা কিনা।
সব ধাঁধায় লেখা? আমাদের বিস্মিত কৌতূহল!
কীরকম ধাঁধা শুনবে? ঘনাদা সদয় হয়ে উদাহরণ দিলেন, এই একটা শোলোক গদ্যে বলছি শোনোখারাপ আওয়াজের রোগ। তার জন্য সেনাপতির কাছে যেতে তিনি দিলেন লুক-মিক। রোগ কিন্তু সারল না। তখন চাবুক হাতে রাজা যেই এসে দাঁড়ালেন অমনই রোগ গেল পালিয়ে।
এই আপনার জুদশির ধাঁধার নমুনা?—হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞাসা করতে হল—এ ধাঁধার আবার মানে আছে?
তা আছে বইকী! ঘনাদা আমাদের অজ্ঞানতিমির ঘোচালেন—রোগটা হল বাচ্চাদের চোখ দিয়ে জল পড়া। বুরিয়াতিয়ায় কি মঙ্গোলিয়ায় ও রোগ বোঝাবার শব্দটা বেশ বিদঘুটে। তাই তাকে বলা হয়েছে খারাপ আওয়াজের রোগ। আর লুক-মিক হল ভেড়ার লোমের মতো কোঁকড়ানো পাপড়ির তিব্বতি এক জাতের চন্দ্রমল্লিকা। বাচ্চাদের চোখের জল পড়া ওই চন্দ্রমল্লিকার পাপড়ির রস দিলে সারে। তবে সঙ্গে কড়া অনুপান চাই। সেনাপতি শুধু লুক-মিকই বিধান দিয়েছেন। তাতে সারেনি, কিন্তু চাবুক হাতে রাজা মানে আরও কড়া অনুপান মেশাতেই ওষুধ অব্যর্থ হয়ে গেল।
তা হলে? আমরা বিহ্বলভাবে জানতে চাইলাম, শিশিরের অসুখের কথায় সেদিন ধাঁধা মতো যা শুনিয়েছিলেন তা আপনার ওই জুদশি থেকেই নেওয়া? শিশিরের রোগের নিদান-বিধান ওরই মধ্যে লুকোনো আছে?
তা আছে বই কী! বলে ঘনাদার উঠবার উপক্রম দেখে শিশিরই তাঁকে সবচেয়ে ব্যস্ত হয়ে থামিয়ে প্রথম মিনতি জানালে, ও ধাঁধাটার যদি একটু ব্যাখ্যা করেন।
ব্যাখ্যা করতে বলছ? ঘনাদা কেমন একটু উসখুস করে এদিক ওদিক চেয়ে বললেন, কিন্তু কী জানো।
ঘনাদাকে তাঁর বাক্যটি আর শেষ করতে হল না। শিশিরই তার আগে প্রায় লাফ দিয়ে উঠে পড়ে বললে, একটু বসুন! আমি এখুনি আপনার সিগারেট আনছি। এই যাব আর আসব।
শিশির তখুনি এক লাফে ঘরের বাইরে।
শোনো! শোনো! ঘনাদা পিছু ডাকলেন, সিগারেট তো আনছ সেই সঙ্গে তোমার ওই কী চিকিচ্ছের বই, কী বারিধি না কী, সেটাও নিয়ে এসো একবার।
সেটাও আনব?—শিশির একটু অবাক হয়েই ওপরে চলে গেল। আমরাও তাই।
শিশিরের সিগারেট আনতে দেরি হল না। প্যাকেট-ট্যাকেট নয়, একেবারে আনকোরা সিগারেটের টিন। অসুখের বাতিকে খাওয়া ছেড়ে দিলেও ঘর থেকে বিদেয় করতে পারেনি। টিনের সঙ্গে বৃহৎ চিকিৎসা বারিধি বইটাও শিশির এনেছে।
