ষাঁড়ের লড়াই দেখা গাম্বোর এক প্রচণ্ড নেশা। প্লাজা দে টোরোস-এ যে-কোনও একটা লড়াই থাকলেই হল। সে একেবারে সামনের দামি সিটের টিকিট কিনে খেলা দেখবেই।
দূর থেকে তার সব চাল-চলন লক্ষ করে যে সুযোগ খুঁজছিলাম তাই একদিন আশাতীতভাবে এসে গেল।
বড় জবর ষাঁড়ের লড়াই-এর দিন সেটি। সারা স্পেনের সব চেয়ে খুনে ঘরানার সেরা একটি ষণ্ড টোরিল মানে লড়াকু ষাঁড়েদের খাঁচা থেকে খেলার মাঠে বেরিয়ে এসেই একেবারে লন্ডভণ্ড কাণ্ড বাধিয়ে দিয়েছে।
প্রথম চার-চারটি পিকাডোরের ঘোড়ার পেট ফাঁসিয়ে খতম করার পর দুজন পিকাডোরকেই হাসপাতালে পাঠিয়ে সে তিন-তিনজন ব্যান্ডেরিলেরোস আর জনা-পাঁচেক চুলো-কে আতঙ্কে মাঠছাড়া করেছে। তারপর স্বয়ং এসপাদা অর্থাৎ সবার ওপরে ষণ্ড বীরের যা অবস্থা করেছে, তা আর বলার নয়।
এ সাংঘাতিক ষাঁড় আবার শুধু শিং দিয়ে গুঁতোয় না, দাঁত দিয়ে কামড়েও দেয়।
সেরা এসপাদার সব জারিজুরি ভেঙে সে তো দিয়েছেই, যে লাল রেশমি নিশান নাড়ার কেরামতিতে এসপাদারা ষাঁড়েদের নাচিয়ে খেলিয়ে খেপিয়ে হয়রান করে, সেই মুলেট্টাই কামড়ে কেড়ে নিয়ে টুকরো টুকরো করেছে। মাটিতে ফেলে পায়ের খুরে দিয়েছে তেলে।
মানের দায়ে এসপাদাকে এবার মুলেট্টা ছাড়া শুধু এসতোক মানে খাটো তলোয়ার নিয়েই এসতোকাদা মানে মরণঘা দেবার জন্য এ সর্বনাশা ষাঁড়ের মহড়া নিতে হয়েছে।
কিন্তু এ ষাঁড় যেন স্বয়ং যমরাজের বাথান থেকে আমদানি মহাকালের বাহন।
সেভিলের সেরা মাটাডোর, অমন পাঁচ-দশ গণ্ডা খুনে ষাঁড়কে একেবারে নিখুঁত এসতোকাদা মানে ঘাড়ের ঠিক পেছনে এক মোক্ষম মারে হৃৎপিণ্ড পর্যন্ত খাটো তলোয়ার গেঁথে দেওয়ার বাহাদুরিতে যে কাবার করেছে, তারই টিপ দিয়েছে ভণ্ডুল করে ওই সৃষ্টিছাড়া ষাঁড়। তারপর শিং-এর এক ঝাঁকানিতে এসপাদার হাতের এসকে খসিয়ে তাকে প্রাণের দায়ে ছুটিয়েছে এধরনের বিপদ ঠেকাবার লড়াইয়ে ময়দানের ধারের বেড়ার ওপারে।
সমস্ত প্লাজা দে টোরোস-এ তখন একেবারে হুলুস্থুল হই রই কাণ্ড। এসপাদা-তাড়ানো সাক্ষাৎ মহাকালের বাহন দুই ধারালো শিং উঁচিয়ে এদিক ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছে আর চারদিকের দর্শকরাও উত্তেজনায় অস্থির হয়ে যেন খ্যাপার মতো চেঁচামেচি করছে।
এমন একটি মওকা আমারও আশাতীত ছিল। দর্শকদের এই উন্মত্ত উত্তেজনার মধ্যে ওপরে আমার সস্তা টিকিটের গ্যালারি থেকে আমি অবাধে নেমে এসেছি নীচে একেবারে লড়াইয়ের মাঠের ওপরেই ঝোলানো গাম্বোর দামি গ্যালারিতে।
সে তখন উত্তেজনায় দিশাহারা, আর সকলের মতো হাত-পা ছুড়ে এসপাদাকে গাল দিয়ে ষাঁড়টাকে বাহবা দিচ্ছে।
বেশি কষ্ট করতে হয়নি। তার বগলের শালু মোড়া বান্ডিলটা একটু আলগাভাবেই ধরা ছিল। এই অবস্থায় ব্যবহার করবার জন্য যে ম্যাজিক বড়িটা পকেটে এনেছিলাম সেটা মুখে দিতে হয়নি। এক হেঁচকা টানে বান্ডিলটা কেড়ে নিয়ে ছুটে পালাবার চেষ্টা করেছি তার পর।
কিন্তু পালাব কোথায়? উত্তেজনায় উন্মত্ত দর্শকের ভেতর দিয়ে পথ পাওয়াই শক্ত। এক মুহুর্তের জন্য হকচকিয়ে গিয়ে গাম্বো তখন চিৎকার করতে করতে আমার পেছনে তাড়া করেছে। একা তার হাত থেকে পালানো হয়তো শক্ত হত না। কিন্তু পেছনে সে আর সামনে ওপরে চেয়ে দেখি তারই ভাড়াটে পাহারাদার ক-জন যমদূতের মতো আমার দিকে এগিয়ে আসছে।
এ সংকটে একমাত্র যা করবার তাই করতে হল।
কী করলেন আপনি? ধরা দিলেন? ঘনাদা দম নিতে একটু থামবার পর শিশিরেরই প্রথম উদ্বিগ্ন প্রশ্নে হাওয়া একটু ঘুরছে বলেই আশা হল।
না, না, ধরা দেবেন কী? চাকাটা চালু রাখলাম আমি, ঘনাদা ওই যে কী বড়ির কথা বলছিলেন—সেইটি বোমার মতো ছাড়লেন।
যেমন তুমি আহাম্মক? শিবু খিঁচিয়ে উঠল, সে তো মুখে দেবার বড়ি! মুখে দেবার বড়ি কখনও বোমা হয়?
ওসব কিছু নয়, গৌর পরম বিজ্ঞের মতো বললে, ঘনাদা একমাত্র যা ওই অবস্থায় করা যায় তা-ই করলেন। অর্থাৎ লাল শালুর পুঁটলিটি ফেরত দিলেন গাম্বোকে। গাম্বোর হদিস যখন মিলেছে তখন একদিন তার হাত থেকে ওবান্ডিল উদ্ধার করবার সুযোগ হবেই। তার জন্যে বেফায়দা বেঘোরে প্রাণটা তো আর দেওয়া যায় না। তাই না, ঘনাদা?
না। ঘনাদা সত্যের খাতিরে যেন বলতে বাধ্য হলেন, যা বললে তার কোনওটাই নয়। ওই বান্ডিল নিয়ে নীচের অ্যারিনাতেই লাফিয়ে পড়লাম।
লাফ দিলেন নীচে! আমরা স্তম্ভিত।
ওই সাক্ষাৎ শমন যেখানে শিং বাগিয়ে ওত পেতে আছে সেইখানে? আমাদের গলা যেন বুজে আসছে আতঙ্কে।
হ্যাঁ। নিরুপায় ভঙ্গিতে বললেন ঘনাদা, সেই শিং বাগানো শমনের কোটের মধ্যেই ঝাঁপ দিয়ে পড়লাম। সমস্ত প্লাজা দে টোরোস তখন উত্তাল হয়ে উঠেছে উত্তেজনায় উল্লাসে। চিৎকার করে রুমাল স্কার্ফ নেড়ে চারদিক থেকে সবাই আমায় উৎসাহ দিচ্ছে। কেউ ফ্রানসিসকো রোমেরোর নাম করছে, কেউ এল সিড বলে চেঁচিয়ে ডন রোডরিগো দিয়াজ দে ভাইভার-এর পুরো নামটাই উচ্চারণ করছে।
আমার হাতে শুধু ওই লাল শালুর বান্ডিল ছাড়া বল্লম কি এসতোক কিছুই নেই। কিন্তু সে ভাবনা আমায় ভাবতে দিলে না গোটা প্লাজা দে টোরোসের দর্শকেরা। মুহূর্তের মধ্যে ঝপ ঝপ করে চারদিক থেকে অমন গোটা দশেক বল্লম আর খাটো তলোয়ার আমার সামনে এসে পড়ল।
ষাঁড়টা তখন কিছু দূরে দাঁড়িয়ে ফোঁস ফোঁস করে আগুনের হলকার মতো নিশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে ফেনা-মাখানো মুখে আমার দিকে চেয়ে পায়ের খুর মাটিতে ঠুকছে।
