গোড়ার দিকেই একদিন অবশ্য একটু শিক্ষা দিতেও হয়েছিল।
তখন আমার জুদশি পুঁথি সংগ্রহ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। কয়েকটা পাতা শুধু বাকি। সে পাতাগুলো পাবার নয় জেনে আর কটা দিন মাত্র একটু চেষ্টা করেই পুঁথিটা উলানবাটারে নিয়ে যাব বলে তখন ঠিক করে ফেলেছি।
ঠিক সেই সময়ে একদিন রাত্রে হঠাৎ কী একটা খসখস শব্দ শুনে বিছানায় উঠে বসতে হল। উঠে বসে টর্চটা জ্বেলে অবাক হয়ে দেখি চেয়াক গাম্বো আমার তাঁবুতে ঢুকে আমার পিঠে বেঁধে চলার নিজস্ব ঝোলাটা হাঁটকাচ্ছে।
আমায় টর্চ জ্বেলে তাকে লক্ষ করতে দেখে বিন্দুমাত্র সে ঘাবড়াল না। যেমন। ঝোলা হাঁটকাচ্ছিল তেমনই হাঁটকাতে হাঁটকাতে অম্লান বদনে বললে—আপনার তাঁবুতে একটা ইঁদুর ঢুকে কী কাটছে মনে হল। তাই একটু দেখতে ঢুকলাম।
খুব ভাল করেছ। টর্চটা জ্বেলে রেখেই বললাম, তবে ভুল করেছ একটু। যেটা ইঁদুর ভেবেছ সেটা ইঁদুর নয়, ছুঁচো।
ততক্ষণে জুদশির পুঁথির লাল শালু মোড়া তাড়াটা সে বার করে ফেলেছে। সেটা বগলদাবা করে ঝোলাটা ফেলে দিয়ে সে বললে, ইঁদুর নয়, ছুঁচো ঢুকেছে বলছেন। তা হতে পারে। তবে সাবধানের বিনাশ নেই। পুঁথিটা এখন থেকে আমার কাছেই রাখা ঠিক করলাম।
তাই নাকি! খুব ভাল! আমি খুশি হয়ে বললাম, একটা বড় দায় থেকে আমায় বাঁচালে।
আপনাকে আরও একটা দায় থেকে বাঁচিয়েছি। আমায় বাধিত করার সুরে বললে চেয়াক গাম্বো, আপনাকে পিস্তল-টিস্তল আর ছুঁতে হবে না। বড় বেয়াড়া জিনিস কিনা! কখন হাত ফসকে কী হয়ে যায় তার ঠিক নেই। আপনার পিস্তলটা বালিশের তলা থেকে তাই আগেই সরিয়ে নিয়েছি।
শুধু পিস্তলটাই নিয়েছ তো আর—বলে হঠাৎ থেমে গেলাম থতমত খেয়ে।
আর–বলে থামলেন কেন? গাম্বো ভুরু কুঁচকে একটু সন্দিগ্ধ ভাবে জিজ্ঞাসা করলে, কী, বলছিলেন কী!
না, ও কিছু নয়। আমি যেন তাড়াতাড়ি কথাটা চাপা দিতে চাইলাম।
গাম্বো কিন্তু নাছোড়বান্দা। গলা চড়ালেও বেশ অস্বস্তির সঙ্গে ধমক দিয়ে জিজ্ঞাসা করলে, কথা চাপবার চেষ্টা করবেন না। আর কী বলতে যাচ্ছিলেন বলে ফেলুন।
অত্যন্ত অনিচ্ছার সঙ্গে যেন বাধ্য হয়েই একটু থেমে থেমে বললাম, বলছিলাম যে, বালিশের তলার পিস্তলটাই শুধু নিয়েছ আর বালিশের ওয়াড়ের মধ্যে ঢোকানো বেরেটাটা–
ব্যস, ওইটুকুতেই কাম ফতে! বালিশের ওয়াড়ের ভেতর লুকোন বেরেটার নামে সেদিকে চাইতে গিয়ে দু সেকেন্ডের একটু অন্যমনস্কতার মধ্যেই গাম্বো ডিগবাজি খেয়ে ছিটকে তাঁবুর ধারে গিয়ে ঘাড়মুড় গুঁজে পড়ল। দু সেকেন্ডের ফাঁকে কংফুর একটি মোক্ষম লাথিতেই সে তখন কোঁকাচ্ছে।
সেখান থেকে চুলের মুঠি ধরে তুলে একটা ঝাঁকানি দিয়ে বললাম, বলো, এবার কী বলার আছে এখন।
চেয়াক গাম্বোর সে কী কান্না তখন না, না, আমার আর কিছু বলবার নেই। আপনি আমায় কড়া শাস্তি দিন, কিছুতেই ক্ষমা করবেন না এই শুধু আমার মিনতি।
তবু ক্ষমাই তাকে করলাম, আর বললাম, এরপর আর বেইমানি করার চেষ্টা করলে তাকে আরও নতুন বেরেটা দেখিয়ে দেব।
বেইমানি সে তবও করল। কখন কোন ফাঁকে আমার মুখ বাঁধা জলের থলেতে বাইরে থেকে মিহি ইনজেকশনের ছুঁচে বিষ ঢুকিয়ে আমায় অজ্ঞান করে ফেলে আমার জুদশির পুঁথি নিয়ে হাওয়া হয়ে গেল একদিন।
আমাকে অজ্ঞান করার পর একেবারে খতম করেই সে যেত, কিন্তু তখন দূরবিনে আর-এক কাফিলাকে আমাদের তাঁবুর দিকেই আসতে দেখে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যা পেয়েছে তাই নিয়েই আমার উটটি নিয়ে সে চম্পট দেয়।
অজানা কাফিলার লোকজন আসাতেই অবশ্য সে যাত্রা আমার প্রাণ বাঁচে, কিন্তু গাম্বো তখন একেবারে পগার পার।
তারপর ছটি মাস ধরে গাম্বোকে ধরবার জন্য সারা দুনিয়া প্রায় চষে ফেলেছি বলা যায়। নিউইয়র্ক থেকে সানফ্রানসিসকো, টোকিও থেকে লন্ডন, প্যারিস থেকে রিও দ্য ঝানেরো—কোথাও খুঁজতে আর বাকি রাখিনি। হদিস কিন্তু কিছু মেলেনি।
ছ মাসের মধ্যে জুদশির চুরি করা পুঁথির কোনও ব্যবস্থা সে করতে পারেনি বলেই আমার তখন বিশ্বাস। তা সে করতে পেরে থাকলে জুদশির মতো দামি ও বিরল জিনিসের চোরা বাজারে একটু কানাঘুষা শোনা যেতই। সুতরাং গাম্বো যে কোথাও ঘাপটি মেরে থেকে সুযোগের অপেক্ষা করছে এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু আমাকে ফাঁকি দিয়ে সে এমন হাওয়া হয়ে গেল কী করে?
আমার মাথাতেও যা আসবে না এমন কোনও মহলে সে নিশ্চয় গা-ঢাকা দিয়ে আছে। সে জায়গা কীরকম হতে পারে ভাবতে ভাবতে হঠাৎ করিডা মানে এই ষাঁড়ের লড়াই-এর জগতের কথা মনে পড়েছে। এ খেলা আমি ঘৃণা করি, তাই সে মহলে খোঁজ করার কথা আমি ভাবতেই পারিনি এতদিন।
ওই জগৎটাই তা হলে এখুনি খুঁজে দেখা দরকার বুঝেছি। খোঁজা সফলও হয়েছে প্রথম চেষ্টাতেই। চেয়াক গাম্বো সেভিলের প্লাজা দে টোরোস মানে ষাঁড়ের লড়াই-এর ঘাঁটির মহলেই নিজেকে নিপাত্তা করে রেখেছে।
সন্ধান পেলেও তাকে বাগে পাবার মতো সুযোগ সহজে মেলবার নয়। আমি একটু দূরে দূরে থেকে তার ওপর সব সময়ে নজর রাখি।
একটি বড় সুবিধের ব্যাপার এই যে, গাম্বো কোথায় তার চোরাই পুঁথি লুকিয়ে রেখেছে তা খুঁজে বার করতে আমায় হয়রান হতে হবে না। কখন কী অবস্থায় সরে পড়তে হবে ঠিক নেই বলে গাম্বো সে পুঁথি কখনও হাতছাড়া করে না। আমার সেই লাল শালু মোড়া বান্ডিলেই সারাক্ষণ সেটি সঙ্গে নিয়ে ফেরে।
