তা হলে? শিশির তার আসল প্রশ্নটা এবার তুললে, ওই একটি ছাড়া জুদশির গোটা পুঁথি আর যখন নেই তখন আপনি জুদশি জুশি করে অত আদিখ্যেতা করছেন কেন? আর নিদান বিধানই অত পাচ্ছেন কোথা থেকে?
কোথা থেকে পাচ্ছি?ঘনাদা সব ধৃষ্টতা ক্ষমা করার হাসি হেসে বললেন, পাচ্ছি। খাঁটি জুদশি থেকেই। গোটা না থাক, আর একটা কাটা-ছেঁড়া পুঁথি ছিল।
আরেকটা পুঁথি ছিল! আমরা উৎসাহিত হতে গিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলাম, কোথায় সে পুঁথি? আপনার কাছে তো নেই বললেন!
না, আমার কাছে নেই। ঘনাদা অকপটভাবে স্বীকার করলেন। তার কিছুটা আছে মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলানবাটার খোটোর জাদুঘরে আর বাকিটা স্পেনের সেভিলের এক ষাঁড়ের পেটে।
ষাঁড়ের পেটে!–আমরা একটু সন্দেহ নিয়েই ঘনাদার দিকে চাইলাম। সন্দেহ ঘনাদার সত্যবাদিতায় নয়। তিনি তুচ্ছ সব সত্যের নাগালের বাইরে বলেই আমরা মেনে নিয়েছি। এবারের সন্দেহটা তাঁর সামলাবার ক্ষমতা সম্বন্ধে। এবার তিনি একটা কড়া ফরমাশ নিজেকে দিয়ে ফেলেননি কি? মঙ্গোলিয়া-তিব্বত-বুরিয়াতিয়ার বিরলতম গুপ্ত পুঁথির খানিকটা সেভিলের ষাঁড়ের পেটে ঢুকিয়ে শেষরক্ষা কি করতে পারবেন?
ঘনাদা কিন্তু অকুতোভয়। অর্ধনিমীলিত চোখে যেন সেই পুরনো স্মৃতির পাতায় তন্ময় হয়ে বললেন, হ্যাঁ, সেভিলের ষাঁড়, যেমন তেমন ষাঁড় নয়, আন্দালুসিয়ার অদ্বিতীয় ষণ্ড-বিশারদ ডিউক অফ ভেরাগুয়ার সেরা ভাকাদ্দা-র সবচেয়ে বড় ঘরানার ষাঁড়। ও বাহাদুর বংশের ষাঁড়ের কীর্তি আর নাম-ডাক সেভিল স্পেন ছাড়িয়ে সেই দক্ষিণ আমেরিকায় পর্যন্ত ছড়ানো। ওই ভাকাদ্দার ছাপ দাগা জাত-ষাঁড়ের শিঙে তখনও পর্যন্ত হাজার হাজার পিকাডোর-এর ঘোড়া পেট-টোফলা হয়ে খতম হয়েছে, চুলো জান দিয়েছে অমন গণ্ডা দশ, আর ব্যান্ডেরিলেরোস আর পিকাডোরেস দশ-বিশটার ওপর খোদ এসপাদা বা মাটাডোর-ই ভবলীলা সাঙ্গ করেছে অন্তত পাঁচ-ছটি। প্লাজা দে টোরোস-এর এই কংস-মার্কা বংশের এক বিভীষিকা—
এই পর্যন্ত বলেই ঘনাদা চোখ খুলে তাকিয়ে আমাদের অবস্থাটা অনুমান করেই বোধহয় থামলেন। তারপর জীবে দয়ার নীতি স্মরণ করে ব্যাখ্যা করে বললেন, ও, ঠিক কূল পাচ্ছ না বুঝি? তা হলে জেনে রাখো, প্লাজা দে টোরোস হল বুনো খ্যাপা ষাঁড়ের সঙ্গে লড়াই-এর খেলা যেখানে হয় সেই চারদিক ঘেরা গোল রণাঙ্গন। এসপাদা বলে সবার ওপরের ষণ্ডবীরকে, ছোট একটি তলোয়ার আর রঙিন একটা নিশান নিয়ে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে যে শেষ পর্যন্ত ষাঁড়েদের খেলিয়ে তার পর খতম করে। পিকাড়োরেস হল সওয়ারি বীর যারা লড়াই শুরু হবার পর ষাঁড়কে তাদের খাটো বল্লম দিয়ে খুঁচিয়ে খেপিয়ে তোলে আর ব্যান্ডেরিলেরোস হল এসপাদাদের পরের ধাপের বীর—যারা লাল দোলাই নেড়ে ষাঁড়কে খেলানো আর খেপানো থেকে তাদের গায়ে কাঁটা দেওয়া তীর বসিয়ে শেষ লড়াই-এর জন্য তৈরি করবার সব কাজ করে।
ঘনাদা স্পেনের ষাঁড়ের লড়াই-এর কুশীলব আমাদের চেনাবার মধ্যে একটু থামতেই শিবু যেন মুগ্ধ বিস্ময়ে বললে, আপনি ষাঁড়ের লড়াই-এও তা হলে নেমেছেন?
কিন্তু ওই একটু ভোয়াজের চেষ্টায় প্রায় হিতে বিপরীত হবার উপক্রম হবে ক জানত? যেন তাঁকে গালাগাল দেওয়া হয়েছে এমনই গরম হয়ে উঠে ঘনাদা বললেন,
যাঁড়ের লড়াই করব আমি! ওই একটা নিষ্ঠুর পৈশাচিক খেলার আমি হব একটা অংশীদার?
এ প্রশ্নের জবাব শিবুর ওপর খাপ্পা হয়েই দিতে হল।
শিবুটা একটা হাঁদারাম! বললাম আমি।
শুধু হাঁদারাম! গৌর তার ওপর আর এক পরদা চড়ালে—ওটা আহাম্মক। নইলে অমন আজগুবি কথা ভাবে!
শিবুর চোখমুখের চেহারা দেখে আমায় আবার দুদিকই সামলাতে হল। বললাম, ওই যে আপনার জুশির খানিকটা ষাঁড়ের পেটে থেকে গেছে বললেন, তাইতেই ও ভেবেছে বোধহয় যে আপনি ষাঁড়ের লড়াই করতেই ওখানে গিয়েছিলেন। এর পর শিবুকে একটু জ্ঞান বন্টন, আরে খেলা দেখতে গেলেই কি খেলায় নামতে হয়। তা হলে তো ইস্ট-মোহন খেলার মাঠে তৃতীয় মহাযুদ্ধ হয়ে যেত। সেভিলের ষাঁড়ের লড়াই-এর অত নাম-ডাক। ঘনাদা তাই দেখতে গিয়েছিলেন।
না, সে লড়াই দেখতে যাইনি।—ঘনাদা এতেও আপত্তি জানালেন বটে, কিন্তু তার সঙ্গের হাসিটা ক্ষমার——আমি গেছলাম চেয়াক গাম্বোকে বাগে পেতে।
চেয়াক গাম্বো! একটু আড়ষ্ট উচ্চারণের সঙ্গে প্রশ্নটা আপনা থেকেই বেরিয়ে গেল মুখ থেকে—সে আবার কে?
সে-ই হল সব নষ্টের মূল, শয়তান চূড়ামণি —তার কথা মনে করতেই ঘনাদার গলাটা যেন ঝাঁঝালো হয়ে উঠল—নামটা শুনে তাকে মঙ্গোলিয়ান মনে হয়, কিন্তু ওটা তার ছদ্মনাম। আসলে তার নিজের কোনও দেশই নেই। গুপ্তচরগিরি থেকে যে কাজে শয়তানি বুদ্ধি মোটা লাভে খাটানো যায়, এ সব কিছুর ধান্দায় দুনিয়াময় টহল দিয়ে বেড়ায়।
জুদশির পুরনো পুঁথি খুঁজতে খুঁজতে টাকলা মাকানের উত্তরে ঘোরাঘুরির সময়েই ওকে সঙ্গী হিসেবে নিয়েছিলাম। ও খুব করুণভাবে নিজের দুঃখের কাহিনী বলেছিল। মরুর ঝড়ে ও নাকি নিজের কাফিলা থেকে ছিটকে পড়ে তখন একেবারে অসহায় অবস্থায় পড়েছে। আমি সঙ্গে না নিলে সে এই মরুতে শুধু পিপাসাতেই শুকিয়ে মারা যাবে।
তার মুখ আর বিশেষ করে চোখের চাউনি দেখে তার আসল চরিত্র কিছুটা আন্দাজ করলেও, তার বিশাল দশাসই চেহারা আর এ অঞ্চল সম্বন্ধে বেশ কিছু জানা আছে দেখে সঙ্গে নিতে রাজি হয়েছিলাম।
