টঙের ঘরের তাঁর ওপর কেন শিশির এতখানি খাপ্পা তা বুঝতে এরপর আর দেরি হল না।
শিশির বিবরণটা দিতে দিতেও একেবারে যেন চিড়বিড়িয়ে উঠে ওপর দিকে আঙুল দেখিয়ে বললে, আর উনি, তোমাদের ওই উনি সেই সাত রাজার ধন ওষুধ খাবলা খাবলা নিয়ে ভাতে মেখে খেয়েছেন।
দম নিতেই একটু থেমে শিশির গলাটা আরও চড়িয়ে দিল তারপর, এটা কি পাতে খাবার ঘি?
না, পাতে, ভাতে, কি শুধু, কোনওভাবেই ও ঘৃত খাবার জিনিস নয়।
এ কার গলা? চমকে আমরা পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখেছি, আমাদের অনুমানে ভুল হয়নি। স্বয়ং ঘনাদাই—যেন ঘড়ি ধরে যথাসময়ে যথাস্থানে অপ্রত্যাশিতভাবে এসে হাজির হয়েছেন।
আমরা যত খুশিই হই, শিশির তাঁকে দেখে একেবারে তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে। শিশির রাগে প্রায় তোতলা হয়ে উঠল—আপনি—আপনি আবার মুখ দেখাতে এসেছেন এখানে! লজ্জা নেই আপনার! জানেন কী জিনিস আপনি নষ্ট করেছেন? জানেন আমার এই জীবন-মরণ সমস্যায় প্রতিটি ফোঁটা যার অমৃত, সেই অমূল্য জিনিস আপনি ভাতে মেখে খেয়ে
জুদশি!
কথার মাঝখানে ঘনাদার ওই বিদঘুটে উচ্চারণে আপনা থেকেই একবার থেমে যাবার পর, শিশির আরও গনগনে আগুনে হয়ে উঠল, রাখুন রাখুন আপনার সব বুজরুকি। ও সব আমাদের ঢের দেখা আছে! আপনি—
হ্যাঁ, জুদশি! ঘনাদা আবার গম্ভীর ভাবে বাধা দিলেন, সব একেবারে অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাচ্ছে!
কী জুদশি? কী অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাচ্ছে? এবার হলকা ছোটানো গলায়।
আমাদের জিজ্ঞাসাটাও প্রকাশ করলে।
কী মিলে যাচ্ছে? ঘনাদা স্থির ধীর ভাবেই জানালেন, মিলে যাচ্ছে তোমার যা
হয়েছে তাই। নিদান বিধান সবই যাচ্ছে মিলে।
কী আবোলতাবোল বকছেন, কী?—এবার শিশিরের সুর একটু পালটানো, নিদান বিধান কোথায় কী মিলেছে?
ওই যে তোমাদের তখন শোনালাম, ঘনাদা আমাদের স্মরণশক্তি একটু উসকে দিলেন, ওই যে সেনাপতি দিলেন জঙ্গলে দিশাহারা করে, মন্ত্রী গাছ কাটলেন আর শেষে স্বয়ং রাজা এসে জঙ্গল সুদ্ধ জ্বালিয়ে উনুন পাতিয়ে বসালেন। ব্যস,রাস্তা খুলে গেল তাতেই।
এটা কী পাগলা গারদ পেয়েছেন! শিশির আবার খাপ্পা হয়ে উঠল, না, বৃহৎ ছাগলাদ্য ঘৃত ভাতে মেখে আপনার ঘিলুটাই গেছে ঘণ্ট হয়ে?
আমার হয়ে যায়নি, কিন্তু তোমার তা-ই হত।
ঘনাদার এ নিষ্ঠুর টিপ্পনি শুনে শিশিরের শোক আবার উথলে উঠল, আমার তা-ই হত! আমার প্রাণ বাঁচাতে স্বয়ং ধন্বন্তরীর মতো কবিরাজ অত কষ্ট করে যা তৈরি করেছেন, আমার অনিষ্ট হত সেই ছাগলাদ্য ঘৃত খেয়ে?
হ্যাঁ, হত—ঘনাদা এতক্ষণে খাবারঘরের একটা চেয়ার টেনে জুত করে বসলেন, কারণ ছাগ-টাগ তো নয়, তোমার ওই অমূল্য ঘৃতটি ছাগি দিয়ে তৈরি।
ছাগি দিয়ে তৈরি! ঘনাদার এ ধানিলঙ্কা ফোড়নের টিপ্পনিতে শিশির মারমুখোর সঙ্গে একটু যেন কাঁদো কাঁদো—আপনি পাতে একবার খেয়েই বুঝতে পারলেন। ঘি-টা ছাগলের নয়, ছাগলির?
হ্যাঁ, পারলাম। ঘনাদা করুণা করে বললেন, যেমন বুঝতে পারছি তোমার নিদান-বিধান সব দিয়ে গেছে জুদশি!
ফের! ফের সেই জুদশি! শিশির বুঝি শেষবার মেজাজ দেখাল, কে? কে আপনার জুদশি?
কে নয়, বলো, কী! ঘনাদা কৃপা করে তারপর বিশদ হলেন, জুদশি হল দুনিয়ার সবচেয়ে দামি সবচেয়ে বিরল, রোগচিকিৎসার গুপ্ত পুঁথি। জুদশির মানে হল অষ্টাঙ্গ গুপ্ত বিদ্যার মৌল চতুসূত্র, চোদ্দো হাজার ছন্দে বাঁধা শ্লোকে তা লেখা।
সেই পুঁথি আপনার কাছে আছে? এবার জিজ্ঞাসার ছলে উসকানিটা অবশ্য আমাদের। খাবার টেবিলের দুধারে ঘনাদা আর শিশিরকে ঘিরে আমরা তখন বসে পড়েছি।
আমার কাছে ও পুঁথি? ঘনাদা সত্যের মান রাখতে মহৎ হলেন, জুদশির একটিমাত্র গোটা পুঁথি আছে বুরিয়াতিয়ার উলান উদে শহরের লোক-সংস্কৃতি সংগ্রহশালায়।
সেই চোদ্দো হাজার শ্লোকের গোটা পুঁথিটি আপনি বুঝি পড়ে মুখস্থ করে রেখেছেন? আমাদের বিস্ময় মেশানো সরল জিজ্ঞাসা।
পড়ে মুখস্থ করে রেখেছি? সত্যের খাতিরে ঘনাদা আবার অকপট হলেন। একটু দুঃখের হাসি হেসে বললেন, সে পুঁথি পাব কোথায় যে পড়ে মুখস্থ করব। সে পুঁথি আমি চোখে দেখিনি এখনও।
তা হলে? আমরা এবার একটু বিমূঢ়, ও পুঁথির তো আর দ্বিতীয় কপি কোথাও নেই বলছেন?
তা তো নেই-ই। ঘনাদা হেঁয়ালিটা আরও গভীর করলেন, আর একটি গোটা পুঁথি জোগাড় করবার জন্য সোভিয়েত বিজ্ঞান-অ্যাকাডেমির সাইবেরীয় শাখার একটি স্বতন্ত্র কমিটিই তৈরি হয়ে তিব্বত মঙ্গোলিয়া আর বুরিয়াতিয়ায় আপ্রাণ সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে।
তাতেও কিছু পাওয়া যায়নি?—আমরা সত্যিই খুব উগ্রীব।
গেছে। আগের মতোই এখানে ওখানে ছেঁড়াখোঁড়া এক-আধটা পাতা। ঘনাদা দুঃখের সঙ্গে জানালেন—অমন আরও কত পাতা মর্ম না বোঝার দরুন যে লোকে হেলায় নষ্ট করেছে তার ঠিক নেই।
মর্ম না বুঝে নষ্ট করেছে ওই অমূল্য জিনিস! আমরা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ—কারা সেই আহাম্মক!
আহাম্মক তাদের বলা একটু অন্যায় হয়। ঘনাদা তাঁর মহানুভবতায় আসামিদের পক্ষ নিলেন—হাতে পেলেও ও পুঁথির মর্ম বোঝা তো যার-তার কাজ নয়। প্রথমত, পুঁথির পাতাগুলোই একেবারে অদ্ভুত। অনেকটা পুরনো ফিলম নেগেটিভ-এর মতো দেখতে কালো বার্নিশ করা কাগজে সোনালি রঙে লেখা। সে লেখাও বোঝার ক্ষমতা আছে ক-জনের। হয় প্রাচীন আলংকারিক ব্রাহ্মী লিপিতে, নয় ওপর থেকে নীচে লাইন ধরে লেখা নিখুঁত আদি মঙ্গোলীয় হরফে ঠাসাঠাসি করে যা ওখানে লেখা তা একেবারে কঠিন ধাঁধা। সে ধাঁধা ভেদ করার বুদ্ধি না থাকলে কাগজগুলোর কোনও দাম নেই।
