বরাদ্দ মাফিক সিগারেটের নজরানা না পেয়ে ঘনাদার মেজাজ এমনিতেই তখন খিচড়ে আছে! নাড়ি দেখার অনুরোধে হঠাৎ তেতো চিবিয়ে ফেলার মতো মুখ করে বলেছেন, কী দেখব? নাড়ি? কার নাড়ি?
তাঁর মুখের চেহারা লক্ষ করতে গেলে আমাদের তখন চলে চলে না। সেদিকে যেন চোখই না দিয়ে মিনতি করেছি, ওই শিশিরের নাড়িটা একটু দেখতে বলছি। ও ক-দিনে কীরকম শুকিয়ে গেছে তাও একটু যদি দেখেন।
মুশকিল আসান হয়ে সব গোল মিটে যেতে পারত ঘনাদাকে একটু কেরামতি দেখাবার সুযোগ তখন দিলেই।
কিন্তু তা হবার নয়।
বৃহৎ চিকিৎসা বারিধিতে নতুন কী পড়ে জানি না, তার মেজাজ সেদিন একেবারে যেন বুনো কাঁটা নটে। ঘনাদার নাড়ি দেখবার কথায় জিভে যেন ক্ষুর এঁটে বলেছে, ঘনাদা দেখবেন! কী দেখবেন উনি শুনি? ওঁর চোখে কী এক্স-রে আছে, না ওর আঙুলগুলো ই সি জির যন্ত্র, ডাক্তারি মানে আজকাল কী, তা উনি জানেন? মান্টু টেস্ট, ই এস আর, স্টারন্যাল পাংচারের নাম শুনেছেন কখনও? কী জানেন উনি এ সব ব্যাপারে?
সর্বনাশা ব্যাপার। সভয়ে আমরা এবার ঘনাদার দিকে তাকিয়েছি। বাহাত্তর নম্বরের টঙের ঘর বুঝি চিরকালের মতো খালিই হয়।
কিন্তু না, সে রকম কোনও লক্ষণ নেই। তার বদলে ঘনাদার মুখে রহস্যময় প্রশান্ত এক হাসি আর সেই সঙ্গে আমাদের মাথার ঘিলু ঘোলানো চক্ষু-ছানাবড়া করা উচ্চারণটুকু—জুদশি!
অ্যাঁ! নিজেদের অজান্তেই আমাদের গলায় বিহ্বল বিস্ময়ের প্রশ্নটা বেরিয়েছে— জুদশি!!!
হ্যাঁ, আমাদের মাথাগুলো একেবারে চরকি পাকে ঘুরিয়ে ঘনাদা বলেছেন, সব কিছু একেবারে অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাচ্ছে। সেনাপতি ঘোর জঙ্গলে ঢুকিয়ে দিলেন পথ হারিয়ে, মন্ত্রী খুঁজে খুঁজে গাছ কাটলেন ভোঁতা কুড়ুলে। বোটকা বুনো গন্ধই ছড়াল। রাস্তা বেরুল না। শেষে রাজা এসে জঙ্গলই জ্বালিয়ে উনুন পেতে বসালেন। ব্যস, তাতেই কাম ফতে! কিন্তু রাজার নাগাল পাচ্ছে কে?।
কথাগুলো বলেই ঘনাদা কেদারা ছেড়ে উঠে গট গট করে ন্যাড়া সিঁড়ি বেয়ে তাঁর টঙের ঘরে উঠে গিয়েছেন। শিশিরের বেয়াড়া ব্যাধির ছোঁয়াচে ঘনাদারই হঠাৎ মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে, না আমাদের বুদ্ধিশুদ্ধি লোপ পেয়েছে বুঝতে না পেরে দিশাহারা অবস্থায় ঘনাদাকে ডেকে থামাবার চেষ্টা পর্যন্ত আমরা কেউ করতে পারিনি।
চেষ্টা করলেও লাভ কিছু হত বলে মনে হয় না, কারণ ঘনাদা এক রকম যেন অটল জেদ নিয়েই আমাদের ছেড়ে গেছেন। আর সেই যে গেছেন তারপর থেকে আমাদের সঙ্গে আর সম্পর্ক রাখছেন না বললেই হয়।
তা না রাখুন। বাহাত্তর নম্বর ছেড়ে যাবার হুমকি যে দেননি বা এখানকার হেঁশেলের অন্ন স্পর্শ না করবার গোঁ যে ধরেননি এই আমাদের ভাগ্যি।
তাঁকে নিজেদের খুশিমত থাকতে দিয়ে শিশিরকে নিয়েই আমাদের ব্যস্ত হতে হয়।
ঘন ঘন একটু আয়না দেখা আর নাড়ি টেপা থেকে বাতিকটা শিশিরের তখন ক্রমশ গুরুতর হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এ ডাক্তার থেকে সে ডাক্তার, অ্যালোপ্যাথি থেকে হোমিওপ্যাথি, তা থেকে ইউনানি তো বটেই, সেই সঙ্গে ওষুধ কেনা আর তা বাতিল করার সে কী সৃষ্টি ছাড়া খ্যাপামি!
ওষুধ মানে অবশ্য শরীরের তাকত বাড়াবার সালসা অর্থাৎ টনিক যে বাজারে এত আছে তাই বা কে জানত। কোনও টনিকই শিশির কিনতে বাকি রাখে না, দুদিন বাদে ব্যাজার হয়ে বাতিল করতেও তার দেরি হয় না।
এক ভিটামিন টনিকের বোতল সিকি না খরচ হতে হতে আসে কডলিভার অয়েলের শিশি, সেটার দু চামচ পেটে যেতে না যেতেই বাতিল হয়ে গ্লিসেরো ফসফেট না কী সব নার্ভ টনিককে জায়গা করে দেয়। নার্ভ টনিকের রাজত্বও দু-চারদিনের বেশি টেকে না। তারপর ঝাড়েবংশে সব অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ নিয়েই তাকে বিদেয় হতে হয়। তার জায়গায় যারা আসে সেই হেকিমি ইউনানি। সালসাও বেশি দিন কেউ পাত্তা পায় না। শিশিরের ঘরের শিশি-বোতলের কাঁড়ি সাফ করতে বনোয়ারিকে ঘন ঘন শিশি-বোতল বিক্রিওয়ালা ডাকতে হয় রাস্তা থেকে।
বাজারের জানা-অজানা সব টনিক পরীক্ষা শেষ হলে পর শিশিরের এ রোগ যদি সারে এই আশায় যখন দিন গুনছি, তখন হঠাৎ একদিন এই সালসার পাত্র থেকেই বাহাত্তর নম্বরের অমন একটা বিস্ফোরণ হবে ভাবতেও পারিনি।
আজকাল শিশিরের রোগের ওষুধ যেমন পথ্যিও তেমনই একটু আলাদা। শিশির আমাদের আর সকলের আগেই দিনে রাত্রে তার খাওয়াটা তাই সেরে আসে।
সেদিন সে তাই নিয়েছিল।
হঠাৎ নীচে থেকে তার একেবারে বাড়ি ফাটানো চিৎকার শুনে আমরা সবাই তাজ্জব! কী হল কী শিশিরের? তার রোগের বাতিক এতদিন যা দেখে আসছি তা
তো এমন বিকারের প্রলাপে দাঁড়াবার মতো কিছু নয়।
হুতুমড় করে সবাইকে নীচে নেমে যেতে হল তৎক্ষণাৎ। শিশির তখন আমাদের খাবার টেবিলে ঘুষি মেরে চিৎকার করছে, এ বাড়ির মেস করা আমি ঘুচিয়ে দেব। বাড়িওয়ালাকে দিয়ে নোটিশ দেব সকলকে ঘাড় ধরে বার করবার। আর কিছু না হোক ঘুণ ধরা কনডেমন্ড পোড়ড়া বাড়ি বলে করপোরেশনকে দিয়ে ভাঙিয়ে ছাড়ব। আর ওই টঙের ঘর সবার আগে গুঁড়ো করতে পারি কি না তাই দেখাচ্ছি!
শিশিরের খাবার টেবিলের ওপর একটা অর্ধেক খালি কাঁচের ছোট জার, আর তার এলোমলো আর্তনাদ মেশানো আস্ফালন থেকে ব্যাপারটা বুঝতে একটু সময়ই লাগল।
ব্যাপারটা যা বুঝলাম তা অবশ্য রীতিমত গুরুতরই বলতে হয়। অ্যালোপ্যাথি হোমিওপ্যাথি ইউনানি হেকিমি ছেড়ে শিশির সম্প্রতি কবিরাজির শরণ নিয়েছে। আর দু পকেট প্রায় খালি করে সাক্ষাৎ ধন্বন্তরী এক কবিরাজকে দিয়ে দুনিয়ার সেরা বৃহৎ ছাগলাদ্য ঘৃত তৈরি করিয়ে এনেছে ওই কাঁচের জারে। জারটা সুবিধের জন্য নীচে রামভুজের কাছেই থাকে, সকাল বিকেল চা জলখাবারের সময় শিশিরের যাতে খেতে ভুল না হয়।
