কী হয়েছে? শিশির এবার একটা মডেল দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়ল, কী হয়েছে তা যদি জানতেই পারতাম!
হ্যাঁ, এই ভাবেই শুরু। তারপর দিন দিন মাত্রা চড়েছে।
প্রথমে শুধু চেহারা দেখা, আর মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছিল।
সেই সঙ্গে একটু একটু আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ।
যেমন, আজ সকালের কাশিটার আওয়াজ শুনলি?
কাশির আওয়াজ!—আমরা সত্যিই বেশ অবাক—কাশির আওয়াজ আবার কোথায়? কার কাশি?
কার কাশি আবার? আমার কাশি। শিশির বেশ ক্ষুব্ধ আমাদের উদাসীনতায় আজ সকালে কীরকম কাশলাম, শুনলি না? খেয়ালই করিসনি বোধহয়।
খেয়াল করব না কেন? করেছি বলেই জোর দিয়ে বলতে পারি—ওই সকালের কাশির কথা বলছিস। সে আবার কাশি কোথায়! ও তো তুই ডিমের পোচ খেতে গিয়ে বিষম খেলি!
বিষম খেলুম—শিশির যেন অপমানিত—তোরা তো তাই বলবি। বলে রেগে উঠেই চলে যায় ঘর থেকে।
তখন রাগে সঙ্গ ছেড়ে গেলেও ছাড়াছাড়িটা স্থায়ী নয়। শারীরিক দুঃসংবাদ দেবার জন্য আবার আমাদের কাছেই আসতে হয়।
কাল রাত্রে কীরকম ঘাম হয়েছে জানিস? শিশির গভীর হতাশা ফুটিয়ে তোলে
তার গলায়।
ঘাম! কাল রাত্রে ঘাম! আমরা হেসে না উঠে পারি না।
হাসতে হাসতেই গৌর বলে, কাল রাত্রে গুমোট গরমের ওপর লোডশেডিং-এ পাখা বন্ধ। কার না ঘাম হয়েছে কাল। আমাদেরও তো হয়েছে।
তা তোদের হতে পারে। কিন্তু আমার ঘাম আলাদা! বলে নিজের সাংঘাতিক। ঘামের গর্বে আর দুঃখে শিশির আমাদের সঙ্গে কথাই বন্ধ করে দেয় কিছুক্ষণ।
শুরুতে এই গুমোট আগুনের আঁচ আর ধোঁয়াটুকুই ছিল।
এ শুরুর অবশ্য আরও আগের সূচনা আছে। সে সূচনা হল শিবুর একটি মারাত্মক আহাম্মকি থেকে।
কোথাও কিছু নেই হঠাৎ তার খেয়াল হয়েছে ডাক্তারি শিখে দাতব্য চিকিৎসা করে দেশের সেবা করবে।
এ সংকল্পের তাগিদে, না, কোথাও মেডিক্যাল কলেজে কি স্কুলে ভর্তি হয়নি বাজার থেকে একটি মহাভারতপ্রমাণ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার বই কিনে এনেছে।
কিনে আনার পর কী তার আস্ফালন। বইটা বেশ একটু কোঁত পেড়ে তুলে ধরে আমাদের দেখিয়ে বলেছে, জানিস কীরকম বই এটা! দুনিয়ায় হেন রোগ নেই—যার চিকিৎসার কথা এখানে পাবি না।
শিবুর কিন্তু বইটা পড়ে দাতব্য চিকিৎসা করা আর হয়ে ওঠেনি। তার বদলে বইটা পড়তে শুরু করেছে শিশির।
আর সেই থেকেই একটু একটু করে অ আ ক খ-র ধাপে ধাপে উঠতে উঠতে সে বুঝেছে যে, যে অক্ষরের পাতায় সে এখন পৌছেছে, তা পর্যন্ত দেওয়া সব কটি রোগের সে একটি ডিপো।
অ থেকে এসে ক-এ ষ-এ ক্ষএ পৌছে তাই সে প্রতিদিন সাংঘাতিক সব লক্ষণ নিজের মধ্যে আবিষ্কার করতে শুরু করেছে।
লক্ষণ তো একটা নয়, অনেক। আর সব যে একেবারে বৃহৎ চিকিৎসা-বারিধির বর্ণনার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে শিশির তা বিশদভাবে আমাদের বুঝিয়েছে—এই যেমন সকাল বিকেল তার দারুণ খিদে পাওয়া। এটা তো আর তার নিজের নয়, এ হল তার রোগের রাক্ষুসে হ্যাংলামি।
আর ওই যে ঘুম। এত সব দুর্ভাবনা থাকলেও বিছানায় শুয়ে বালিশে মাথা ঠেকাতেই যে ঘুমে বেহুশ হয়ে যায় এ তো একেবারে সাংঘাতিক খারাপ লক্ষণ।
শিশির নিত্য নতুন এমনই সব লক্ষণ আবিষ্কার করে আমাদের শোনায় আর আমরা ঠাট্টা-ইয়ার্কিতে আর উৎসাহ না পেয়ে তার জন্য রীতিমতো চিন্তিত হয়ে উঠি।
বাহাত্তর নম্বরের এত বড় যখন সমস্যা, তখন সেই টঙের ঘরের সেই তিনি করছেন কী? তিনি কি আমাদের পরিত্যাগ করেছেন, না তাঁর শরণ আমরা নিতে চাইনি।
না, তিনি আমাদের পরিত্যাগ করেননি, বহাল তবিয়তেই তাঁর টঙের ঘরে বিরাজ করছেন, আর আমরাও তাঁর শরণ নিতে ভুল করিনি।
কিন্তু ভাগ্যের দোষে চালটা যেন কেমন কেঁচে গিয়েছে। শিশিরের রোগের সেই গোড়ার দিকেই খেইটা ঘনাদাকে ধরিয়ে দেবার চেষ্টা করেছিলাম। ঘনাদা সেদিন সবে এসে তাঁর মৌরসি কেদারাটিতে গা এলিয়ে দিয়েছেন। তাঁর প্রাত্যহিক অধিষ্ঠান অনুষ্ঠানের একটু ত্রুটি হয়েছে বলেই মুখটা খুব প্রসন্ন দেখায়নি।
তিনি এসে আরামকেদারাটি দখল করার পরেই শিশির তার ডান হাতের তুলে ধরা তর্জনী আর মধ্যমার মধ্যে একটি সিগারেট গুঁজে দিয়ে ভক্তিভরে লাইটার দিয়ে জ্বালিয়ে দেবে এই হল বাহাত্তর নম্বরের দস্তুর।
কিন্তু শিশিরই তখনও ঘরে আসেনি, এ অনুষ্ঠান আর পালন করবে কে?
খানিক বাদে শিশির অবশ্য এসেছে কিন্তু এ তো অন্য শিশির। কেমন অন্যমনস্ক ভাবে মনটা যেন আর কোথাও ফেলে রেখে এসে একটা চেয়ারে বসেছে শুধু।
শিশিরকে দেখে ঘনাদা উৎফুল্ল হয়ে স্বাগত জানিয়েছেন, এই যে শিশির।
শিশির তাঁর দিকে চোখ তুলে তাকিয়েছে। সিগারেট সে যে হঠাৎ ছেড়ে দিয়েছে, তা না জানাক, একটু হেসেও ঘনাদার সম্ভাষণের মান রাখেনি। বাঁ হাতের আঙুল দিয়ে ডান হাতের কবজি ধরে সে তখন তার নাড়ি দেখতে তন্ময়।
ঘনাদা ভুরু কুঁচকে সেদিকে তাকিয়েছেন। আমরাও অস্বস্তি চাপা দিয়ে আসল কথাটা তোলবার সুযোগ নিয়েছি ওই নাড়ি টেপা থেকেই।
নাড়িটা আজ কীরকম দেখছিস? জিজ্ঞাসা করেছে গৌর।
খুব খারাপ, খুব খারাপ! শিশির যেন তার ফাঁসির হুকুম শুনিয়েছে, আঙুলে একেবারে স্পষ্ট টের পাওয়া যাচ্ছে।
বলতে পারতাম—তা যাবে না তো কি, নাড়ি ছেড়ে গেছে মনে হবে! কিন্তু তা না বলে খেইটা ওইখান থেকে ধরাবার চেষ্টা করেছে শিবু। বলেছে, খুব গম্ভীর হয়ে, নাড়িটা আপনি একবার দেখুন তো, ঘনাদা?
