মাথার ঘিলু ঘোলানো চক্ষু ছানাবড়া করা উচ্চারণটা শুনতে কিছু ভুল হয়েছে কি বুঝতে না পেরে আমাদের হতভম্ব মুখ দিয়ে অজান্তে এই শব্দটাই আপনা থেকে আবার বেরিয়েছে—জুদশি!!!
হ্যাঁ, জুদশি! আমাদের মাথাগুলো আরও চরকি পাকে ঘুরিয়ে ঘনাদা বলেছেন, সব কিছু একেবারে অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাচ্ছে।
এরপর ঘনাদা আরও একটু বিশদভাবে আমাদের যা বুঝিয়েছেন, তাতে ঘনাদার সঙ্গে আমরা দুই-এ দুই-এ চার-এর জগতে আছি, কোন ভেলকিতে হঠাৎ আয়নার ওপিঠের আবোলতাবোলের মুলুকে চালান হয়ে গেছি, এই ধোঁকায় পড়ে খানিক প্রায়। বোবা আর বে-এক্তিয়ার হয়েই থেকেছি। ঘনাদার আড্ডাঘর ছেড়ে চলে যাওয়াটা আটকাবার চেষ্টা করতেই পারিনি।
আচমকা জুদশি-র এই মাথার ঘিলু ঘোলানো বিভ্রান্তিতে পৌঁছবার জন্য তার আগের ইতিহাস একটু জানা দরকার।
সে ইতিহাস এক হিসেবে দারুণ সেই বিস্ফোরণ থেকেই শুরু বলা যায়।
কোথাকার কী বিস্ফোরণ না বলতেই কেউ কেউ কিছুটা বুঝেছেন নিশ্চয়। ঠিকই তাঁরা বুঝেছেন।
বাহাত্তর নম্বরে বিস্ফোরণ! হ্যাঁ, প্রায় পারমাণবিক বিস্ফোরণই বলা যায়।
সেই বাপি দত্ত বিগড়ি হাঁস খাইয়ে খাইয়ে আমাদের পেটে চড়া পড়িয়ে এ মেস ছেড়ে যাবার পর থেকে এমন হুলুস্থুল কাণ্ড আর হয়নি।
গৌরের সেই ইন্দ্রলুপ্ত নিবারণী তেলের শিশির সেই নিদারুণ পরিণামের পরও বাহাত্তর নম্বরে এমন সাংঘাতিক সংকট দেখা দেয়নি।
কারণ এবার গৌর, শিবু কি আর কেউ তো নয়, খেপেছে স্বয়ং শিশির। সেই শিশির যার শরীরে সত্যিকার রাগ আছে বলে আমরা কখনও জানতে পারিনি।
কিন্তু সেই শিশির এখন একেবারে যেন বাহাত্তর নম্বরে দাবানল।
দাবানলটা যে হঠাৎ তুমুল হয়ে উঠবে, তার আভাস কিন্তু বেশ কিছুদিন আগে থাকতেই আমাদের পাওয়া উচিত ছিল। আভাস যে পাইনি তাও ঠিক নয়। কেমন একটু কোথায় যেন ধোঁয়ার গন্ধ পাচ্ছিলাম। তবে সেটা নেহাত ধোঁয়া বলেই উড়িয়ে দিয়েছিলাম।
ধোঁয়ার আভাসটা ছিল শিশিরের নতুন এক বাতিক।
যখনই সময় সুবিধে পায় শিশির আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিজেকে কী যে দেখে প্রথমটা বোঝা যায়নি।
আমরা ঠাট্টায় সরব হয়ে তখনও উঠিনি। মুখ টিপে শুধু হাসাহাসি করি। সরব ঠাট্টার খোঁচাটা গৌরই প্রথম দিলে।
আমাদের দোতলার আড্ডাঘরে আর যাই থাক আয়না-টায়নার কোনও বালাই নেই।
শিশিরকে কিছুদিন থেকে আড্ডাঘরে সময়মত দেখা যায় না এলে একটু দেরি করেই আসে। কোনও কোনও দিন তার দেখাই পাওয়া যায় না।
দেখা যখন পাওয়া যায় তখনও কেমন গম্ভীর অন্যমনস্ক। কী যেন একটা ভাবনা ওর ওপর চেপে আছে।
সুস্থ সবল নির্ঞ্ঝাট ছেলে। তার হঠাৎ এমন গুরুতর ভাবনার ব্যাপার কী হতে পারে? আর সে ভাবনার সঙ্গে ফাঁক পেলেই আয়নায় ঘন ঘন চেহারা দেখার সম্বন্ধটা কী?
শিশির কি হঠাৎ সিনেমার হিরো হবার কথা ভাবছে নাকি! চেহারা নিয়ে তাই এত মাথাব্যথা!
সেদিন আমাদের সবাইকার পরে শিশির অমনই অন্যমনস্ক চেহারা নিয়ে আড্ডাঘরে এসে ঢাকবার পর গৌর খুব গম্ভীর হয়ে প্রস্তাব করলে, আচ্ছা, আমাদের এ বৈঠকের ঘরে একটা বড় আয়না রাখলে হয় না? কী বলিস, শিশির?
অ্যাঁ? শিশির কথাটা যেন বুঝতেই না পেরে প্রথমটা কেমন একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলে, আয়না? –
হ্যাঁ, গৌর গম্ভীর মুখেই ব্যাখ্যা করে বোঝালে, এই আড্ডাঘরে একটা বড় আয়না রাখার কথা বলছি। কত সুবিধে হয় বল তো? যখন খুশি চেহারা-টেহারা দেখে ঠিক করে নিতে পারি।
আমরা তখন কোনও রকমে মুখ ঘুরিয়ে মাথা নিচু করে হাসি চাপবার চেষ্টা করছি।
কিন্তু এত বড় একটা মোটা ঠাট্টার খোঁচা শিশির যেন টেরই পেল না। ক্ষুগ্ন হওয়া কি রেগে ওঠার বদলে, ও ধার দিয়েই না গিয়ে, গম্ভীরের সঙ্গে একটু যেন করুণ হয়ে একেবারে অন্য লাইনে চলে গেল।
এখানে আয়না? একটু বিব্রত হয়েই আপত্তি জানিয়ে সে বললে, না না, এখানে আয়না রেখে কোনও লাভ নেই। আর নিজে নিজে দেখে কিছু বোঝাই যায় না।
ঠাট্টার খোঁচা দিতে গিয়ে আমরাই তখন হতভম্ব। আবোলতাবোল কী বলছে শিশির? আয়নায় মুখ দেখতে দেখতে মাথাটাতেই গোলমাল হয়ে গেল নাকি? কথার সঙ্গে কথার কোনও জোড়-ই নেই যে!
জোড়টা কোথায় শিশিরের পরের কথায় কিছুটা বোঝা গেল।
আমাদের একেবারে অবাক করে দিয়ে শিশির বেশ একটু ব্যাকুল ভাবে জিজ্ঞাসা করলে, আচ্ছা, তোরা কিছু বুঝতে পারছিস?
কী বুঝব আমরা! আমাদের হতভম্ব জিজ্ঞাসা।
এই, মানে, এই, শিশির একটু আমতা আমতা করে বললে, আমার চেহারা কি ক্রমশ খারাপ হয়ে যাচ্ছে?
খানিকক্ষণ আমাদের কারও মুখে আর কথা নেই।
গৌরই প্রথম সামলে উঠে জিজ্ঞাসা করলে, তোর চেহারা ক্রমশ খারাপ হচ্ছে কি
তাই আমাদের কাছে জানতে চাইছিস? চেহারা খারাপ হচ্ছে কি না বোঝবার জন্যই তুই আজকাল আয়না নিয়ে এত মত্ত?
হ্যাঁ, শিশির বেশ হতাশ সুরে বললে, কিন্তু নিজে দেখে কিছু বোঝা যায় না। এই একদিন মনে হয় একটু বোধ হয় চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়েছে, তার পরের দিন বেশ ফ্যাকাশে দেখায়। গালের হাড় দুটোর ওপর তো রোজ দুবেলা নজর রাখি, কিন্তু এবেলা একটু পুরন্ত মনে হলেও ওবেলা ঠিক একটু করে ঠেলে উঠেছে বোঝা যায়। তাই বলছি—ও আয়নায় নিজে দেখে কিছু বোঝা যায় না। কিন্তু চেহারা নিয়ে অত বোঝাবুঝির দায়টা কীসের? আমি জানতে চাইলাম, তোর হয়েছেটা কী?
