ইন্দ্রের সঙ্গে কৃষ্ণ আর অর্জুনের সড়!—আমরা সত্যিই এবার থ– অগ্নিদেবের বিরুদ্ধে?
বিরুদ্ধে কেন হবে! তাঁরই মঙ্গলের জন্য! ঘনাদা কেদারায় হেলান দিয়ে এবার করুণা করে একটু বিশদ হলেন——আসলে কৃষ্ণ অর্জুন খাণ্ডব বনে এসেছিলেন ময়দানবকে খুঁজতে। দুনিয়ায় ময়দানবের মতো এত বড় কারিগর আর নেই। ইন্দ্রপ্রস্থে পাণ্ডবদের যে সভাঘর তৈরি হবে তার জন্যে ময়দানবকে দরকার।
কিন্তু খাণ্ডব বনের কাছে পৌঁছতে এক চিমসে হাড্ডিসার বামুন পুঁকতে ধুকতে তাঁদের সামনে এসে হাজির। ধনঞ্জয় চিনতে না পারলেও বাসুদেব তাঁকে দেখেই চিনেছেন।
এ কি অগ্নিদেব? এ কী চেহারা হয়েছে আপনার?
আর বলো কেন! বলে অগ্নিদেব তাঁর অসুখের যে লম্বা ইতিহাস শুরু করলেন তা আর শেষই হতে চায় না। শেষ পর্যন্ত তা থেকে মোদ্দা কথা যা জানা গেল তা এই যে, শ্বেতকী নামে এক রাজার যজ্ঞের বাতিকেই অগ্নিদেবের শরীরের এই দশা। শ্বেতকী রাজার যজ্ঞ করে আর আশ মেটে না। বছরের পরে বছর এক পুরুত হার মানলে রাজা অন্য পুরুত দিয়ে শুধু যজ্ঞই করে যায়, আর অগ্নিদেবকে সেই অফুরন্ত যজ্ঞে বসে বসে জালা জালা ঘি খেতে হয়। সেই ঘি খেয়ে খেয়েই অগ্নিদেবের এমন অগ্নিমান্দ্য যে কিছু আর হজম হয় না, কিছু মুখে রোচে না। সারাক্ষণ শুধু পেট জ্বালা আর চোঁয়া ঢেকুর।
তা আপনাদের স্বর্গের অত বড় কবিরাজ অশ্বিনীকুমারদের একবার দেখালেই তো পারেন! না বলে পারলেন না ধনঞ্জয়।
তা কি আর দেখাইনি! করুণ স্বরে বললেন অগ্নিদেব, আর তাঁদের বিধান শুনেই তো আপনাদের কাছে এসেছি।
তাঁদের বিধান শুনে আমাদের কাছে?অর্জুনও অবাক, কী তাঁদের বিধান? বড় কুমার বলেছেন, মাংস খান যত পারেন আর ছোট বলেছেন, সেদ্ধ-টেদ্ধ নয়, শুধু আগুনে ঝলসানো টাটকা মাংস খেতে। অগ্নিদেব নিজের সমস্যাটা ব্যক্ত করলেন, তাই এই খাণ্ডব বনটা জ্বালাতে এসেছিলাম। কিন্তু এ বন আবার দেবরাজ ইন্দ্রের খাস তালুক। কোথাও দুটো মরা গাছের শুকনো কাঠ একটু ধরাতে না ধরাতেই একেবারে আকাশ-ফুটো করা জল ঢেলে নিভিয়ে দেন। এই দুঃখেই আপনাদের কাছে এসেছি। দোহাই আপনাদের, দেবরাজ ইন্দ্রকে যেমন করে তোক ঠেকিয়ে খাণ্ডব বনটা আমায় পুড়িয়ে খেতে দিন।
অগ্নিদেবের মিনতি শেষ হতে না হতেই শ্রীকৃষ্ণ বলে দিলেন, তথাস্তু। আপনি খুশিমত খাণ্ডব বন পোড়ান গিয়ে যান। দেবরাজ ইন্দ্রকে আমরা সামলাচ্ছি।
অগ্নিদেব তো শুনেই খুশি হয়ে চলে গেলেন। অর্জুন কিন্তু হতভম্ব।
এ কী করলে, বন্ধু! কৃষ্ণকে তিনি অবাক হয়ে বললেন, কিছু না ভেবে-চিন্তে অগ্নিদেবকে তথাস্তু বলে দিলে! খাণ্ডব বন আমরা পোড়াতে দেব কেন? এত কষ্ট করে যাঁকে খুঁজতে এসেছি সেই ময়দানব ওখানে থাকেন। তা ছাড়া বনের জন্তু জানোয়ার আমাদের কী করেছে যে, তাদের এমন সর্বনাশে সাহায্য করব! দেবরাজ ইন্দ্রের সঙ্গেও বা এমন অন্যায় করে যুদ্ধ করতে যাব কেন?
আহা—সত্যি কি ওসব করব নাকি! হেসে বললেন শ্রীকৃষ্ণ, দেবরাজকে স্মরণ করে এখুনি চালটা সব বুঝিয়ে দিচ্ছি। অগ্নিদেব নিজে যা পারেন করুন, আমরা বাইরে থেকে তাঁর হয়ে দারুণ যুদ্ধ করার ভান করে ইন্দ্রদেবকে আগুন নেভাতেই সাহায্য করব।
বলছ কী? ধনঞ্জয়ের দুচোখ এবার কপালে—অগ্নিদেবকে অমন মিথ্যে ভরসা দিলে?
দিলাম ওঁরই ভালর জন্য! আশ্বাস দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন বাসুদেব, শুধু ঘি খেয়ে তো নয়, নাগাড়ে যজ্ঞস্থানে থুম হয়ে বসে বসে ভুজি খেয়ে ওঁর পেটের ওই অবস্থা। মাংসের চেয়ে ওঁর বেশি দরকার একটু ছোটাছুটি। তা এই খাণ্ডব বনে ছোটাতে ছোটাতে ওঁর কালঘাম বার করবার ব্যবস্থা করব। উনি কোথাও দুটো শুকনো কাঠ ধরাতে না ধরাতেই দেবরাজ পশলা পশলা বৃষ্টি ঢালবেন তা নেভাতে, আমরাও তা ঠেকাবার নামে পবনদেবকেই রাখব রুখে, যাতে আগুন না ছড়ায়। তাতে অগ্নিদেবকে সারাক্ষণ ছোটাছুটিই করতে হবে সারা বন, শুকনো জায়গার খোঁজে। তাতে শিকার পান বা না পান, তাঁর পেটের রোগ একেবারে যাবে সেরে।
কিন্তু–
অর্জুন একটু আপত্তি জানাতেই শ্রীকৃষ্ণ হেঁকে বললেন, অগ্নিদেব যদি জানতে পারেন সেই ভয় করছ তো? না, সে ভয় নেই। অগ্নিদেব জানবেন আমরা দুজনে যুদ্ধ করে একেবারে ফাটিয়ে দিয়েছি। কেমন করে জানবেন? ওই যে বায়স ক-টি দেখছ, মাথার ওপর কা কা করছে, ওরা হল বাত বিশারদ, সংবাদ দেবার নেবার সাংবাদিকও বলতে পারো। কা কা করে ওরা খবর কুড়িয়ে আর ছড়িয়ে বেড়ায়। ওদের মুখেই আমাদের চুটিয়ে লড়াই করার খবর অগ্নিদেবকে আমি পাঠাবার ব্যবস্থা করছি। আপাতত ইন্দ্রপ্রস্থের রাজসভাতেও এই বিবরণই যাবে। শেষকালে শুধু ছোট একটু টীকা থাকবে,—এ অলীক বিবরণের কারণ বুঝিয়ে তা সংশোধন করার।
ঘনাদা থামলেন।
তারপর নিজে থেকেই আমাদের জিজ্ঞাসাটা আঁচ করে নিয়ে বললেন, মহাভারতে সে টীকাটা কেন নেই জানতে চাইছ তো? না, দারুক মূষিক কোম্পানি কি বল্মী বিশারদের কাজ এটা নয়। দোষ তালপাতা জোগান যে দিয়েছিল সেই ব্যাপারীর। গণেশঠাকুরকে যেসব তালপাতার জোগান দেওয়া হয়েছিল তার কিছু ছিল রীতিমতো পুরনো, ঘুন-ধরা, মুচমুচে। পুঁথির রাশ নাড়াচাড়ার সময় তার খাস্তা হয়ে যাওয়া একটা টুকরো কখন কোথায় খসে পড়েছে কেউ টেরই পায়নি। টীকাটুকু ওখানেই ছিল।
ঘনাদা কেদারা ছেড়ে উঠলেন। তাঁকে আর চাইতে হল না। পকেট থেকে গোটা একটা সিগারেটের টিন বার করে শিশির নিজেই তাঁর হাতে গুঁজে দিল।
ঘনাদার ফুঁ
জুদশি, বলেছেন ঘনাদা।
